মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসসহ পরিবারের সবাই টাকা না দিয়েই পরিচালক

অর্থনীতির ৩০ দিন সংবাদ :
মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস কোনো টাকা না দিয়েই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং পরিচালক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিচালক হতে তিনি অসদুপায় অবলম্বনসহ কিছু অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়েছেন। কোম্পানির দুটি ব্যাংক হিসাব বন্ধক রেখে এর বিপরীতে ঋণ নিয়েছেন। সেই ঋণের টাকাই আবার পে-অর্ডার করেছেন তিনি।
উপরন্ত মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস নিজের পরিবারের সদস্যদেরও একইভাবে সুবিধাভোগী বানিয়েছেন। এঁদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী ফজলেতুন নেছা, ছেলে মোস্তফা কামরুস সোবহান, ছোট মেয়ে তাসনিয়া কামরুন আনিকাসহ আরও অনেক পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার রয়েছেন। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আমরা এখন সোনালী লাইফের বিনিয়োগের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি। বিনিয়োগের সঙ্গে অন্য অনেক বিষয়ও উঠে আসছে। তথ্য চাওয়া হলেও কোম্পানিটি সব তথ্য দিতে গড়িমসি করছে।
এ নিয়ে আইডিআরএ’র মুখপাত্র ও পরিচালক,জাহাঙ্গীর আলম,
মুঠোফোনে সোনালী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা রাশেদ বিন আমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
বিমা আইন অনুযায়ী জীবনবিমা কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন হতে হয় কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তাদের অংশ ১৮ কোটি। বাকি ১২ কোটি টাকা পুঁজিবাজারের মাধ্যমে সংগ্রহের বিধান রয়েছে।
২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠাকালে সোনালী লাইফের উদ্যোক্তা পরিচালক ছিলেন ১২ জন, বর্তমানে ২০ জন হয়েছে। শুরুর দিকে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের বড় মেয়ে ফৌজিয়া কামরুন সোবহান, বড় ছেলে মোস্তফা কামরুস সোবহানের স্ত্রী সাফিয়া সোবহান চৌধুরী এবং ছোট মেয়ে তাসনিয়া কামরুন আনিকার স্বামী শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল পরিচালক হন। পরে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসসহ একে একে তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা পরিচালক হন।

আইডিআরএর মুখপাত্র ও পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম গত ২৭ ডিসেম্বর জানান, ‘আমরা এখন সোনালী লাইফের বিনিয়োগের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি। বিনিয়োগের সঙ্গে অন্য অনেক বিষয়ও উঠে আসছে। তবে দুই দফায় তথ্য চাওয়া হলেও কোম্পানিটি সব তথ্য দিতে গড়িমসি করছে।’ পরিচালকদের পক্ষ থেকে পরিশোধিত মূলধনের টাকা পরিশোধ না করার বিষয়টি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ভালো বলতে পারবে বলে জানান জাহাঙ্গীর আলম।
আইডিআরএর প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, যেসব পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার টাকা জমা না দিয়ে সোনালী লাইফের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস; তাঁর স্ত্রী ফজলেতুন নেছা; ছেলে মোস্তফা কামরুস সোবহান ও তাঁর স্ত্রী সাফিয়া সোবহান চৌধুরী; দুই মেয়ে ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া ও তাসনিয়া কামরুন আনিকা; তাসনিয়া কামরুন আনিকার স্বামী শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল এবং নুরুন্নবী, আবদুল লতিফ মানিক, বোরহান উদ্দিন, ওয়াসের হোসাইন।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, ‘পরিশোধিত মূলধনের অর্থ পরিশোধ না করা গুরুতর অন্যায়। সোনালী লাইফের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা যদি এ অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকেন, আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। তবে এ ব্যাপারে যে কোনো ব্রবস্থার প্রায়োগিক দায়িত্ব হলো আইডিআরএর।’
তবে কারসাজি যেভাবে করা হয়েছে…
২০১৮ সালের ১৫ মে উদ্যোক্তাদের অংশে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধির অনুমোদন দেয় আইডিআরএ। এরপর ওই বছরের ২৬ জুন ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকার শেয়ার ক্রয় দেখানো হয় ১০ জন উদ্যোক্তা পরিচালকের নামে। এটা নিয়েই উঠেছে মূল অভিযোগ। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের নতুন করে ছাড়া মোট শেয়ারের পরিমাণ হচ্ছে ১ কোটি ৫ লাখ।
আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ও কয়েকজন পরিচালক নিজ নিজ নামে আলাদা পে-অর্ডার করে কোম্পানির তহবিলে শেয়ারের মূল্য পরিশোধ করেছেন বলে দেখিয়েছেন। তবে পে-অর্ডারগুলো করা হয়েছিল সোনালী লাইফের স্থায়ী আমানত (এফডিআর) বন্ধক রেখে নেওয়া ঋণের টাকা তুলে। সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকে (এসবিএসি) সোনালী লাইফের এফডিআর ছিল ১০ কোটি টাকা। ওই এফডিআরের বিপরীতে এক চেকে ৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়।
আরেকটি হিসাব থেকে ভিন্ন চেকে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়। কৌশলে এই তৎপরতার নেতৃত্ব দেন সোনালী লাইফের চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস। আলাদা পে-অর্ডারে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা দেখানো হয় এসএবিসিতে থাকা সোনালী লাইফের আরেকটি ব্যাংক হিসাবে। এর মধ্যে ছয়জন পরে শোধ করলেও মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসসহ তাঁর পরিবারের তিন সদস্যসহ অন্যান্য কয়েকজনও টাকা পরিশোধ করেননি।
এব্যপারে সোনালী লাইফের চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস দাবি করেন, তিনি কোনো জালিয়াতি বা কারসাজির সঙ্গে যুক্ত নন। কোম্পানিটি ভালো করছে বলে একটি গোষ্ঠীর ঈর্ষার কারণ হয়েছে। এ কারণেই নানা কথা ছড়ানো হচ্ছে।

অপরদিকে আইডিআরএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ কোটি ৫ লাখ শেয়ারের মধ্যে ৭৩ লাখ ৯০ হাজার শেয়ার বিক্রি দেখানো হয় ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া, শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল, সাফিয়া সোবহান চৌধুরী ও রূপালী ইনস্যুরেন্সের নামে। তাঁদের শেয়ার থেকে পরে আরও ছয়জনের নামে শেয়ার হস্তান্তর দেখানো হয়। এই ছয়জনের মধ্যে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস, তাঁর স্ত্রী ফজলেতুন নেছা, ছেলে মোস্তফা কামরুস সোবহান ও মেয়ে তাসনিয়া কামরুন আনিকাও রয়েছেন। আরও আছেন সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের স্ত্রী হানুফা আক্তার রিক্তা ও নুরুন্নবী নামের একজন। নাম না বলার শর্তে খাত সংশ্লিষ্ট অনেকের মতামতসহ এ ব্যাপারে এ ব্যাপারে অতি সম্প্রতি কিছু পত্র পত্রিকা সংবাদ অনুযায়ী বীমা উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী সোনালী লাইফ কোম্পানিটি খুব ভালো করতেছে বলে উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে খাত সংশ্লিষ্ট কারো কারো নিকটস জানতে চাইলে কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি।
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, নূর ই হাফজা, কামরুন নাহার, মায়া রানী রায়, আহমেদ রাজিব সামদানি, হুদা আলী সেলিম ও হাজেরা হোসাইনসহ ছয়জন পরিচালক পরে শেয়ারের মূল্য পরিশোধ করেছেন।
এ নিয়ে সোনালী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা রাশেদ বিন আমানের কাছে মুঠোফোনে (০১৭৪৬ ১১ ৭১ ৬৫) জানতে চাইলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষক মো. মাইন উদ্দিন এর মতে, ‘টাকা পরিশোধ ছাড়া কেহ পরিচালক হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের পরিচালক পদ থেক বাদ দেওয়া উচিত এবং আইডিআরএ ও বিএসইসি এ ব্যাপারে যথা সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে এ অবহেলার খেসারত দিতে হতে পারে সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের বিমা গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের।’