ছয়বারের প্রধানমন্ত্রিত্বে মেয়াদ কখনো পূর্ণ করতে পারেননি একবারও, বারবারের ব্যর্থতার পরও রনিল বিক্রমাসিংহে এখন রাজার আসনে বসিয়েছেন
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিতে দিতে হয়েছে, জনসমর্থনও একেবারে তলানিতে। ছয়বারের প্রধানমন্ত্রিত্বে মেয়াদ কখনো পূর্ণ করতে পারেননি একবারও। বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিতে দিতে হারিয়েছেন জনসমর্থনও। পার্লামেন্টে দলের আসন ছিল মোট একটি। সেখান থেকেই এখন শ্রীলংকার সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ হয়ে উঠেছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। কাঁধে তুলে নিয়েছেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে শ্রীলংকাকে উদ্ধারের গুরুদায়িত্ব।
শ্রীলংকার পার্লামেন্টে গতকাল অনুষ্ঠিত ভোটে জয়লাভ করে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পেয়েছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। রাজাপাকসে পরিবারের রাজনৈতিক দল শ্রীলংকা পদুজানা পেরামুনার সমর্থন পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নিযুক্তিকে মেনে নিতে পারছেন না বিক্ষোভকারীরা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাজাপাকসে পরিবারের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। বিনিময়ে তাদের সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক দল শ্রীলংকা পদুজানা পেরামুনা বা সামরিক বাহিনীসহ রাজাপাকসে পরিবারের ক্ষমতার সব স্তম্ভকেই নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কাজেও ব্যবহার করতে পারছেন তিনি। অর্থনৈতিক সংকটের মুহূর্তে ক্ষমতার আসনে বসলেও তিনি এখন পর্যন্ত তা মোকাবেলায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ হাতে নিতে পারেননি।শ্রীলংকার রাজনীতিতে রনিল বিক্রমাসিংহেকে সমালোচকরা দেখেন অনন্য উদাহরণ হিসেবে। তাদের ভাষ্যমতে, পরিস্থিতির সুযোগে ক্ষমতায় বিক্রমাসিংহের আসার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার যাত্রা হয়েছিল অনেকটা আকস্মিকভাবে পরিস্থিতির সুবাদে। দলে নিজের ক্ষমতাও সংহত করেছিলেন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েই। এবার শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার পথচলার শুরুটাও পরিস্থিতির সুবাদে। প্রতিবারই তাকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে ভিন্ন রকম প্রেক্ষাপটে।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত রনিল বিক্রমাসিংহে মোট ছয়বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন তবে একবারও নিজের মেয়াদ পূর্ণ করা সক্ষম হননি তার। শ্রীলংকার ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) এ নেতার ভাগ্যে প্রথম শিকে ছেঁড়ে ১৯৯৩ সালে। লিবারেশন অব তামিল টাইগার ইলমের (এলটিটিই) আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ হারান শ্রীলংকার তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসা। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের শূন্য পদ পূরণে এগিয়ে আসেন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী দিনগির বন্দ বিজেতুঙ্গা। ওই সময় বিক্রমাসিংহে ছিলেন শিল্পমন্ত্রী। পার্লামেন্টের সিনিয়র নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ পেয়ে যান তিনি। সে সময় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দহরম-মহরম গড়ে তুলতে সক্ষম হলেও সাধারণ শ্রীলংকানদের মধ্যে জনপ্রিয় কোনো অবস্থান গড়ে নিতে পারেননি তিনি। এক বছরের মাথায়ই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে পদ ছাড়তে হয় তাকে।
ছয ছয় বার প্রধানমন্ত্রিত্বের স্বদ পেলেও নিজেকে একবারের জন্যও শক্ত হাতে একবারও শক্তভাবে মেয়াদ পুর্ণ করতে পারেননি রনিল বিক্রমাসিংহে। এর আগে প্রেমাদাসার আনুকূল্যে ১৯৮৯ সালে লিডার অব দ্য হাউজ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, কিন্তু দলের শীর্ষ পর্যায়ের ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে রানাসিংহে প্রেমাদাসার প্রতিদ্বন্দ্বী ললিত আথুলাতমুদালি ও গামিনি দিশানায়েকের সঙ্গে তাকেও বেশ প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে। দলের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠার সুযোগ পান তিনি ১৯৯৪ সালে। ওই বছর এলটিটিইর আত্মঘাতী বোমা হামলায় গামিনি দিশানায়েকের মৃত্যু হয়। আগের বছর অর্থ্যাৎ ১৯৯৩ সালে ললিত আথুলাতমুদালিও বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন যার কারনে বিনা বাধায় দলের প্রধান ও পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পান বিক্রমাসিংহে।
এরপর দীর্ঘ সাত বছর শাসনক্ষমতার বাইরে থাকার পর পুনরায় ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রিত্বের সুযোগ পান । তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার সঙ্গে তেমন একটা সদ্ভাব গড়ে তুলতে পারেননি তিনি। এলটিটিইর সঙ্গে শান্তি চুক্তি নিয়ে বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৪ সালে তাকে বরখাস্ত করেন চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা।
২০১৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিক্রমাসিংহের ইউএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সামান্য ব্যবধানে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে। প্রেসিডেন্ট হন মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। ১০০ দিনব্যাপী বিশেষ এক কর্মসূচির আওতায় রনিল বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। এরপর ওই বছরই অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনেও ইউএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয় লাভ করে। চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন বিক্রমাসিংহে। নতুন এ মেয়াদে শ্রীলংকার অর্থনীতি সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে খুব একটা দক্ষতা দেখাতে পারেননি তিনি। বেশকিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপের পরও ২০১৭ সালে দেশটির জিডিপির হার নেমে আসে মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশে, যা ছিল দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে জনসাধারণের মধ্যে তার জনপ্রিয়তাও কমছিল অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।
বিক্রমাসিংহে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসার তিন বছরের মাথায় শ্রীলংকায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিক্রমাসিংহের ইউএনপির মারাত্মক ভরাডুবি ঘটে। মন্ত্রিসভার সদস্যসহ দলের সিনিয়র বেশ কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করে বসেন। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে মাইথ্রিপালা সিরিসেনাও রনিল বিক্রমাসিংহেকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেন। ইউএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের গুরুত্বপূর্ণ একটি শরিক দল জোট ছেড়ে গেলে মাহিন্দা রাজাপাকসেকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। বিষয়টিকে অসাংবিধানিক দাবি করে উচ্চ আদালতে যান তিনি। প্রায় দুই মাস আইনি লড়াইয়ের পর পদ ফিরে পান রনিল বিক্রমাসিংহে। পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রিত্বের পদে বসেন তিনি। যদিও ২০২০ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে গো-হারা হেরে বসে তার দল। রনিল বিক্রমাসিংহে নিজে ছাড়া ইউএনপির আর সব প্রার্থী নির্বাচনে পরাজিত হন।কভিডের প্রাদুর্ভাব ও শ্রীলংকার অর্থনৈতিক সংকট ঘনিয়ে আসাসহ পরবর্তী নানা ঘটনার ঘনঘটায় অনেকটাই মনোযোগের বাইরে ছিলেন রনিল বিক্রমাসিংহে। শ্রীলংকার চলমান আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে তার প্রতি আবারো সুপ্রসন্ন হয় ভাগ্যদেবী।
রাজাপাকসেদের মতো রনিল বিক্রমাসিংহেও এসেছেন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার থেকে। মাহিন্দা রাজাপাকসের মতো তারও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে উত্থানের সূচনা গত শতকের সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টিতে যোগদানের পর খুব দ্রুতই ওপরের দিকে উঠেছেন তিনি। ১৯৭৭ সালে প্রথম বিয়াগামা পার্লামেন্ট আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনি। দ্রুতই প্রেসিডেন্ট জে আর জয়াবর্ধনের সুনজরে আসেন তিনি। নিয়োগ পান যুব ও কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে। পরে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব পান।
রানাসিংহে প্রেমাদাসার অধীনে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৯৪ সালে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার নেতৃত্বাধীন পিপলস অ্যালায়েন্স (পিএ) জোট ক্ষমতায় এলে তার বিরুদ্ধে কলম্বোয় একটি অবৈধ ডিটেনশন সেন্টার ও টর্চার চেম্বার পরিচালনার অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, ওই সময়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠা জনতা বিমুক্তি পেরামুনার (জেভিপি) সদস্যদের সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হতো। এ নিয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনে ডিটেনশন সেন্টারটির সঙ্গে রনিল বিক্রমাসিংহের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। যদিও এ নিয়ে পরে আর কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
কূটনৈতিকভাবে পশ্চিমা ও ভারতীয় ব্লকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রনিল বিক্রমাসিংহে। সর্বশেষ ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে শ্রীলংকার সংকটে পাশে থাকার জন্য শুরুতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। আবার চীনের সঙ্গে সেভাবে সখ্য না থাকলেও বিক্রমাসিংহে এখন পর্যন্ত বেইজিংয়ের সঙ্গেও কোনো ধরনের মতান্তর সামনে আনেননি। তিনি তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেই হাম্বানটোটা বন্দর চীনের হাতে তুলে দিয়েছিল শ্রীলংকা।
রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘদিন বিরোধী অবস্থানে থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে রাজাপাকসে পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রনিল বিক্রমাসিংহে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মাহিন্দার পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিক্ষোভকারীদের আস্থায় আসার মতো কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারেননি রনিল বিক্রমাসিংহে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার আগ মুহূর্তে তার দপ্তরেরও দখল নিয়েছিল ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা।
সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দয়ান জয়তিলকের ভাষ্যমতে, আইএমএফ চাইছে শ্রীলংকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা। রাজাপাকসেদের সুরক্ষা দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত রনিল বিক্রমাসিংহে পরবর্তিতে বিক্ষুধ্য পরিস্থিতির সিকার না হন সামনে এটাই দেখার অপেক্ষা।











