
খোন্দকার জিল্লুর রহমান
আত্মহত্যা একটি নিরব ঘাতক, এ রোগি নিজের রোগে নিজেই আক্রান্ত হন কোন প্রকার পুর্ব লক্ষন ব্যতিত। কোন ব্যাকটেরিয়া বা কোন ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত না হওয়ার কারনে এর পুর্ব প্রস্তুতি বা কোন প্রোটেক্সন নেওয়ার কোন কারণ বা কার্যকর হয়ে যাওয়ার পরবর্তি কোন ব্যাবস্থা গ্রহনের উপায় থাকে না। তাই এর কোন প্রতিকার নাই। বিশ্বের যেকোন দেশেই কোন ব্যাকটেয়িা বা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সামান্য কিছু লোক মারা গেলেও সারা বিশ্বে তা আলোড়ন শৃষ্টি করে, যেমন বর্তমান করোনা ভাইরাস, কিন্তুু আত্মহত্যা নামক নিরব ঘাতকে প্রতি বৎসর সারা বিশ্বে লক্ষলক্ষ লোকমারা গেলেও এ নিয়ে তেমন একটা মাতামাতি হয়না। শুধুমাত্র আদমশুমারির খাতাপত্রে সংখ্যা তথ্যের হিসাব ছাড়া ব্যাক্তিগত বা আভ্যান্তরিন ব্যাপার হিসাবেই আলোচনা বিহীন ভাবে থেকে যায়।
কোন সিডিউলিক রোগ না হলেও আত্মহত্যা একটা বিশেষ ধরনের মানষিক রোগ, যা একবার কাউকে পেয়ে বসলে এর থেকে পরিত্রান পাওয়া খুবই দুস্কর ব্যাপার। সারাবিশ্বে এর প্রবনতা বিরাজমান আছে। কোথাও এর প্রবনতা বেশী কোথাও কম। বিভিন্ন প্রকার জরিপে দেখা যায় সারা বিশ্বের আত্মহত্যার মাপকাঠিতে মার্কিনভুখন্ড তথা মার্কিনিরাই আত্মহত্যায় বেশী এগিয়ে রয়েছে। কাগজে-কলমে, শিক্ষা-দীক্ষায়, সভ্যতা, গনতন্ত্র ও সৃষ্টিশীলতায় এগিয়ে থাকলেও আইন-কানুন, বিচারব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রকার প্রতিবন্ধকতার চাপ পুরো মার্কিনিদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে। যদিও মার্কিনিরা এ তথ্য সহজে প্রকাশ বা প্রচার করতে চাননা, তবুও বিভিন্ন জরিপে তা বেরিয়ে আসে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রন এবং প্রতিরোধ তথ্য কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সাল ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আত্মহত্যার রেকর্ডের বছর। ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৪৮ হাজার ৩৪৪ জন (উক্ত রেকর্ডের বাহিরে আরো তথ্য আছে কিনা যানা যায় নাই) আত্ম্যহত্যা করেছেন, যা আগের বছর (২০১৭ সাল) এর পরিমান ছিল ৪৭ হাজার ১৭৩ জন। অর্থ্যাৎ ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে ১১৭১ জন বেশী আত্মহত্যা করেছেন। মার্কিন ফেডারেল সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রন এবং প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) থেকে ২০২০ সালের ৩০শে জানুয়ারি এ তথ্য জানানো হয়েছে। উক্ত সংস্থার জরিপ অনুযায়ী ১৯৯৯ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে মার্কিনিদের আত্মহত্যার হার বেড়েছে প্রায় ৩৫ ভাগেরও বেশী।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৃত্যুর (বিশেষ করে আত্মহত্যা জনিত মৃত্যু) বিভিন্ন কারণ থাকে, তা কখনোই একই রকম নয়, সাধারনত আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের কারনে যেগুলি হয়, তার মধ্যে সামাজিক, মানষিক, অর্থনৈতিক, অসুস্থতা, অপরাধজনিত, প্রশাসনিক, বিচারিক, অনৈতিক অবস্থা থেকে ফিরে আসতে না পারা, আত্মবিশ্ব্যাষের অভাব, জীবনের নিরাপত্যা, পাওয়া না পাওয়া ও আতঙ্ক থেকেই হয়। মার্কিন ফেডারেল সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রন এবং প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন কারনে মৃত্যুর অন্যতম কারণগুলির মধ্যে প্রধান যে ১০টি কারণ তার প্রথমটি হল আত্মহত্যা,অপরটি নিউমোনিয়া/ইনফ্লুয়েঞ্জা। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা জীবনের প্রতি মায়া ও আদেশ নির্দেশ (কমান্ড) মানতে গিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসতে না পারার আতঙ্ক থেকে আত্মহত্যা ইত্যাদি সহ অনোল্যেখিত বেশকিছু কারণ রয়েছে।
আত্মহত্যার এই হিসাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কিছু বিশেষ বিশেষ ব্যাক্তিদের অবাক করলেও আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব সুইসাইডোলজির বোর্ড মেম্বার এপ্রিল ফোরম্যান প্রচন্ড এক স্বাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি কোনভাবেই অবাক হইনি যে, আত্মহত্যা রোধে বিজ্ঞান ভিত্তিক কোন পদক্ষেপ নিতে এখন পর্যন্ত কেউই যতœবান হননি। এমন অবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা কখনোই। আত্মহত্যার প্রবনতাকে গুরুত্তের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত এবং মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই’। সিডিসির প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় প্রতি লাখে ১৪.২ জন আত্মহত্যা করেছেন। উক্ত তথ্যের ভিত্তিতে আরো জানা যায়, আত্মহত্যার সংখ্যা অর্ধ লাখের সামান্য কম হলেও প্রতি বছর আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে এমন মার্কিনির সংখ্যা ৯০ লাখেরও বেশী প্রায়।
সিডিসির প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এক কোটি ৬ লাখ মার্কিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এর মধ্যে চুড়ান্ত সিদ্ধন্ত নিয়েছেন ৩২ লাখ। অবশেষে আত্মহত্যার প্রক্রিয়া অবলম্বন করেন ১৪ লাখ।
তথ্যসুত্র : এনআরবি নিউজ।
লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।












