২০১০ সালের ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

মিউচুয়াল ফান্ড
অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ খাত হিসেবে ধরা হয় মিউচুয়াল ফান্ড। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও বাজার মূলধনের ৮০ থকে ৯০ শতাংশই থাকে মিউচুয়াল ফান্ডের। কিন্তু বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীদের গলার কাটায় পরিণত হয়েছে মিউচুয়াল ফান্ড। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত অনভিজ্ঞ সম্পদ ব্যবস্থাপক ও উচ্চ ব্যয়ের পোর্টফলিওর জন্য লাভজনক হচ্ছে না এ ফান্ডগুলো। আবার অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন ফান্ডে বিনিয়োগের অর্থের ব্যবহারের খাত নিয়ে।
মিউচুয়াল ফান্ডগুলো মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে পুঁজিবাজারেই বিনিয়োগ করে। শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত মুনাফা দিয়েই চলে ফান্ড ব্যবস্থাপকরা। বিনিয়োগকারীদেরও বছর শেষে মুনাফা দিয়ে থাকেন।
বর্তমানে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ছয়টি ফেস ভ্যালুর (অভিহিত মূল্যে) উপরে রয়েছে। বাকি ৩১টির ইউনিট দর নেমে গেছে অভিহিত মূল্যের নিচে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে তালিকাভুক্ত সিএপিএম আইবিবিএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি ইউনিট হাতবদল হচ্ছে অভিহিত মূল্যের নিচে আট টাকা ১০ পয়সায়।
গত এপ্রিল মাসে অভিহিত মূল্যের নিচে ছিল ২৭টির দর। এক মাসের ব্যবধানে মে মাস শেষে সেখানে আরও যোগ হয় সিপিএম আইবিবিএল ইসলামিক ফান্ড, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও ভ্যানগার্ড এএমএল রূপালী ব্যাংক ব্যালান্সড ফান্ড। ফলে সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩০-এ। গত দুই মাস শেষে এ সংখ্যা এখন ৩১-এ উঠেছে।
ডিএসইর তথ্য বলছে, ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত হয়েছে ২০১০ সালে। এর পরের বছরে তালিকাভুক্ত হয়েছে ১১টি। এক সময়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের অন্যতম খাত ছিল মিউচুয়াল ফান্ড। অভিহিত মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দরে হাতবদল হয়েছিল ইউনিটগুলো। কিন্তু এখন বছর শেষে ভালো মুনাফা না দিতে পারায় ক্রমেই এ খাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। বেশি দামে যারা কিনেছেন, তারা এখন মুনাফা ছাড়াই এ খাত থেকে বের হতে চাইছেন। কিন্তু বের হতে পারছেন না।
২০১০ ধস-পরবর্তী পুঁজিবাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার এখনও মন্দা চলছে। অন্যান্য খাত কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও এখানে বিনিয়োগকারীরা এ খাতে প্রবেশ করার সাহস করছেন না। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীদেরও আকৃষ্ট করতে পারছে না এ খাত। আর ফান্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। হাতে থাকা ইউনিটগুলো বিক্রি করে দিতে চাইছেন। এ জন্য নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছে না তারা।
অবশ্য পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ খাত হচ্ছে মিউচুয়াল ফান্ড। এখন ছয়টি বাদে সবগুলোর দামই অভিহিত মূল্যের নিচে। এ খাতে বিনিয়োগের সময় এখন। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে মুনাফা নিতে চাইলে এখন ভালো সময়।
জানা গেছে, ২০১০ সালে তালিকাভুক্ত ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর এখন ছয় টাকা ৪০ পয়সা। পরের বছর অর্থাৎ ২০১১ সালেও ১১টি মিউচুয়াল ফান্ড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। এর পরের বছর থেকে কমতে শুরু করে মিউচুয়াল ফান্ডের তালিকাভুক্তি। সর্বশেষ ২০১৭ সালে দুই শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ পুনর্বিনিয়োগের সুবিধা দিয়েছে ফান্ডটির সম্পদ ব্যবস্থাপক। গত দুই বছরের মধ্যে ২০১৭ সালের ২৪ জানুয়ারি ইউনিটটির দর সর্বোচ্চ আট টাকা ৬০ পয়সায় উঠেছিল। এরপর থেকে শুধু দর কমছেই।
অভিহিত মূল্যের কিছুটা ওপরে রয়েছে প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর। সর্বশেষ ইউনিটগুলো হাতবদল হয়েছে ১১ টাকা ২০ পয়সায়। ফান্ডটিতে গত জুন শেষে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে মাত্র দুই শতাংশ। সুযোগ বুঝেই উদ্যোক্তা-পরিচালকরাও ইউনিট বিক্রি করে চলে যাচ্ছেন। যেভাবে দর কমার প্রবণতা বলছে, শিগগিরই এটির দরও অভিহিত মূল্যের নিচে চলে যাবে।
অপরদিকে এখনও দুটি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর অভিহিত মূল্যের খুব কাছেই অবস্থান করছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে তালিকাভুক্ত এশিয়ান টাইগার সন্ধানী লাইফ গ্রোথ ফান্ডের ইউনিট হাতবদল হয়েছে ১০ টাকা ৮০ পয়সায়। অপরটি হচ্ছে, ২০১১ সালে তালিকাভুক্ত ‘রিলায়েন্স ওয়ান’ দ্য ফার্স্ট স্কিম অব রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স মিউচুয়াল ফান্ড। সর্বশেষ ফান্ডটির প্রতি ইউনিট হাতবদল হয়েছে ১০ টাকা ৩০ পয়সায়। ২০১৭ সালে তালিকাভুক্ত সিএপিএম বিডিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড শূন্য এক-এর দর সাত টাকা ৯০ পয়সা। নতুন ফান্ডগুলোও ভালো করছে না।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ফান্ড ব্যবস্থাপক জানান, ‘২০১০ সালে পুঁজিবাজাররে ধস নামার পূর্ব পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের জায়গায় ছিল ফান্ডগুলো। তখন ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত হাতবদল হয়েছে ফান্ডগুলোর ইউনিট। কিন্তু বাজার ধসে অন্যান্য খাতের মতো মিউচুয়াল ফান্ডেরও দর কমে যায়। এখন বছর শেষে ভালো মুনাফা দিতে পারছে না। ফলে বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে পারছে না মিউচুয়াল ফান্ড।’
অবশ্য এখনও মন্দার বাজারে তিনটি ফান্ড কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে এনএলআই ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড হাতবদল হচ্ছে ১৪ দশমিক ৮০ টাকায়, সাউথইস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটপ্রতি হাতবদল হচ্ছে ১৩ দশমিক ৮০ টাকায় ও সর্বোচ্চ দর নিয়ে বর্তমানে হাতবদল হচ্ছে গ্রামীণ ওয়ান: স্কিম-টু। ফান্ডটির ইউনিট সর্বশেষ হাতবদল হয়েছে ১৬ দশমিক ৮০ টাকায়।
এ বিষয়ে ডিএসইর ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন ডিবিএ’র প্রেসিডেন্ট মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, ‘মূলত ২০১০ সালে বাজারে আসা অধিকাংশ ফান্ড ব্যবস্থাপক ছিল অনভিজ্ঞ। তাদের পোর্টফলিও ছিল উচ্চ ব্যয়ের। ফলে লস হচ্ছে তাদের। এখন অনেকেই ভালো অভিজ্ঞতা নিয়ে পরিচালনা শুরু করেছেন। কিছুটা সময় লাগবে স্বাভাবিক হতে।’
অনভিজ্ঞতার পাশাপাশি বর্তমানে ফান্ড পরিচালনার জন্য সংগ্রহকৃত অর্থের বিনিয়োগের খাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হচ্ছে না এসব অর্থ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়ে তারা বলছেন, মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ আসলেই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হচ্ছে কিনাÑতা দেখতে হবে।