
অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
আমদানিসহ দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২১ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে চাহিদা সাড়ে ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার মেগাওয়াট। ফলে অব্যবহূত থাকছে প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা। সক্ষমতা অলস পড়ে থাকলেও পণ্য উৎপাদনের জন্য নিজস্ব বিদ্যুতেই ভরসা করছে শিল্প-কারখানাগুলো।
জাতীয় গ্রিড থেকে কাঙ্ক্ষিত ভোল্টেজ ও ফ্রিকোয়েন্সির বিদ্যুৎ না পাওয়ায় দেশের শিল্প-কারখানাগুলোকে এখনো জেনারেটরভিত্তিক তথা ক্যাপটিভ পাওয়ারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে জানান শিল্পমালিকরা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) দৈনিক উৎপাদন প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ ডিসেম্বর সারা দেশে প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৬ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। তবে বৈকালিক উৎপাদন ছিল ৭ হাজার ৯৯১ মেগাওয়াট। গত ২৮ ডিসেম্বর সারা দেশে ডে আওয়ারে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মোট ৭ হাজার ১৪৪ মেগাওয়াট। আর সন্ধ্যায় ছিল ৮ হাজার ৮৯১ মেগাওয়াট। এ হিসাবে ১০-১১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা বসিয়ে রাখা হচ্ছে। এর অধিকাংশই রেন্টাল, কুইক রেন্টাল ও ব্যক্তি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্র।
উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহূত থাকার পরও ক্যাপটিভ বিদ্যুতের উৎপাদন চালু রাখছেন শিল্পমালিকরা। ক্যাপটিভ পাওয়ারের জেনারেটরের জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ও তেল ব্যবহার হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহকৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩ টাকা ১৬ পয়সা। আর গ্রিড থেকে শিল্প খাতে ব্যবহূত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৮ থেকে ১০ টাকা ৬ পয়সা।
অন্যদিকে ক্যাপটিভ পাওয়ার উৎপাদনে ব্যবহূত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৯ টাকা ৬২ পয়সা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহূত গ্যাসের চেয়ে এ গ্যাসের দাম তিন গুণ হলেও ব্যবসায়ীরা বেশি দামেই এ গ্যাস ব্যবহার করে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করছেন। এর ফলে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলেও এতেই আস্থা রাখছেন তারা। শিল্পমালিকরা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনের জন্য যে ভোল্টেজ ও ফ্রিকোয়েন্সির বিদ্যুৎ দরকার বিতরণ কোম্পানিগুলো তা দিতে পারছে না। বিতরণ কোম্পানির বিদ্যুতে মেশিনারিজ চালিয়ে উৎপাদিত পণ্য দিয়ে আমরা বায়ারদের সন্তুষ্ট করতে পারি না। নিম্নমানের চাপ ও কখনো কখনো বিভ্রাটের কারণে পণ্যে ত্রুটি দেখা যায়। যে কারণে ব্যয় বেশি হলেও পণ্য উৎপাদনে ব্যবহূত যন্ত্রপাতির জন্য নিজস্ব বিদ্যুতের উৎস তথা ক্যাপটিভের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে কারখানার লাইট, ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) চালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আলামিন এ প্রসঙ্গে বলেন, কারখানার মেশিনারিজ সচল রাখার জন্য যে ধরনের ভোল্টেজ ও ফ্রিকোয়েন্সি দরকার, বিতরণ কোম্পানির লাইন থেকে তা পাওয়া যায় না। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারখানার এমন কিছু ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশ আছে, যেগুলো চালু অবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে পুনরায় তা চালু হতে অনেক সময় লাগে। এতে পণ্য উৎপাদনে সমস্যা হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদর্শ ব্যবস্থায় বিদ্যুতের চাহিদা হ্রাস-বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রাখে শিল্প খাত। কিন্তু বাংলাদেশে হচ্ছে এর উল্টোটা। এখানে বিদ্যুতের চাহিদা হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ধারিত হয় আবাসিক খাতের ব্যবহারের ওপর, টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য যা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিপিডিবির সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, খাতভেদে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুতের ব্যবহার হয় আবাসিকে। মোট জাতীয় বিদ্যুতের ৫৩ শতাংশ বৈদ্যুতিক লাইট, পাখা, এসি ও রেফ্রিজারেটর চালাতে ব্যবহার হয়। শিল্প খাতে ব্যবহার হয় ৩৩ শতাংশ, যার অধিকাংশই আবাসিকের মতো লাইট, পাখা ও এসি চালু রাখতে। কিন্তু সুতা, কাপড়সহ অন্যান্য শিল্পপণ্য উৎপাদনে যেসব যন্ত্রাংশ ব্যবহার হয়, সেগুলো চালু রাখা হচ্ছে ক্যাপটিভ বিদ্যুতে।
ক্যাপটিভ বিদ্যুতে পণ্য উৎপাদন সচল রাখা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অ্যাম্বার ডেনিম মিলস লিমিটেড। কোম্পানিটির মহাব্যবস্থাপক হামিদুর রহমান বলেন, কোয়ালিটি বিদ্যুৎ ও ব্যয় সাশ্রয়ের দিক বিবেচনায় নিয়ে তারা গ্যাসভিত্তিক ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
এদিকে শীত মৌসুমে বৈদ্যুতিক পাখা ও ফ্রিজ চালু রাখতে বিদ্যুতের ব্যবহার কমে আসে। এতে গ্রীষ্মের তুলনায় শীতে বিদ্যুতের চাহিদা অর্ধেকে নেমে আসে। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হয়। যদিও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, ব্যক্তি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পরিশোধ করতে হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যায়, সে উপায় খুঁজছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর অংশ হিসেবে প্রণোদনা দিয়ে হলেও শিল্প খাতে ক্যাপটিভ পাওয়ারের ব্যবহার কমিয়ে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে শিল্পমালিকদের উৎসাহ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনে শিল্প এলাকায় আলাদা লাইনের ব্যবস্থা করা, বিদ্যুতের মূল্যহার পুনর্র্নিধারণসহ নানা পদক্ষেপও নিতে পারে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিষয়টি নিয়ে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, বিদ্যুতের ব্যবহার ছোট গ্রাহক অর্থাৎ আবাসিকে বেশি। কিন্তু আমরা এখন শিল্প গ্রাহকের দিকে বেশি জোর দিচ্ছি। কারণ তাদের জন্যই তো বিদ্যুতের এত সক্ষমতা বাড়ানো। শিল্পমালিকরা রিলায়েবল ও আনইন্টারাপ্টেড বিদ্যুতের কথা বলে আসছেন। আমরা তাদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনে ১৩২ কেভি তথা প্রধান জাতীয় সঞ্চালন লাইন থেকেও বিদ্যুৎ দিতে চাচ্ছি।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। যদিও ক্যাপটিভ থেকে বর্তমানে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তার পুরোপুরি তথ্য বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে পাওয়া যায়নি। তবে ক্যাপটিভ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সূত্র : বণিক বার্তা










