
অর্থনীতির ৩০ দিন সংবাদ :
দেশের জীবন বীমাখাতে ৩৪টি জীবন বীমা কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করে চলেছে। বর্তমানে জীবন বীমা কোম্পনি থেকে ২০২৪ সালে ১২ লাখ ৪৯ হাজার ১৬৮ জন গ্রাহক পলিসি বন্ধ করেছেন। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে তামাদি হওয়া জীবন বীমা পলিসির সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৪২ হাজার। সেই তুলনায় ২০২৪ সালে সংখ্যা কিছুটা কমলেও মোট তামাদি পলিসির সংখ্যা এখনও অনেক বেশি। আলোচ্য বছরে আস্থা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কোনো পলিসি তামাদি বা বাতিল হয়নি। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি পলিসি তামাদি হয়েছে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির যার পরিমান প্রায় দুই লাখ ৩৭ হাজার।
তামাদি পলিসি বলতে সাধারনত কোন পলিসি বন্ধ হয়ে যাওয়া। বীমা ব্যবসার তামাদি বলতে পলিসিহোল্ডার যদি সময়মতো প্রিমিয়াম জমা না দেয় তাহলে নির্দিষ্ট সময় পরে পলিসিটি তামাদি বা বন্ধ হয়ে যায়। আর গ্রাহক বীমা কাভারেজ এবং দাবী থেকে বঞ্চিততো হয়ই সেইসাথে অনেক ক্ষেত্রে জমা দেওয়া টাকাও ফেরত পান না।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে বীমা খাত। তবে বিভিন্ন কারণে সম্ভাবনাময় বঅমা খাতটি ‘অনিশ্চয়তায় পড়ে আছে। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ থাকলেও শতভাগ আস্থা অর্জন করতে না পেরে আস্তাহীনতায় ধুঁকছে, যার কারনে তামাদি বা বন্ধ পলিসি নিয়ে সংকট বাড়ছে।
পলিসি তামাদি হয়ে যাওয়ার জন্য বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা কয়েকটি কারণের কথা বলছেন। তাদের মতে, জীবনবীমা কোম্পানির প্রতিনিধিরা (এফএ) পলিসি খোলার জন্য যতটা মনোযোগী থাকেন, প্রথম কমিশন পাওয়ার পরে আর সেই মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। আবার পলিসি খোলার সময় পলিসি গ্রাহকদের সচেতনতার অভাবে প্রতিনিধিরা গ্রাহকদের ৯/৬ বুঝিয়ে গোলক ধাঁদায় রাখেন। কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও রয়েছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ। অসাধু শ্রেণির বীমা প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে গ্রাহকের কাছ থেকে প্রিমিয়াম নিয়ে তা আত্মসাতের ঘটনাও রয়েছে অনেক।
বীমা পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ দেয়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমির পরিচালক এস এম ইব্রাহিম হোসেন বলেন, বীমা পলিসি বন্ধ হওয়া কোম্পানি এবং গ্রাহক উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। পলিসি বন্ধ হলে একজন গ্রাহক অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য বীমা কোম্পানি থেকে যে সুযোগ পেতেন, সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। একই সঙ্গে এটি বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য রাজস্ব ক্ষতি এবং কোম্পানির আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং গ্রাহক সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
আইডিআরএ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো মোট বীমা দাবির মাত্র ৫৭ শতাংশ নিষ্পত্তি করেছে। যা ২০২৩ সালে ছিল ৬৫ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মোট দাবির পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে ৯ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা।
পলিসি তামাদিতে২০২৪ সালে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ডেলটা লাইফ। এই কোম্পানির তামাদি পলিসির পরিমাণ ১ লাখ ৯৩ হাজার। তামাদিতে এরপরেই রয়েছে পপুলার লাইফ, ন্যাশনাল লাইফ এবং মেটলাইফ বাংলাদেশ।
আর গোল্ডেল লাইফ আইডিআরএ-তে প্রতিবেদন জমা দেয়নি। ফলে কোম্পানিটির তামাদি পলিসির সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি।
ডেলটা লাইফ জানিয়েছে, ২০২৩ সালে বাতিল হওয়া ২ লাখ ৪৬ হাজার পলিসির মধ্যে ১ লাখ ৮৫ হাজার আবার চালু হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার সাধু বলেন, তামাদি হওয়া পলিসির বেশিরভাগই ক্ষুদ্র বীমা। অনেকে কিছুদিন পর একসঙ্গে টাকা দিয়ে পলিসি চালু করেন। অনেক গ্রাহক কয়েক মাস পর একসঙ্গে সব টাকা দিয়ে আবার পলিসি চালু করেন। এ কারণে আমরা পলিসি বাতিল হওয়া নিয়ে আতঙ্কিত হচ্ছি না।
অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে আকিজ তাকাফুল লাইফের ৬ হাজার ১৫৯ টি, আলফা ইসলামী লাইফের ১৫ হাজার ৬১৪টি, বায়রা লাইফের ১৪০৬টি, বেঙ্গল ইসলামি লাইফের ১৬ হাজার ৬২৩টি, বেস্ট লাইফের ৭ হাজার ৬৬৭, চার্টার্ড লাইফের ১৪ হাজার ৩১৩, ডায়মন্ড লাইফের ৯৫৩টি, ফারইস্ট লাইফের ১১ হাজার ১৩৫টি, গার্ডিয়ান লাইফের ১৮ হাজার ৫৭৯টি, হোমল্যান্ড লাইফের ২৯ হাজার ৫২ টি, যমুনা লাইফের ৩ হাজার ৪৪৩টি, জীবন বীমা কর্পোরেশনের ২১ হাজার ৩২৮টি, এলআইসি বাংলাদেশের ৫৫২টি, মেঘনা লাইফের ৩৮ হাজার ৯৯ টি, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফের ১৬ হাজার ৯৬ টি, মেটলাইফ বাংলাদেশের ৭৮ হাজার ৮০৭টি, ন্যাশনাল লাইফের ১ লাখ ৫০ হাজার ৮৪৫টি, এনআরবি ইসলামিক লাইফের ১৮৯৯টি, পদ্মা ইসলামি লাইফের ২ হাজার ৭৪৭টি, পপুলার লাইফের এক লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৯টি, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৬২ হাজার ১৫৮টি, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৩ হাজার ৫৫৫টি, প্রোগ্রেসিভ লাইফের ১৩ হাজার ১৩৮টি, প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফের এক হাজার ৯৭৪টি, রূপালী লাইফের ১১ হাজার ২২১ টি, সন্ধানী লাইফের ২১ হাজার ৭৩৬টি, সোনালী লাইফের ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৬৮টি, সানফ্লাওয়ার লাইফের ১৭ হাজার ৯৮২টি, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২৪ হাজার ৭৫৫টি, স্বদেশ লাইফের ১৬ হাজার ৮২১টি, ট্রাস্ট ইসলামি লাইফের ৫ হাজার ২৪০ টি এবং জেনিথ ইসলামী লাইফের ৮ হাজার ৮৫৬টি পলিসি তামাদি হয়েছে।
আইডিআরের তথ্য বলছে—২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২৬ লাখের বেশি জীবনবিমা পলিসি বাতিল বা তামাদি হয়েছে। ২০০৯ সালে মোট সক্রিয় পলিসির সংখ্যা ছিল এক কোটি ১২ লাখ। ২০২৩ সালে তা কমে হয় ৮৫ লাখ ৮৮ হাজার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক তদারকি, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, নিয়মিত গ্রাহক সুরক্ষা এবং সহজ সুবিধা চালু না করলে জীবন বীমা খাতে আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
জেনিথ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এস এম নুরুজ্জামান বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাইলে বীমাকে এড়িয়ে যাওয়া বা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। এ জন্য বীমার প্রতি সরকারের সুনজর যেমন জরুরি, তেমনি কোম্পানিগুলোরও কিছু দায়িত্ব আছে। পলিসি তামাদি রোধে সবার আগে কোম্পানিকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ, এজেন্টদের রিনিউয়াল প্রিমিয়াম আদায়ের গুরুত্ব অনুধাবন করানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে পলিসি তামাদির হার কমে যাবে।
প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জালালুল আজিম বলেন, চলতি বছরে পলিসি বন্ধের অন্যতম কারণ ছিল জুলাই-আগস্টের আন্দোলন। এটি মানুষের আয়ে প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া কুমিল্লা, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ অনেক এলাকায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বন্যার কারণে এজেন্টরা সময়মতো প্রিমিয়াম আদায় করতে না পারাতে অনেক পলিসি তামাদি হয়েছে।












