পার্বত্যাঞ্চলের সরকারি স্কুলে থাকছেন না শিক্ষকরা

৩০ তিন প্রতিবেদক :
বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ঐতিহ্যবাহী এ স্কুলে সহকারী শিক্ষক থাকার কথা ৪৯ জন। তবে আছেন ২১ জন। বাকি ২৮টি পদে শিক্ষক নেই। গত বছরই স্কুলের ছয়জন শিক্ষক বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। পার্বত্য জেলা বান্দরবানে হাই স্কুলে ভর্তিচ্ছু মেয়েদের আগ্রহের কেন্দ্রে এ স্কুল। তবে শিক্ষক সংকটের কারণে কর্তৃপক্ষ তাদের চাহিদায় সাড়া দিতে পারছেন না। যদিও পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধাসম্পন্ন স্কুলটিতে সৃষ্ট পদ অনুযায়ী শিক্ষক থাকলে দ্বিগুণেরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানো যেত। বান্দরবান সরকারি স্কুলেও একই অবস্থা। সহকারী শিক্ষকের ৫০টি পদের মধ্যে সেখানে শূন্য রয়েছে ২২টি।
বান্দরবানের বিপরীত চিত্র চট্টগ্রাম শহরে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ৫৪ পদের সবক’টিতেই কর্মরত শিক্ষক রয়েছেন। নাসিরাবাদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫০ পদের বিপরীতে রয়েছেন ৪৯ জন শিক্ষক। একইভাবে চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৯ পদে ৪৭ জন, সরকারি মুসলিম হাই স্কুলে ৫০ পদে ৪৫ জন, ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫০টির বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন সমসংখ্যক শিক্ষক।
বিভাগীয় সদর চট্টগ্রামের সঙ্গে জেলা সদর বান্দরবানের শিক্ষক-চিত্রের এ বৈপরীত্যের প্রতিফলন রয়েছে উপজেলা সদরের স্কুলেও। বান্দরবান জেলা সদর থেকে দূরের উপজেলা আলীকদম। সেখানকার সরকারি হাই স্কুলে শিক্ষকের ২৭টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ২৩টি। খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫০টি পদের মধ্যে শূন্য ২৫টি, খাগড়াছড়ি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪০টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ২১টি। আবার জেলার দুর্গম রামগড় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সৃষ্ট ২৫টি শিক্ষক পদের মধ্যে ১৭টিই শূন্য। একইভাবে দীঘিনালা সরকারি স্কুলে ১৯টি পদের মধ্যে ১৫টিই শূন্য। আরেক পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলায় নারানগিরি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে মঞ্জুরীকৃত শিক্ষক পদ ২৭টি। বিপরীতে স্কুলটিতে কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন সহকারী শিক্ষক।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৫২টি স্কুলের শিক্ষকের মোট সৃষ্ট পদ ১ হাজার ৪৪২টি। এর বিপরীতে গত অক্টোবরে কর্মরত ছিলেন ৯০৯ জন শিক্ষক। অর্থাৎ শিক্ষকের শূন্য পদ ৩৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অন্যদিকে পার্বত্য তিন জেলায় ১৯টি সরকারি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকের মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ৪৫০টি। এর মধ্যে শূন্য পদ ২৩৭টি। অর্থাৎ এসব জেলায় শিক্ষকের সৃষ্ট পদের ৫২ দশমিক ৬৭ শতাংশই শূন্য রয়েছে।
পার্বত্যাঞ্চলের স্কুলে শিক্ষকের সংকট পশ্চাত্পদ জেলাগুলোকে আরো পিছিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষক সংকটের কারণে পার্বত্য জেলায় শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নারানগিরি স্কুলে মোট শিক্ষার্থী এখন ৬০০ জন, যা স্কুলের পরিমিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের (১:৪০) চেয়ে বেশি। প্রান্তিক জনপদের স্কুলে শিক্ষকের সংকট এসব প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত বিনিয়োগকেও ব্যর্থ করে দিচ্ছে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো সুবিধা থাকলেও শিক্ষক সংকটের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদানে ব্যাঘাত ঘটছে বলে জানিয়েছেন কর্মরত শিক্ষকরা।
নারানগিরি উচ্চ বিদ্যালযের প্রধান শিক্ষক মৃদুল কান্তি তালুকদার বলেন, কাপ্তাইয়ে একটি মাত্র সরকারি মাধ্যমিক স্কুল হওয়ায় অভিভাবকরা এখানে সন্তানদের ভর্তি করাতে চান। কিন্তু শিক্ষক না থাকায় আমাদের পক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা সম্ভব হয় না। এরপরও শিক্ষক অনুপাতের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি ছাত্র-ছাত্রী পড়ছে নারানগিরি উচ্চ বিদ্যালয়ে। পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলে বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়েই দ্বিগুণসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মানসম্মত পাঠদান সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
একই অভিমত জানিয়ে বান্দরবান সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাহুল কান্তি বড়ুয়া বলেন, আমাদের স্কুলে ৪৯ জন শিক্ষকের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ২১ জন। তিনজন সহকারী প্রধান শিক্ষক ও একজন প্রধান শিক্ষকসহ মোট শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ জন। বর্তমানে স্কুলে ৮০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। অবকাঠামো সুবিধা কাজে লাগিয়ে এ স্কুলে দুই শিফটে দেড়-দুই হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করানো সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ না হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকরা অন্যত্র বদলি হয়ে যাওয়ায় পাঠদান দুরূহ হয়ে পড়ছে বলে হতাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজিজ উদ্দিন বলেন, পার্বত্য এলাকায় নানা কারণে শিক্ষকরা থাকতে চান না। এ কারণে পার্বত্য তিন জেলায় সংকট বেশি। ২০১৬ সালে বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে কিছু শিক্ষক দেয়া হয়েছিল। এবারও নতুন কিছু শিক্ষক মাধ্যমিক স্কুলের জন্য দেয়া হবে। নতুন শিক্ষক সবচেয়ে অবহেলিত স্কুলগুলোতে পদায়ন করা গেলে সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন তিনি।