“সমাজের সর্বস্তরের পুরুষ স্ত্রীর নির্যাতনের শিকার”

 


নির্যাতিত ৯৮ শতাংশ বিবাহিত পুরুষ মুখ ফুটে কোন কথা বলে না।

                                   খোন্দকার জিল্লুর রহমান:-
সৃষ্টির যা কিছু সুন্দর চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর, কাব্যিক ভাষায় লেখাটি সুন্দর হলেও প্রকৃতপক্ষে পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে মহান আল্লাহ তায়ালা তার সৃষ্ট সেরাজীব মানুষের বসবাসের জন্য তৈরি করে দিয়েছেন সকল রকম সুযোগ সুবিদা। বেঁচেথাকা ও প্রার্থিব জীবনের জন্য দিয়েছেন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও জীবনকে আরো মধুময় করে তোলার জন্য এবং পরবর্তিতে একের পর এক মানব অস্তিত্ত টিকিয়ে রেখে যাওয়ার জন্য জীবনানুভুতি ও জীবন সঙ্গীসহ সকল কিছু। একটা ধারাবাহিক সৃষ্টির মাঝে তৈরি করে দিয়েছেন সভ্যতা, জ্ঞান, বুদ্ধি ও মনুষ্য বিবেক। আল্লাহর সৃষ্ট মানুষকে দিয়েছে উন্নয়ন, সভ্যতা, জ্ঞান, বুদ্ধি বিবেক খাটিয়ে কোরান হাদিছের আলোকে ইসলামিক বিধি বিধান মেনে চলা এবং নারী-পুরুষের অধীকার।
ইসলামে পুরুষের সাথে সাথে নারীরও যথেষ্ট মর্যাদা দেয়া হয়েছে। সমাজে প্রচলিত আছে, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, গুণবান পতি যদি মিলে তার সনে। কথাগুলো অনেক মূল্যবান। নারী মাতা, নারী সুখ, নারী ভালোবাসা, নারী অনুপ্রেরণা, আছে এগিয়ে চলার সাহসিকতা। কারো কারো মতে, নারী অবলা, নিরীহ এবং সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার এটা বললেও প্রকৃতভাবে তা সত্য নয়। বর্তমান সময়ে নারীরা অধিক পরাক্রমশালী, শাসনতান্ত্রীক মনোভাব, আধীপত্য বিস্তারসহ পুরুষতান্ত্রিক ব্যাবস্থাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতাই নারী। নারীরা এখন শিক্ষা-দিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতেও সফলভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখছে, সেই সাথে আমাদের দেশে ও পিছিয়ে নেই নারীরা, নারী শিক্ষা, নারী জাগরণ ও নারী নেতৃত্তের সাথে সাথে সমাজে গৃহে আধিপত্ত বিস্তার, ক্ষমতা কুক্ষিগত করন ও নিজ গৃহে পুরুষের উপর নির্যাতনসহ সকল কিছুর মাত্রা অতিতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে স্ত্রীদের কর্তৃক পুরুষ নির্যাতনের মাত্রা করোনা ভাইরাসের চেয়েও শক্তিশালী নিরব ঘাতক হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে। লোকলজ্জা,আত্ম সম্মান, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি কারনে পুরুষ সমাজ অনেক সময় মুখ না খুললেও দিন দিন এর মাত্রা বেড়েই চলছে। এর কারন হিসাবে অনেকের মতে যে হারে বাড়ছে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চাকরিজীবী নারীর সংখ্যা, আইনগতভাবে নারীদের অতিমাত্রায় প্রাধান্যতা, ঠিক সে হারে পরিবর্তন হয়নি পিতৃতান্ত্রিক বা পুরুষতান্ত্রিক পারিবারিক পরিবেশের অবস্থা, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা । অতি সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে পুরুষ নির্যাতনে সারা বিশ্বে চতুর্থ স্থানে বাংলাদেশের অবস্থান।
স্ত্রী কর্তৃক বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনাও পুরুষ নিযাতনের ক্ষেত্রে অনেকটা দায়ী, তা অস্বিকার করা যায় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত নয়-দশ বছরে ঢাকা শহরে বিয়ে বিচ্ছেদের প্রবণতাও বহুল পরিমানে বেড়েছে। স্বল্প শিক্ষিত দম্পতিদের চেয়ে শিক্ষিত দম্পতিদের মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদ বেশি এবং গ্রামের দম্পতিদের চেয়ে শহরে দম্পতিরা এ ক্ষেত্রে আরো বেশি এগিয়ে। এ জন্য অনেকেই শিক্ষিত নারীর জীবিকাকে দোষারোপ করছেন। একজন চাকরিজীবী পুরুষের চেয়ে একজন চাকরিজীবী নারীর আগ্রাসি মনোভাব (সকলের জন্য প্রযোজ্য নয়) অপ্রয়োজনে বাইরে বেশী সময় দেয়া, নানা তর্ক বিতর্ক অশান্তি, মতের অমিল, সমঝোতার অভাব, শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি, পুরুষের আধীপত্যে তৃপ্ত না থেকে পরকীয়ার কারন, শারীরিক দুর্বলতা, প্রত্যাশা পূরণের অভাব, পরিবারের সদস্যদের অনধিকার চর্চা, হিংসা – লোভ, উচ্ছাভিলাসিতা এবং ক্যারিয়ার নিয়ে সমস্যা হওয়ার ফলেও পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশ মেন’স রাইটস ফাউন্ডেশন নামের একটি বেসরকারি সংগঠন জানিয়েছে দেশের বিবাহিত পুরুষদের ৮০ শতাংশেরও বেশি ‘মানসিক’ নির্যাতনের শিকার। অনেকেই এসব বিষয় প্রকাশ করতে চান না সামাজিক লজ্জার ভয়ে। নিজেদের পরিচালিত এক গবেষণার ভিত্তিতে এই তথ্য জানিয়েছে, সংগঠনটি আরো জানায়, সামাজিক লজ্জার ভয়ে পরিচয় প্রকাশ করেন না অভিযোগকারীরা। বিবাহিত অনেক পুরুষের নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে একমত মানবাধিকার কর্মীরাও। তারা বলছেন, পুরুষদের নির্যাতিত হওয়ার খবর তাদের কাছে আসে। তবে যেই নির্যাতিত হোক তার আইনি সুরক্ষার দাবি জানিয়ে সংগঠনটি বলে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিছু বেসরকারি সংস্থা আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস পালন করছে। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মেন’স রাইটস ফাউন্ডেশন প্রতি বছর ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশে পুরুষ দিবস পালন করছে। সামনের বছরগুলিতেও এমন আয়োজন করা হবে বলে জানায় সংগঠনটি।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান শেখ খাইরুল আলম জানান ‘নির্যাতিত পুরুষদের’ পরামর্শ ও আইনি লড়াইয়ে সহযোগিতা দিতেই এই সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ করেছে, ‘‘আমাদের কাছে প্রতিদিন যে ফোন আসছে তাতে আমরা দেখেছি, নীরবে চোখের জল ফেলছেন অনেক পুরুষ। লজ্জায় তারা নির্যাতনের কথা বলতে পারছেন না এবং বলেননা। কোনও নারী নির্যাতিত হলে তার বিচার চওয়ার অধিকার আছে এবং অনেক সংগঠনও তার পাশে দাড়ায়। নির্যাতিত পুরুষদের সহযোগিতার জন্য আমরা এ সংগঠনটি করেছি।” নিজেও এমন নির্যাতনের শিকার দাবি করে বলেন, ‘‘নির্যাতনের শিকার হয়ে আমি অনেক মানবাধিকার সংগঠনের কাছে গিয়েছি। তারা কেউই নির্যাতিত পুরুষদের পাশে দাড়াতে রাজি হয়নি,তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই আমরা এই সংগঠন করেছি। এখন আমরা নির্যাতনের শিকার পুরুষকে আইনি লড়াইয়ে সহযোগিতা করছি। তাদের পরামর্শ দিচ্ছি। জাতীয় সংসদে পুরুষ নির্যাতনবিরোধী আইন করার জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছি। এই আইনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রচারণাও চালাচ্ছি”। সংগঠনটির গবেষণার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের কাছে প্রতিদিন যে অভিযোগ আসে তার ভিত্তিতেই আমরা গবেষণাটি করেছি। তবে সমস্যা হলো, কেউই লিখিত অভিযোগ করতে চান না। ফলে আমাদের কাছে এ বিষয়ে কোনও দলিলাদি নেই”। সংগঠনটির দাবি বিদেশ থেকে অনেকে ফোন করেও তাদের কাছে নির্যাতনের অভিযোগ করছে।

এদিকে পুরুষ নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইম্যান অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সানজীদা আখতার বলেন, ‘‘আমাদের সমাজে পুরুষ একই সঙ্গে কিন্তু নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কোনও কোনও ক্ষেত্রে শ্রেণিভেদে তারা নির্যাতিত হলেও হতে পারে”।
আমাদের দেশে খুবছোট পরিসরে পুরুষ দিবস উদযাপিত হলেও পুরুষ নির্যাতন নিয়ে আমরা এখনো কোনও গবেষণা বা পরিসংখ্যান পাইনি। সংগঠনটির মাধ্যমে জানা যায় পুরুষরা যত বেশি পুরুষ হিসেবে নির্যাতিত হয়ে থাকেন তার চেয়ে অনেক বেশি শ্রেণি, অবস্থান ও আর্থসামাজিক দুর্বল অবস্থানের কারণে নির্যাতিত হন। একই কারণে নারীও নির্যাতিত হন তবে সব নির্যাতনেরই আইনি সুরক্ষা থাকা প্রয়োজন”। অনেকে মনে করেন, পুরুষ দিবসকে তাৎপর্যপূর্ণ করতে চাইলে সমাজে পুরুষকে যেভাবে তৈরি করা হয় সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
আমরা আশা করব আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটা শান্তিময় এবং নিরাপদ সুন্দর পৃথিবী দিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র ও পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের দায়িত্তশীল ব্যক্তি সহ নারী- পুরুষ প্রত্যেকে প্রত্যেকের আচার আচরনে কাজে কর্মে শিক্ষাদীক্ষায় সহনশীলতা এবং সহযোগিতার পরিচয় দিয়ে লোভ লালসা ঊচ্ছাকাঙ্খা অত্যাচার অনাচার ও আগ্রাসি মনোভাব পরিহার করে পারিবারিক শান্তি সৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার মাধ্যমে কাজ করে পুরুষ এবং নারী উভয় নির্যাতনের হাত থেকে পরিত্রান পওয়া যাবে বলে আজকের প্রত্যাশা।

লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।