৯০০ কোটি টাকা বিমা দাবি করেছে ইউএস-বাংলা

৩০ দিন প্রতিবেদক :
নেপালে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় সব মিলে প্রায় ৯০০ কোটি বিমা দাবি করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। বিমা দাবির বিপরীতে প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুততম সময়ে সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্স সবকিছু যাচাই-বাছাই করে দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্সে বিমা করলেও বিমার অঙ্ক বড় হওয়ায় তা সাধারণ বিমা করপোরেশন ও যুক্তরাজ্যের কেএমডির মাধ্যমে পুনঃবিমা রয়েছে। তাই বিমা দাবি পরিশোধ করতে কোনো সমস্যা হবে না বলে জানা গেছে। তবে টাকার অঙ্ক সার্ভে রিপোর্টের পর চূড়ান্ত হবে। এদিকে এরই মধ্যে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ শুরু করেছে দেশি-বিদেশি বিমাকারী কোম্পানিগুলো। তবে দুর্ঘটনার কারণ না জানা ও যাত্রীদের পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত দাবি পূরণ করতে পারবে না বিমা কোম্পানি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বেসরকারি উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানি ইউএস-বাংলা নিয়মনীতি বিদ্যমান মেনে যাত্রী, উড়োজাহাজের মূল্য ও দুর্ঘটনার জন্য সৃষ্ট দায় এবং ইউএস-বাংলার কর্মকর্তা-ক্রুদের জন্য বেসরকারি সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্সে তিন ধরনের বিমা করেছে। এর মধ্যে যাত্রীদের হতাহতের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৭০ লাখ মার্কিন ডলার এবং উড়োজাহাজের ক্ষতিপূরণ ও দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট দায় মেটাতে আরও ১০ কোটি মার্কিন ডলারের বিমা করা হয়েছে। এর বাইরে ইউএস-বাংলার পাইলট-ক্রুদের জন্যও পৃথক বিমা সুবিধা রয়েছে। সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্স রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সাধারণ বিমা করপোরেশন ও ইংল্যান্ডভিত্তিক রি-ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কেএম দস্তুরের (কেএমডি) মাধ্যমে পুনঃবিমা করেছে। তাই তিন ধরনের বিমায় ক্ষতিপূরণ পাবে ইউএস-বাংলা। সব মিলিয়ে এ দাবির পরিমাণ প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।
আলাপকালে ইউএস-বাংলার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ ও বিপণন) কামরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন সবচেয়ে বড় প্রায়রিটি হচ্ছে ওই দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করা। এ জন্য বিদেশি তদন্তকারী দলগুলো উড়োজাহাজের ব্ল্যাক বক্সের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখছে। দুর্ঘটনার কারণ ও তদন্ত রিপোর্ট দেখার পরই ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া যাবে। এখন এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে এরইমধ্যে বিমা কোম্পানিগুলো কাজ শুরু করেছে। বিদেশি সার্ভেয়ার দিয়ে ক্ষয়ক্ষতির দিকগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তদন্ত ও সার্ভে রিপোর্ট পাওয়ার পরই বিমা কোম্পানিগুলো উড়োজাহাজের ক্ষয়ক্ষতি ও দায়ের বিষয়ে জানাবে। তবে হতাহত যাত্রী-ক্রুদের ক্ষতিপূরণের দিকটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।’
এদিকে গত ১২ মার্চ দুপুরে নেপালের কাঠমান্ডুতে ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট ২১১ বিধ্বস্ত হবার পরই সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্সকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এরপর নিয়ম মেনে দুর্ঘটনাস্থলে বিদেশি সার্ভে কোম্পানির প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়েছে। সার্ভেয়ারের রিপোর্ট পাওয়ার পরই বিমার ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণ করবে রি-ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। রি-ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোই বিমা দাবির সিংহভাগ বহন করবে। তবে দাবি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে বিমা কোম্পানিগুলো।
দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্যমতে, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৫১ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ফ্লাইটটির ক্যাপ্টেন ও কো-পাইলটসহ ইউএস-বাংলার চারজন ক্রু প্রাণ হারিয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও প্রায় ২০ জন। বিমা দাবি উত্থাপনের পর নিয়ম মেনে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যেই বিমা দাবি নিষ্পত্তি করার চেষ্টা চালাচ্ছে সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরন্সে। তবে সার্ভে শেষ না হওয়ায় ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়নি। চলমান তদন্ত-সার্ভে প্রক্রিয়াসহ বেশকিছু কারণে বিমা দাবি পূরণে সময়ক্ষেপণ হতে পারে। তাই শুরুতে দুর্ঘটনায় নিহত যাত্রী-ক্রুদের বিমা দাবি দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে কোম্পানিটি। এ ক্ষেত্রেও অন্তত ৩০ জনের মৃতদেহ শনাক্ত না হওয়ায় পরিচয়-জাতীয়তা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। তারপরও আগামী এক মাসের মধ্যেই যাত্রী-ক্রুদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের কাজ শুরু করতে চায় বিমাকারীরা।
আলাপকালে সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শফিক শামিম (অব.) বলেন, ‘এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। খবর পাওয়ার পরই আমরা এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছি। বিদেশি সার্ভেয়ারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সার্ভে রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত ইউএস বাংলার যাত্রী ও ক্রুদের ক্ষয়ক্ষতির অঙ্ক নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে উড়োজাহাজের ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ঘটনার কারণে তৈরি হওয়া দায় মেটানোর জন্য করা বিমায় দাবি বিষয়টি নির্ভর করছে এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত রিপোর্টের ওপর। সেটি বেশ সময়সাপেক্ষ বলে মনে হচ্ছে। আমরা যাত্রী-ক্রুদের ক্ষতিপূরণের দিকে জোর দিচ্ছি। আগামী মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দিতে চাই। তবে লাশ শনাক্ত না জটিলতার কারণে কোনো কোনো যাত্রীর ক্ষেত্রে বাড়তি সময় লাগতে পারে।
উল্লেখ্য, ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু যাবার পথে গত ১২ মার্চ নেপালের ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে বিধ্বস্ত হয় ইউএস-বাংলার ফ্লাইট ২১১। এতে ৭১ যাত্রী-ক্রুর মধ্যে প্রায় ৫১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ড্যাশ ৮ কিউ৪০০ উড়োজাহাজটির দুর্ঘটনার জন্য শুরু থেকে বিমানবন্দরের ভুল দিক-নির্দেশনাকে দায়ী করছে ইউএস-বাংলা। তবে দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে।