সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার ব্যাংকসহ আর্থিক খাতকে বিপর্যয়ে ফেলতে পারে!

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
সরকার দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদের হার কমানোর জন্য বলে আসলেও ব্যাংকগুলি বিভিন্ন সময়ে সুদের হার কমানোর কথা বলে বলেও কোনরকম কার্যকর পদক্ষেপ নেয় নাই। সুদের হার কমানোর চেষ্টা করেও কোনরকম সুফল না পাওয়ায় সরকারের চাপের মুখে একপ্রকার বাধ্য হয়েই উৎপাদন খাতে ঋণের সুদহার কমিয়ে এক অঙ্কে, অর্থ্যাৎ ১০ শতাংশের কম নির্ধারণ করতে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাতের অভিবাবক হিসাবে খ্যাত বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১লাএপ্রিল ২০২০ থেকে নতুন সুদহার কার্যকরের নির্দেশনা থাকছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি সবধরনের ঋনের সুদের হার একমাত্র ক্রেডিট কার্ডের ঋণ ব্যাতিত কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। নতুন এই সুদের হার কার্যকর হওয়ার ফলাফল কি হতে পারে এই মুহুর্তে কিছু বলতে না পারলেও ধারণা করা যায় ব্যাবসা বানিজ্যসহ রাজস্ব্য আদায়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিশেষকরে নিশ্চিত হয়েই বলা যায়যে দেশের আর্থিক খাত তথা ব্যাংক গুলির আয় ব্যাপক ভাবে কমে যাবে। স্বাভাবিক ভাবেই ব্যাংকের আয় কমে গেলে এর প্রভাব পড়বে দেশের শিল্পোন্নয়নসহ ব্যাবসা বানিজ্য, শেয়ার বাজার, রাজস্ব আদায় ও কর্মসংস্থানের উপর। অপরদিকে ঋনের সুদহার কমানো সাথে পাল্লাদিয়ে আমানতের সুদের হার কমাতে গিয়ে একদিকে যেমন ব্যাংগুলি আমানত হারানোর শঙ্কাই দেখছেন বেশী অন্যদিকে আমানত হারালে ব্যাংকের ঋণপ্রদানের স্বক্ষমতাও কমে যাবে প্রচুর পরিমানে। এমতাবস্থায় দেশের ব্যাংক বীমাসহ আর্থিক খাতে টালমাটাল অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে বলে অর্থনীতিবিধদের অনেকে এ রকম ধারণা পোষন করেন।
দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ব্যাংক ঋণের সুদ হার এক অঙ্কে বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এতে বাড়তে পারে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ। তবে এসএমই বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগ সঙ্কটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনলে বড় বড় ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন কিছু সম্বাবনার আশা থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারি। কারণ বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনা অনেক পার্থক্য। ঋণ বিতরণে সিঙ্গেল ডিজিট কার্যকরি হলে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
সাধারনত দেশের আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলি জনসাধারনের আমানতের টাকায় পরিচালিত হয়। নিজেদের বিনিয়োগের মাত্রা অনেক কম থাকলেও আমানত সংগ্রহের পর সাধারণত কস্ট অব ফান্ড বা পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে ৫ থেকে ৭ শতাংশ সুদ যুক্ত করে ঋণ বিতরণ করে থাকে। বিশ্বের বেশীরভাগ দেশেই ঋণ ও আমানতের সুদহারের এমন ব্যবধানই অনুসরণ করা হয়ে থাকে। এই অবস্থায় যেসব ব্যাংকের আমানতের সুদহার ৯ শতাংশ বা তারো বেশি রেখে মেয়াদি আমানত রেখেছে সেগুলো ঠিক কত শতাংশ সুদে কতদিন পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করতে পারবে সে বিষয়ে কিছু উল্যেখ নেই প্রজ্ঞাপনে। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের সর্বোচ্চ গড় পরিচালন ব্যয় বা কষ্ট অব ফান্ড পদ্মা ব্যাংক লি: এর এবং সর্বনিম্ন ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, ব্যাংক ঋণের সুদহার বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। এই সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ব্যাংকগুলোকে ঋণ ও আমানতের সুদহারের পার্থক্য বা স্প্রেড কমিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া ভালো ছিল। এতে করে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় আরো কমে আসত।
ব্যাংক ঋণের সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনলে উন্নয়ন সম্বাবনার পরিবর্তে আর্থিক বিপর্যয়ের ব্যাপারকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না, কারণ ৯ শতাংশে ঋণ বিতরণ করতে হলে কমকরে হলেও ৫ শতাংশে আমানত পেতে হবে। কিšু‘ ৫ বা ৪ শতাংশে আমানত পাওয়া যাবে কিনা এটাও প্রশ্ন, সুতরাং বাজার বিশ্লেষণ না করে এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ চরম সংকটে পড়ার সম্বাবনা বেশি।
দীর্ঘচাকুরি জীবন শেষে অবসরপ্রাপ্ত যেসব ব্যাংকার এবং সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিরা ব্যাংকে টাকা জমা রেখেছেন তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যাহত হবে। হুট করে আমানতের সুদ হার কমিয়ে দিলে তারা সংসার চালাতে পারবেন না। এসব আমানত কারীদের জন্য সঞ্চয়পত্রে বা যেকোন বিনীয়োগে বিশেষ ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই পথও এখন বন্ধ। প্রকৃতপক্ষে ৯ শতাংশে ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।
দেশের আর্থিক খাত এবং বনিয়োগ চাঙ্গা করতে হলে বেশ কয়েকটা দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ব্যাংক মালিকদের নিজের ব্যাংক বাদ দিয়ে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার মাণসিকতা পরিহার করার পাশাপাশি অর্থপাচার ও অধিক মুনাফা অর্জনের আকাঙ্খা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দক্ষ্য ও দায়ীত্ত্বপূর্ণ লোকবল নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনা ব্যায় সহনিয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হল খেলাফি ঋণ। খেলাফি ঋণ আসলে ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়সহ অর্থনীতির জন্য অশনি সঙ্কেত, স্পর্শকাতর কাতর খাত মনে করে খেলাফি ঋণ কমিয়ে আনতে হবে। মোটকথা ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে অর্থনীতিবিদ অনেকে এমন মতামত দেন।
সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজের কাজটা ঠিকমতো করতে পারছে না, এমনিতেই বেসরকারি বিনিয়োগ নিম্মমুখী, সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও ক্ষতিগ্রস্থ হবে, যার ফলে কর্মসংস্থানের উপরও নতুন করে চাপ তৈরি হবে। তাছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদ হার বেধে দেওয়ার বিষয়টি মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে সাংঘর্ষিক।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, অর্থমন্ত্রণালয়ের চাপে এবং পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে এক অঙ্কের সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়া হবে, যাতে একা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর দায় না আসে। তবে এর পরিণতি কী হবে, তা দেখতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে নাও হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সর্বশেষ বলতে গেলে আমরা আশা করি ,রাষ্ট্রের উন্নয়নের স্বার্থে, উৎপাদন, কর্মসংস্থানসহ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা মাথায় রেখে সরকার ব্যাংক ঋণের এবং আমানতের সুদের হার নয় ছয় করতে গিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যাতে নয় ছয় তে পড়ে না যায় সেদিকে স¤পূর্ণ গুরুত্ত্ব দিয়ে ভাবেচিন্তে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন বলে আমাদের বিশ্বাষ।
লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।