

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
একটা দেশের আর্থিক মেরুদন্ড বা চালিকা শক্তি সে দেশের ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বীমা কোম্পানিগুলির অভিভাবক যেমন ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথোরেটি (আইডিআরএ)। ঠিক একইভাবে ব্যাংকগুলির অভিভাবক হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ব্যাংকিং খাতের অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কতটুকু দায়িত্বশীল তা প্রশ্নবিদ্ব? ব্যাংকিং খাতকে ধরে রাখতে হলে তার জন্য দরকার সঠিক প্রশাসনিক অবকাঠামো। এই অবকাঠামো যখন দুর্বল হয়ে যায় তখন প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। এর সবটুকুর জন্য দায়ী প্রশাসনিক পদে যারা আছেন তাদের কর্ম কৌশল, যোগ্যতা, প্রশাসনিক দুরদর্ষিতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। এর কোনটার ব্যত্যয় ঘটলে কোন অবস্থাতেই এসব প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা যবে না। বিভিন্ন পত্রিকার সূত্র অনুযায়ী গত পনের ষোল বছরে ব্যাংকিং খ্যাতের লুটপাটের চিত্র দেখে, প্রধানত সরকারি ব্যাংক ও কিছু কিছু প্রাইভেট ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অবস্থা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের প্রায় সাড়ে ৫৭ শতাংশই বড় ঋণ। প্রতিযোগিতায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিই বেশি এগিয়ে আছে। ২০১৬ সালে ব্যাংকগুলির মোট ঋণের ৫৮ শতাংশ ছিল বড় ঋণ। কয়েক বছর ধরে বড় ঋণের দিকে বেশি ঝুঁকছে ব্যাংকগুলি। ব্যাংকগুলির বড় বড় ঋণের অবস্থা দেখে এক গ্রাহক আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, ছোট ছোট গ্রাহকেরা ব্যাংক থেকে অল্প টাকা ঋণ নিয়ে তা যথাযথভাবে পরিশোধ করেন। অথচ তাদের ঘাড়েই অতিরিক্ত সুদের বোঝা চাপানো হয়। কিন্তু যারা শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না বিভিন্ন অজুহাতে তাদের হয় সুদ মওকুফ করে দেয়া হয়, না হয় ঋণ পুনর্গঠনের নামে বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। খেলাপি ঋণ আদায় করা হলে ব্যাংকের ঋণের সুদের হার অনেক কম হত। গ্রামের মানুষ ঋণ কম পাচ্ছে। এতে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং কম হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের চিন্তা করা উচিত, কিভাবে সবাইকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা যায়। গ্রাহকদের মানসিকতার পরিবর্তন হলে কোনো ঋণ খেলাপি হবে না। কিছু ধূর্ত লোক একই সম্পত্তি বার বার দেখিয়ে ঋণ নেয় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এবং এ সংক্রান্ত বিষয়ে বার বার আলোচনাও হয়েছে। বিষয়টি এখন নজর দেয়ার সময় এসেছে। ঋণ দেয়ার আগে গ্রাহকদের ছয় মাসের ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখতে হবে। খেলাপি ঋণ মনিটরিংয়ে ডাটা ব্যাংক করতে হবে। গৃহঋণের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা আইনজীবীরা জমিসংক্রান্ত অনেক তথ্য দেয় যা সঠিক নয়। অবশ্যই সরেজমিন পরিদর্শন করে ঋণ দিতে হবে। ব্যাংক জনগণের অর্থ অন্যদের ঋণ দেয়। এ কারণে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের। ঋণ নিয়ে গ্রাহকেরা কারখানা বানাচ্ছে, নাকি দামি গাড়ি কিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা ব্যাংককে নজরদারি করতে হবে। সব ব্যাংক খেলাপি কমানোর চেষ্টা করছে। তবে গুণগত মানের উন্নতি হচ্ছে না। এ জন্য ব্যাংক ঋণের বিষয়টি আবার পর্যালোচনা করতে হবে। ত্রুটি-বিচ্যুতি খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ঋণ আদায়ে আরো শক্তিশালী আইন প্রণয়ন তার প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিতে হবে।
ব্যাংকগুলির মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা যে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলছে, বা যে কারণে ঋণ নেয়া হচ্ছে ঠিক ওই খাতে ব্যয় হচ্ছে, নাকি ঋণের অর্থ বাহিরে পাচার হয়ে যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা উচিত। তাহলে হয়তো ব্যাংকিং খাতকে আজকের পরিণতি ভোগ করতে হতো না। সামনে এ সংকট যাতে না বাড়ে সেজন্য ব্যাংকগুলির ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তদারকি বাড়াতে হবে। অর্থাৎ উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিতে হবে এবং সেই ঋণ উৎপাদনশীল খাতেই ব্যয় হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও তদারকি বাড়াতে হবে। অন্যথায় সামনে টাকার সংকট আরো বেড়ে যাবে, এতে বাড়বে সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধন করে আর্থিক অবকাঠামো ঠিক রেখে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি ঠিক রাখবে বলে জনগণের প্রত্যাশা।











