বিএসইসির চেয়ারম্যান এনআরবিসি ব্যাংক লুটেরাদের সহযোগী

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জে কমিশন (বিএসইসি) এর বর্তমান চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ছিলেন এনআরবিসি ব্যাংকের বিতর্কিত চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল, ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মিয়াঁ আর্জু ও এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমামের নেতৃত্বাধীন সংঘবদ্ধ আর্থিক দুর্নীতি চক্রের অন্যতম সেনানী। তমাল কর্তৃক ব্যাংক দখলের সাথেসাথেই ২০১৮ সালের এপ্রিলে রাশেদ মাকসুদ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন এবং দুর্নীতির মাফিয়া সিন্ডিকেট গঠনে তমাল-আর্জু-আদনানের প্রধান সহযোগী হয়ে ওঠেন।
এনআরবিসি ব্যাংকের সকল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, সরঞ্জামাদি ক্রয়, শাখা-উপশাখার ডেকোরেশন ও গাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন সেবা সরবরাহের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রন নিতে ২০১৮ সালে এনআরবিসি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড নামে একটি স্বতন্ত্র কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন তমাল, আরজু ও আদনান। যাত্রা শুরুর সময়ের আরজেএসসি অনুমোদিত সংঘবিধি অনুসারে ব্যাংকের মালিকানায় এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের ২ লাখ বা ৯ দশমিক ১৪ শতাংশ শেয়ার ছিল। অপরদিকে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৩৮৩টি বা ১৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা গ্রহণ করেন পারভেজ তমাল। রফিকুল ইসলাম মিয়া আরজু ও আদনান ইমামের প্রত্যেকের ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৬১টি বা ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ করে শেয়ার ছিল। এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের মালিকানা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের তিন শীর্ষ পদধারীর জানা স্বত্ত্বেও, এসময় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থাকা রাশেদ মাকসুদ একচেটিয়া ব্যাংকের সকল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, সরঞ্জামাদি ক্রয়, শাখা-উপশাখার ডেকোরেশন ও গাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন সেবা সরবরাহের কার্যাদেশ এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের অনুকূলে প্রদান করেন। তাছাড়া, শুধুমাত্র লুটপাটের উদ্দ্যেশ্যেই রাশেদ মাকসুদের অনুমোদনে ব্যাংকের কর্মকর্তা ল্যাফটেনেন্ট কমান্ডার (অবঃ) ফরহাদ সরকারকে ব্যাংকের চাকুরীতে থাকা অবস্থায় পরিচালকদের মালিকানাধীন এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের এমডি ও সিইও হিসেবে ডেপুটেশনে পদায়ন করা হয়, যা ব্যাংকের সম্পুর্ণ স্বার্থবিরোধী কাজ। এভাবেই ব্যাংকের দুর্নীতিগ্রস্থ পরিচালকদের যোগসাজশে শতকোটি টাকা আত্মসাতে সহায়তা করেছেন রাশেদ মাকসুদ।
১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৭৮তম বোর্ড মিটিংয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদ মাকসুদের সুপারিশে এনআরবিসি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের অনুকূলে ৬০.০০ কোটি টাকার কম্পোজিট ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি অনুমোদন করা হয়, যন্মধ্যে ২০.০০ কোটি টাকার অমনিবাস ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি ও ৪০.০০ কোটি টাকার লিজ ফাইন্যান্স ফ্যাসিলিটি অন্তর্ভূক্ত ছিলো। এখানে উল্লেখ্য যে, অমনিবাস ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি বিশেষ ধরনের ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি, যেখানে লোন গ্রহনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ইচ্ছাই প্রাধান্য পায়। গ্রাহক তার ইচ্ছেমাফিক যেকোন ধরনের ফান্ডেড না ননফান্ডেড লোন নিতে পারেন।
এনআরবিসি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং এনআরবিসি ব্যাংক তাদের একমাত্র সেবা গ্রহিতা বা গ্রাহক। এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান ও এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান একই ব্যক্তি হওয়ায় এবং পরিচালকেরা উভয় প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকায়, লোন অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ এর ১৮ (৬) ধারা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী জারিকৃত “ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে লেনদেন সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান” সংক্রান্ত বিআরপিডি ৪নং সার্কুলারের পরিপন্থী।

এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআইসিএসডি কর্তৃক পরিচালিত ২০২২ সালের বিশেষ পরিদর্শন ও অনুসন্ধান রিপোর্টে ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যানের সিংহভাগ মালকানায় থাকা এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের সাথে ব্যাংকের একচেটিয়া ব্যবসা, নিয়োগ বানিজ্য, অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আদায়, ব্যাংকের নিজস্ব প্রকিউরমেন্ট পলিসি লঙ্ঘন ও বিধিবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকের মুনাফা হ্রাসের বিষয়ে আপত্তি উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল ও তার পিতা শাহজাহানের বেনামী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লান্তা সার্ভিসেসের নামে পূর্বের ৩.০০ কোটি টাকার বেনামী লোন নিয়ে বোর্ডের আপত্তি ও উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষন থাকা স্বত্ত্বেও (কোম্পানী ম্যাটার ২৫৯/২০১৬), ১৯.০২.২০১৯ তারিখে অনুষ্ঠেয় ৭৮তম পর্ষদ সভায় রাশেদ মাকসুদের সুপারিশে লান্তা সার্ভিসেসের নামে ৪.৫০ কোটি টাকার কম্পোজিট ক্রেডিট লিমিট প্রদান করা হয়। এই লোন প্রপোজাল অনুমোদনের সময় এই প্রতিষ্ঠানের সাথে তমাল পারভেজের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কোন ডিক্লারেশন দেয়া হয় নাই। এই লোনের বিপরীতে কোন সহায়ক জামানতও নেয়া হয় নাই। তাছাড়া পারভেজ তমাল সেই বোর্ড সভায় নিজে উপস্থিতও ছিলেন। ৩০.০৩.২০১৯ তারিখে অনুষ্ঠিত পরবর্তী ৭৯তম বোর্ড মিটিংয়েই কম্পোজিট ক্রেডিট লিমিট ৪.৫০ কোটি থেকে বৃদ্ধি করে ৬.৫০ কোটি করা হয়। আবার ২৭.০৬.২০১৯ তারিখে অনুষ্ঠিত ৮২তম পর্ষদ সভার ৩৭তম এজেন্ডা অনুসারে লান্তা সার্ভিসেস লিমিটেডের নামে ১.৬০ কোটি টাকার হায়ার পারচেজ লোন অনুমোদন হয়। হায়ার পারচেজ লোনটি “মেমো থ্রু সার্কুলেশনের” মাধ্যমে বিশেষ বিবেচনায় অনুমোদন দেয়া হয় অথচ এই লোনটি সার্কুলেশন মেমো হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় মতন গুরুত্বপূর্ণ বা জরুরী ছিলো না। এই লোনের বিপরীতে কাস্টমারের কাছ থেকে কোন প্রকার ইকুইটিও নেয়া হয় নাই। শুধুমাত্র চেয়ারম্যানের স্বার্থসিংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবেই লান্তা সার্ভিস এই বিশেষ সুবিধা ভোগ করে। লানতা সার্ভিসেস লিমিটেডের বনানী শাখার একাউন্ট নং ০১২১৩৩৩০০০০০৩৫০ পর্যালোচনা করে পাওয়া যায় যে, ১.৬০ কোটি টাকার হায়ার পারচেজ লোনটি ০৩.০৬.২০১৯ তারিখে ডিসবার্সমেন্ট করা হয় এবং পে-অর্ডার নং ৬৯৬৬৯৯ এর মাধ্যমে এজি অটোমোবাইলসকে এই অর্থ প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ২০.০৭.২০১৯ তারিখে অনুষ্ঠিত ৮৪তম পর্ষদ সভার ৪৩তম এজেন্ডার মাধ্যমে ল্যান্ড রোভার গাড়ী ক্রয়ের জন্য ২.৪২ কোটি টাকার হায়ার পারচেজ লোন অনুমোদন দেয়া হয়। কাস্টমার গাড়ীর মূল্যের মাত্র ১৫ শতাংশ ইকুইটি হিসেবে দেয়ার অনুমতি পায়। এভাবে পর্ষদের চেয়ারম্যানের নির্দেশে ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্তৃক ব্যাংকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানকে ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে অস্বাভাবিক সুবিধা দেয়া ক্রেডিট নর্মসের পরিপন্থী। ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই অনিয়মের দায় এড়াতে পারেন না।
রাশেদ মাকসুদ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালীন তমাল-আর্জু-আদনানের নির্দেশে ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০১৯ অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৭৮তম পর্ষদ সভায় পাবনার রুপপুর শাখার গ্রাহক পাপারোমা নামে ৫.০০ কোটি টাকার ওভারড্রাফট ঋণ অনুমোদন করেন। ঋনের অর্থে রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন ১৭৩.৫০ শতাংশ জমি পাপারোমার মালিকানায় ক্রয় করা হয়। কিন্তু ঋণ অনুমোদন ও জমি ক্রয়ের পূর্বেই ঋনের সহায়ক জামানত হিসেবে উপরোল্লিখিত ১৭৩.৫০ শতাংশ জমিকেই দেখানো হয়। ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক ঋনের আবেদনে ভুল তথ্য প্রদান ও ঋণের টাকা ছাড় করে সহায়ক জামানত ক্রয় সম্পূর্ণ বে-আইনী ও সুশাসনের পরিপন্থী। তাছাড়া, এই ঋন অমুনোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট পলিসিকেও সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি এন্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিভিশনের ২৪.০৫.২০২২ থেকে ২৮.০৪.২০২২ এবং ১০.০৫.২০২২ থেকে ১৫.০৫.২০২২ পর্যন্ত সর্বমোট ১৫ কার্যদিবস পরিচালিত বিশেষ পরিদর্শনে পাপারোমার ঋনের অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশিত হয়। কিন্তু তমাল-আর্জু-আদনানের সাথে সখ্যতার কারনে সেসময়ের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীরের নির্দেশে ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদ মাকসুদসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহন করা হয় নাই।
তাছাড়া, রাশেদ মাকসুদ ব্যাংকের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালীন ব্যাংকের নতুন শাখা উপশাখার ডেকোরেশন করার জন্য তমাল-আর্জু-আদনানের মালিকানাধীন এনআরবিসি ম্যানেজমেন্ট ও লান্তা সার্ভিসেসকে একচেটিয়া কাজ কার্যাদেশ প্রদান করেছেন এবং সন্তোষজনক কারন ছাড়াই কার্যাদেশের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করেছেন। ২৬.১১.২০১৮ তারিখে অনুষ্ঠিত ৭৪ তম পর্ষদ সভার ৫১তম এজেন্ডায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নেত্রোকোনার পূর্বধলা শাখার ডেকোরেশনের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান টেন্ডার আবেদন করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে অৎপযরপড়হং, খধহঃধ ঋড়ৎঃঁহধ চৎড়ঢ়বৎঃরবং খরসরঃবফ ্ অফৎরঃধ ঞৎধফরহম। টেন্ডারে অৎপযরপড়হং সর্বনিম্ন দর দিলেও পরে তারা এই দামে কাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করায়, কাজটি লান্তা ফরচুনা প্রপারটিজকে দেয়া হয় এবং গুণমান সম্পন্ন কাজ করার জন্য টেন্ডার প্রাইজের চেয়ে ১০% দাম বেশী ধরে কাজের মূল্য নির্ধারন করা হয়। ২৭.০৬.২০১৯ তারিখে অনুষ্ঠিত ৮২তম পর্ষদ সভার ৪২,৪৩,৪৪ ও ৪৬তম এজেন্ডার মাধ্যমে মাদারগঞ্জ, রাজবাড়ী, রামপুরা, বরগুনা শাখার ডেকোরেশনের কাজ ও ৫৪তম এজেন্ডার মাধ্যমে বিভিন্ন শাখায় ফার্নিচার সরবরাহের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। ২০.০৭.২০১৯ তারিখে অনুষ্ঠিত ৮৪তম পর্ষদ সভার ৩০তম এজেন্ডার মাধ্যমে বরগুনা শাখা ও রাজবাড়ী শাখার ডেকোরেশনের কার্যাদেশের মূল্য বৃদ্ধি করে লান্তা সার্ভিসেস এর পক্ষে অনুমোদন করা হয়।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালীন রাশেদ মাকসুদ কর্তৃক যাচাইবাছাই ব্যতীত শুধুমাত্র তমাল-আর্জু-আদনানের নির্দেশেই তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের ঋণ অনুমোদনের আরও অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকের আভ্যন্তরীন নিরীক্ষা দলের বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্টে ব্যাংকের উত্তরা শাখার তৈরী পোশাকের গ্রাহকসহ বিভিন্ন শাখা থেকে দুর্বল গ্রাহকদের অনুকূলে নিয়ম বহির্ভূত ঋণ প্রদানের বিষয় উল্লেখ রয়েছে।