গ্রাহকের আস্থা প্রতিষ্ঠায় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো উন্নত করা হোক

জাতীয় বীমা দিবস

Bima Debos Logo
Bima Debos Logo

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
বীমা একটি সম্ভাবনাময় গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাত। তবে দেশের প্রেক্ষাপটে বীমার প্রতি জনগণের আস্থা তেমন নেই। তাই বীমার ব্যাপ্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং জনমনে বীমা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরির উদ্দেশ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এ কার্যক্রম আরো বেগবান করতে ১ মার্চকে ‘জাতীয় বীমা দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬০ সালের ১ মার্চ তত্কালীন পাকিস্তানের আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে যোগদান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বীমা খাতে যোগদানের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে গত ১৫ জানুয়ারি আইডিআরএর অনুরোধে ১ মার্চকে জাতীয় বীমা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। বীমা খাতের উন্নয়নে বর্তমান সরকার বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে আইডিআরএ গঠন উল্লেখযোগ্য। এখন প্রয়োজন আইনি সংস্কার এবং আন্তঃনিয়ন্ত্রক সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়। অর্থনীতি যত বড় হবে, বীমা শিল্পের প্রয়োজনীয়তা তত বাড়বে। তাছাড়া অর্থনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে এ শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গত কয়েক বছরে বীমা শিল্পের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। আমরাও তাদের পথ অনুসরণ করতে পারি। উন্নত দেশগুলোয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা থেকে শুরু করে পণ্য, বিনোদনের জন্যও বীমা করা বাধ্যতামূলক। এতে সবাই সুরক্ষার মধ্যে থাকছে। আমাদের এখানেও কৃষক, শ্রমিক, দরিদ্র, মধ্যবিত্তদের বীমার আওতায় কীভাবে আনা যায়, তার পরিকল্পনাও প্রয়োজন। অষ্টম পঞ্চমবার্ষিকী পরিকল্পনায় বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য-ভবনসহ আর্থসামাজিক বিষয়গুলোকে বীমার আওতায় সুরক্ষা প্রদানের উদ্যোগ নেয়াও এখন সময়ের দাবি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে ব্যক্তি, পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতের অদৃশ্য ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করে বীমা শিল্প। সম্ভাব্য ঝুঁকি কমিয়ে আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করে নিরাপত্তা দেয় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির। পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ তহবিল সৃষ্টিতে সহায়তা দিয়ে থাকে। সর্বোপরি ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য প্রয়োজন রয়েছে বীমা ব্যবস্থার। দেশের প্রায় সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে প্রিমিয়াম তথা সঞ্চয় সংগ্রহ করে সহায়তা দিয়ে থাকে বিনিয়োগ সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানে। এত কিছুর পরও অস্বীকার করার উপায় নেই যে দেশের বীমা শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে আরো অনেক কিছু করণীয় রয়েছে। এও স্বীকার্য যে এ শিল্পে অদ্যাবধি কিছু ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অবকাশ রয়েছে। বীমা শিল্পের আশানুরূপ বিকাশ ঘটেনি দেশে। পর্যায়ক্রমে এসব বাস্তবায়ন হলে দেশে বীমা শিল্পের আরো বিকাশ ও উন্নয়ন হবে সুনিশ্চিত। এসব সুযোগ-সুবিধা ক্রমান্বয়ে অবারিত করতে হবে বীমা কোম্পানির মালিকদের। দেশের সিংহভাগ মানুষ বীমা সুবিধার বাইরে রয়েছেন। নিত্যনতুন প্যাকেজ ও বীমা দাবি পূরণ দেখিয়ে তাদের বীমামুখী করা গেলে এ খাতকে সম্ভাবনাময় করে তোলা যায়। অথচ যাদের বীমা খাতকে সম্প্রসারিত করে এগিয়ে নেয়ার কথা, সেই বীমা কোম্পানি, বিআইএ ও আইডিআরএর প্রশ্নবিদ্ধ নানা অনিয়ম খাতটিকে সংকুচিত করছে, যা দুঃখজনক। দু-একটি বিদেশী কোম্পানি ভালো ব্যবসা যে করছে না, তা নয়। বীমা খাতের বিকাশের স্বার্থে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক সাজার ব্যবস্থা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেয়া দরকার।
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো একটি দেশের অর্থনীতির ধমনিতে রক্তপ্রবাহের মতো কাজ করে। কোনো কারণে এসব প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে কাজ করতে না পারলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিঘ্নিত হতে বাধ্য। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর মূল পুঁজিই হলো সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা। কোনো কারণে যদি সেই আস্থায় ভাঙন ধরে, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে ইন্স্যুরেন্স পলিসি গ্রহণের প্রবণতা খুবই কম। উন্নত দেশগুলোয় নাগরিকরা স্বেচ্ছায় বীমা পলিসি গ্রহণ করে। কিন্তু আমাদের দেশে বীমা পলিসি গ্রহণ করাকে অনেকেই অপ্রয়োজনীয় একটি কাজ বলে মনে করেন। এর মধ্যে বীমা কোম্পানিগুলো যদি অনিয়ম আর দুর্নীতিতে আবর্তিত হতে থাকে, তাহলে এ খাতের ভবিষ্যৎ ক্ষুণ্ন হতে বাধ্য। দেশের অর্থনীতির বৃহত্তম স্বার্থেই বীমা খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শৈথিল্য প্রদর্শন কাম্য নয়। কোম্পানিগুলোকে ইনোভেটিভ প্রডাক্ট, ই-প্রডাক্টসহ নতুন ও আকর্ষণীয় প্রডাক্ট বাজারে আনতে হবে। এছাড়া দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রচার থাকলেও ইসলামী বীমা সেভাবে জনপ্রিয় হয়নি। এর প্রসার বীমা খাতের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে হবে। এদিকে বিদেশী কোম্পানির সেবা নেয়ার জন্য মোটা অংকের পুনর্বীমা প্রিমিয়াম দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এটি বন্ধে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বাড়ছে জনসংখ্যা। বিশাল এ জনসংখ্যাকে বীমার আওতায় আনার জন্য কোম্পানিগুলোকে নতুন নতুন প্যাকেজ ও ইতিবাচক প্রচারণার ধারণা নিয়ে আসতে হবে। বীমার সুফল ও এতে যে বীমাকারী এবং তার পরিবারের লাভ হয়, সেটা বোঝাতে হবে। তবে সবার আগে গ্রাহকদের বীমা দাবি পূরণ ও হয়রানি-প্রতারণা বন্ধের নজির স্থাপন করার বিকল্প নেই। আইডিআরএ, বিআইএ ও সংশ্লিষ্ট সবার বিষয়টি ভাবা উচিত। দেশে বীমা কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেড়েছে সত্য, তবে খাতটি এখনো অপরিণত। দেশের ১ শতাংশেরও কম মানুষ বীমার আওতায় এসেছে। জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান ১ শতাংশেরও কম। এটি আরো বাড়াতে হবে। বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সুনির্দিষ্ট চাকরি বিধিমালা ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিধির অভাবও দক্ষতা বৃদ্ধির পথে একটি অন্তরায়। এসব কারণে বীমা ব্যবসা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। পরিণতিতে গ্রাহক সন্তুষ্টিও বাড়ছে না। একদিকে কোম্পানির প্রিমিয়াম আয়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বীমার অবদানও আশানুরূপ বাড়ছে না। এক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অ্যাকচুয়ারির সংকটের কারণে নতুন প্রডাক্ট তৈরি করতে বেগ পেতে হচ্ছে বীমা কোম্পানিগুলোকে। দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার অ্যাকচুয়ারি তৈরির উদ্যোগ নিতে পারে।