
অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে আগের মুদ্রানীতিতে খুব একটা পরিবর্তন না এনে ‘সতর্ক’ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের এই মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হলেও বেসরকারি খাতের ঋণের লাগাম টেনে ধরা হয়েছে।
জানুয়ারি-জুন সময়ের নতুন এই মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতির ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। তবে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
মঙ্গলবার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে গভর্নর ফজলে কবির এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বলেন, আগের ধারাবাহিকতায় প্রবৃদ্ধিবান্ধব এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি পরিমিত রাখার লক্ষ্যে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। মুদ্রানীতির প্রথম মূখ্য উদ্দেশ্যে হচ্ছে মূল্যস্ফীতি পরিমিত রাখা। আমাদের আগের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার যে কৌশল আমরা নিয়েছিলাম তাতে সফল হওয়া গেছে।
পরিসংখ্যান নিয়ে তিনি বলেন, ২০১৮ সালের জুন শেষে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশে নেমে এসেছে। যা বাজেটে ঘোষিত ৫ দশমিক ৬ শতাংশ লক্ষ্যের নীচে।
বাম্পার ফলনের কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশংকা নেই। তবে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উর্ধ্বমুখি। এই চাপ অব্যাহত থাকার লক্ষণই খো যাচ্ছে। ফলে নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যষ্ফীতি পরিমিত রাখায় সতর্কতা শিথিল করার অবকাশ এখনো নেই।
‘মুদ্রানীতির দ্বিতীয় মূখ্য উদ্দেশ্য জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সমর্থন যোগানা’ উল্লেখ করে ফজলে কবির বলেন, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবিৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধেও বজায় থাকে।
‘জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে দেশী-বিদেশী চাহিদার কারণে উৎপাদন কর্মকান্ডের জন্য উপকরণাদি আমদানির ১৭.৯২% বেড়েছে। রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৪.৪% বৃদ্ধি তারই সাক্ষ্য’ উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান বলেন, উৎপাদন কর্মকান্ডে কোন বিঘè ব্যতিরেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কর্মকান্ডের ধারা আরও জোরালো হবে।
৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমেছে তথ্য দিয়ে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু ডিসেম্বর শেষে দেখা যায় এ খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যের চেয়ে অনেক কম হয়েছে; ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য অনিশ্চয়তার উৎকণ্ঠা এর একটি কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ লক্ষ্যের চেয়ে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে বলে তথ্য দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান।
গভর্নর তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-জুন সময়ে মুদ্রা ও আর্থিকনীতি কার্যক্রমের সামগ্রিক সফলতার প্রেক্ষাপটে নতুন মুদ্রানীতিতে বড় কোন পরিবর্তন আনার প্রয়োজন অনুভূত হয়নি।রেপো ও রিভার্স রেপো সুদ হার ৬ শতাংশ এবং ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে।

অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।তবে অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতির গতিধারা বিবেচনায় নিয়ে নতুন মুদ্রানীতে জুন শেষে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের ৮ দশমিক ৫ এবং ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে সংশোধন করে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৯ এবং ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে বলে জানান গভর্নর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। আর গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার আশা করা করা হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আর গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার আশা করা করা হয়েছিল।
অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে। আর পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ। গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বরাবরের মতো এবারও নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের ঘোষিত আর্থিক নীতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে প্রতি অর্থবছরে দুটি মুদ্রানীতি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।










