
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলির দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, অনৈতিক কর্মকান্ডসহ কমিশন প্রতিযোগিতায় এখন প্রায় শীর্ষস্থান ছুঁইছুঁই। আর এসবের সাথে জড়িত কোম্পানীর চেয়ারম্যান, পরিচালক ও মুখ্যনির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে এবং তাদের সহযোগিতা ও অনৈতিক প্রতিযোগিতায় পুরো ইন্স্যুরেন্স সেক্টর এখন টালমাটাল অবস্থার দিকে দ্রুতগতিতে ধাবিত হইতে যাইতেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভলাপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথোরেটি (আইডিআরএ) নখদন্তহীন কাগুজে বাগের ভূমিকায় অবতীর্ণ।
স্বপ্নে গড়া বাংলাদেশের বীমা খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, কমিশন প্রতিযোগিতা ও মিথ্যাতথ্য দিয়ে তহবিল আত্মসাৎ’, কোন রকম বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে বা কোন রকম নিয়ম নীতি বা রিক্রুটমেন্ট পলিসির অনুসরন ছাড়াই ভুয়া নিয়োগ দেখানোর মধ্যদিয়ে বেতন ভাতার নামে বিশাল অঙ্কের টাকা উত্তলন করে নেওয়া, অবৈধ পথে জনগণের জামানো অর্থ বিদেশে পাচার করা, সরকারের কর ফাকি দেওয়া, আইডিআরএ’র বেঁধে দেয়া আইন ভঙ্গকরে অতিরিক্ত কমিশনে ব্যবসা করা, অতিরিক্ত কমিশনকে জায়েজ করার জন্য ডামি কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে অনৈতিক ভাবে পলিসি/ কাভারনোট বাতিল করে প্রিমিয়ামের টাকা গোপন করে মালিকদের বাসায় ব্যাগ ভর্তি টাকা পাঠানো, অনৈতিক মনোভাব নিয়ে স্বীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতি ছাড়া নিজের পছন্দসই (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) এমডি/সিইইউ/ মুখ্য নির্বহী কর্মকর্তা চলতি দায়িত্বে নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে একই সিন্ডিকেট, কোম্পানী গুলিকে ঠিক পূর্বের লাগামহীন অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হয় যে “এ যেন নতুন বোতলে পুরানো মদ।” বীমা সংশ্লিষ্ট খাতের অনেকের মতে, একটার পর একটা কোম্পনীর দেউলিয়াত্ব দেশের আর্থিক খাতের জন্য অশনি সঙ্কেত ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইন্স্যুরেন্স ডেভলাপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথোরেটিকে (আইডিআরএ)সহ অর্থমন্ত্রণালয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে (লাইফ-ননলাইফ) বীমা কোম্পানীগুলি বেশকিছু দুর্নীতিবাজ ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি), চেয়ারম্যান এবং পরিচালকরা এহেন দুর্নীতি, এবং লুটপাটের মহা উৎসবে নেমে পড়েছেন। প্রশাসনিক ক্ষমতা ও দক্ষতায় অযোগ্য ইন্স্যুরেন্স ডেভলাপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথোরেটি (আইডিআরএ)‘র সুযোগ সন্ধানী কর্মকর্তরা স্বীয় স্বার্থ হাসিলের কারনে এবং প্রজতন্ত্রের কর্মচারি হিসাবে নিজেদের অবস্থান এবং নৈতিকতার কথা ভুলে গিয়ে অবৈধ আয়ের নেশায় বোঁধ হয়ে নিজেদের আখের গোছানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, যা সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও অনলাইনে, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং দুদকের তদন্ত, বারবার গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যাওয়া এবং জামিনে মুক্তি (নজরুল ইসলাম) তাদের নির্লজ্জ বেহায়াপনার প্রতিবেদন ও সচিত্র চেহারা সারা দেশের ব্যাংক,বীমা ও আর্থীক সেক্টরসহ দেশ-বিদেশের লোকেদের নিকট টক অব দ্য ডেতে পরিণত হয়েছে। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলির অবিভাবক ইন্স্যুরেন্স ডেভলাপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথোরেটি (আইডিআরএ) এবং অর্থমন্ত্রনালয়ের দুর্বলতার সুযোগে কোম্পানীগুলির দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, প্রতিযোগিতামুলক কমিশনের সর্বোচ্ছ অবস্থাননিয়ে (প্রায় ৭০% ছুঁইছুঁই) অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত কোম্পনীর চেয়ারম্যান, পরিচালক ও মুখ্যনির্বাহী কর্মকর্তাদের হযবরল অবস্থার মধ্যে থাকা দেশের ৪৬টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানীগুলির তালিকায় হাতেগোনা দু-চারটা কোম্পানী ব্যতিত বেশিরভাগ কোম্পানীই সম-হারে একই সারিতে অবস্থান করছে ।
যদিও আমাদের বাংলাদেশের আয়তসীমানার তুলনায় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সংখ্যা লাইফ নন-লাইফ মিলিয়ে অনেক বেশি সেই তুলনায় যোগ্য ও অভিজ্ঞ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সংখ্যা নিতান্তই কম বলা যায়। এখানে টেকনিকেলি যে ব্যাপারটা উল্লেখ্য না করলেই নয়, একটা কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি)পর্যন্ত ক্ষমতাশীল স্থায়ী পদ, যদিও এএমডি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি)’র নিকট দায়বদ্ধ। এরপর কোম্পানিগুলির ব্যবস্থাপনা পরিচালক/ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা/ সিএফও যেটাই বলি এ পদটা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেও প্রকৃত পক্ষে এ পদটা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী পদ নয়, তার কারন হল কোম্পানিগুলির ব্যবস্থাপনা পরিচালক/ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা/ সিএফও পদে যারা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)‘র থেকে নিয়োগ অনুমোদন পান তা চুক্তিভিত্তিক এবং নবায়নযোগ্য পদ। আর এ পদে কোম্পানীগুলির চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্যদ কৌশলে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য নিজেদের বলয়ের লোককে সিলেকসন দিয়ে নিয়োগ অনুমোদনের জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ(আইডিআরএ)‘র নিকট পাঠান। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষও (আইডিআরএ) অনেক সময় অদৃশ্য শক্তির চাপের মুখে নিয়োগ অনুমোদনের সবশর্ত যাচাই বাচাই না করে ভিন্ন কিছু সুবিধা আদায় করে নিয়োগ অনুমোদন গ্রহন করেন। পরবর্তিতে শুরু হয় চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং এমডি/ সিইওদের যোগসাজসে দুর্নীতি ও লুটপাটের মহাউৎসব। কখনো কখনো আবার কোন কোন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নীতির সাথে আপোষ করতে না পারলে তিনি সইচ্ছায় পদত্যাগ করেন অথবা কোম্পানীর পরিচালনা পর্যদের চাপের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন।
আইডিআরএ’র সাবেক চেয়ারম্যান ড.মোশারফ হোসেন সাহেব যেমনি করে এই পদকে কলংকিত করেছেন। তিনি অনিয়ম ঘুষ ও দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। বর্তমানেও কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আইডিআরএ’র অধিকাংশ লোকই দুর্নীতির সাথে জড়িত। বীমা কোম্পানী সমুহ অনিয়ম করেই যাচ্ছে কিন্তু আইডিআরএ কি করেছে? কোম্পানি সমূহে স্পেশাল অডিট নিয়োগ পরবর্তীতে অডিট ফার্ম সমুহ থেকে পর্দার অন্তরালে ৫০% টাকা কোন যুক্তি বা নৈতিকতার মানদন্ডে নেওয়া হয়। আসলে যত বড় ডিগ্রিধারী তত বড় দুর্নীতিবাজ। কোম্পানি সমূহের সিইও নিয়োগের সময় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা ঘুষ নিতে বিবেক কোথায় থাকে? কি কারণে কোন কোন অযোগ্য ব্যক্তিকে রাতারাতি সিইও নিয়োগের অনুমোদন দিতে হয় বা দেওয়া হয়?
নিয়োগ এবং অনুমোদন বাণিজ্যে সরকারি দুটি (সাধারণ বীমা এবং জীবন বীমা) সহ মোট ৮৩টা বীমা কোম্পানী নিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)‘র স্থান সবার উপরে বললেও কমই বলা হবে। যেখানে আইডিআরএ‘র নিকট অতীত চেয়ারম্যান জয়নুল বারীর পূর্বে সীমাহীন দুর্নীতি অপশাসনসহ কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে বিদায় নিতে বাধ্য হওয়া আইডিআরএ‘র সেই সাবেক চেয়ারম্যান ড: মোশারফ হোসেনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি কতটুকু কি করতে পেরেছেন তা প্রশ্নবিদ্ধ।
বর্তমানে জনসংখার তুলনা এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারনে বীমা কোম্পানী অনেক বেশী (লাইফ-নন লাইফ মিলিয়ে ৮৩টি) হওয়ার পরও কিছু কিছু কোম্পানীর মালিক পক্ষের অনৈতিকতা,দুর্নীতি, অর্থপাচার সহ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ)‘র নিয়ম নীতির দৃঢ়তা এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে সামছুল আলম, আজিজুল হক চৌধুরি, নাছির এ চৌধুরি, এম এ সামাদ, এম এ রহিম এবং রফিকুল ইসলামের মত বীমামেধায় মেধাবীরা বীমাখাতে আসে না। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) নিজেদের প্রশাসনিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা ভুলে গিয়ে সারা বছর বীমা মেলা ও বীমা দিবস এই দুই প্রোগ্রাম নিয়েই ব্যাস্ত থাকে বলে প্রতীয়মান হলেও বর্তমান চেয়ারম্যান ড. আসলাম আলম ২০২৫ সালের ১ মার্চ বীমা মেলা কৌশলে পরিহার করে কিছুটা হলেও স্বচ্ছতার পরিছয় প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
গোপন পরিসংখানে পাওয়া যায় উল্লেখযোগ্য দুর্নীতির মাত্রায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)‘র স্থান শীর্ষমাত্রায়, সেটা বোঝা যায় আইডিআরএ‘র সদস্য নিয়োগ দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে। আইডিআরএ‘র সদস্য হওয়ার জন্য বীমা কোম্পানীর একজন সিইও সকল সুযোগ সুবিদাসহ ৩ থেকে ৫ লক্ষ টাকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে মাত্র প্রায় ১ লক্ষ টাকার চাকরির জন্য হন্যে হয়ে বিভিন্ন তদবির তকলিফসহ যা যা করার দরকার তা করে থাকেন। এটা বিশেষ ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ যে, কেন একজন এমডি প্রায় ৪ লক্ষ টাকার সম্মানী এবং ৩ বছর করে আরো দুইবার নবায়ন যোগ্য পদ ছেড়ে ১ লক্ষ টাকার সম্মানী এবং মাত্র ২ বছরের মেয়াদে একবার নিয়োগ হয়ে আইডিআরএ’র সদস্য পদের জন্য উঠেপড়ে লাগেন কেনো ??? অর্থাৎ “ডাল মে কুচ কালা হে”। তবে এটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, পলাতক সরকারের দুর্নীতিবাজ প্রেতাত্মার পতনের পর এবারই প্রথম দু-জন মেম্বারকে (লাইফ এবং নন-লাইফ) স্বচ্ছ এবং উপযুক্ত নিয়োগ বলে এখনো প্রমাণিত।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)‘র শীর্ষ কর্মকর্তার কথায় প্রমাণিত হল যে অতীতে তিনি বিআইএ, বিআইএফ, এবং নির্দিষ্ট কারো কারো চাপের নিকট অথবা কোন অদৃশ্য শক্তির নিকট ভীত হয়ে এ প্রবিধানমালার পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন। কমিশন নিয়ে বিআইএ’র কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সভার তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, যারা বাহ্যিক ভাবে কমিশন নিয়ে কথা বলেন, ভিতরগতভাবে তারাই সর্বোচ্ছ কমিশনে ব্যবসা করে যাচ্ছেন, আবার যারা অটোমেসন সফটওয়্যার বিক্রয় ব্যবসার মাধ্যমে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)‘কে বিশাল অঙ্কের খরচের মাধ্যমে কমিশন বন্ধে প্রলুদ্ধ হওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন, অথচ দুঃখের বিষয় হলো তাদের কোম্পানীই আইডিআরএ’র প্রদত্ত কমিশনের বিধান লঙ্গন করে সর্বোচ্চ কমিশনে ব্যবসা করে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিআইএ এর নব নির্বাচিত কমিটির সভাপতির মতে তিনি বীমাখাতকে অবৈধ কমিশন এবং অনিয়ম থেকে উদ্দার করবেন বলে আশাবদ ব্যক্ত করেন।
সর্বশেষ দেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময়ী স্বপ্নের বীমাখাতের বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, দুর্বিত্তায়নসহ কোন অপশক্তির নিকট পরাজিত হবে আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ) শুধু মুখে মুখে নিয়ম-নীতির কথা বলে যাবে কার্যত ভুমিকার বেলায় ঢাল তলোয়ার বিহীন নীধীরাম সর্দারের মত ঠুটো জগন্নাথের ভুমিকা পালন করে যাবে, তাহলে স্বপ্নে গড়া দেশের বীমা খাত আর্থিক লুটপাটের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হবে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এখনই যদি এর লাগাম টেনে ধরতে না পারে তাহলে এর ব্যর্থতার দ্বায় একমাত্র আইডিআরএ এবং অর্থমন্ত্রণালয়কেই বহন করতে হবে।












