“সরকারি কর্মচারীদের গ্রেফতারে অনুমতির দরকার নেই : হাইকোর্ট”


ফৌজদারি মামলায় সরকারি কর্মচারীদের কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতির বিধান বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী বলে হাইকোর্টের ঘোষণা।
খোন্দকার জিল্লুর রহমান:
ফৌজদারি মামলায় সরকারি কর্মচারীদের গ্রেফতার করতে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেয়ার বিধান হাইকোর্ট তা বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেছেন । গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো: মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি কাজী মো: ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনের ৪১ এর (১) ধারার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন। এর ফলে সরকারি কর্মচারীদের গ্রেফতারে আর পুর্বানুমতির প্রয়োজন নাই।
আদালত রায়ে বলেছেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬, ২৭ ও ৩১ এ নির্দেশনা রয়েছে সব ক্ষেত্রেই আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। কিন্তু ৪১ (১) ধারায় নির্দিষ্ট একটি সেকশনকে সুরক্ষা দেয়া হয়। এমন আইন সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। সংবিধানে বলা আছে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী সকল আইন বাতিলযোগ্য। আদালত আরো বলেন, দুদক আইনের ৩২ ক ধারায় এমন সুরক্ষা দেয়া হলেও আদালত তা বাতিল করে এবং সরকার পক্ষ সেই রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করেনি। সুতরাং, একই বিষয়ে আবারো আইন করার কোনো সুযোগ নেই।
তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিলে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। তিনি বলেন, রায়ের কপি পাওয়ার পর এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব। তিনি আরো বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সরকারি কর্মচারীদের হয়রানি করতে মিথ্যা মামলা হয়। তাদের ভোগান্তি ও হয়রানি কমাতে এই বিধান করা হয়।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অরবিন্দ কুমার রায়। দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো: খুরশীদ আলম খান।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সরকারি কর্মচারীরা সাধারণ নাগরিকদের মতো আইনের দৃষ্টিতে সম-অধিকারপ্রাপ্ত হওয়ার নির্দেশনা সংবিধানে রয়েছে। কিন্তু সংসদ তাদেরকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আইন করে গ্রেফতারের পূর্বে সরকারের অনুমতি নেয়ার বিধান করেছে, যা বৈষম্যমূলক। তিনি আরো বলেন, একই ধরনের সুবিধা দিয়ে ইতঃপূর্বে সংসদ আইন পাস করেছিল যা চ্যালেঞ্জ করলে হাইকোর্ট বাতিল করে দেন। ওই রায়কে অকার্যকর করার জন্য আবার সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ এর ৪১ (১) ধারা পাস করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৪ অনুসারে বিচারকরা স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন। কিন্তু এই আইন অনুসারে কোন মামলায় চার্জশিটের আগে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাপারে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা সম্ভব হবে না, যা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ওপর হস্তক্ষেপ।
দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, আইনের ৪১ (১) ধারা স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের স্বাধীনতাকে খর্ব করে, এ আইন সংবিধানের মৌলিক অধিকার পরিপন্থী। তিনি আরো বলেন, এই আইন দুদক আইনের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করবে। আইনটি ম্যালাফাইড উদ্দেশ্যে করা হয়েছে ।
২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর সরকারি চাকরি আইনের গেজেট জারি হয়। এরপর ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এক গেজেটে বলা হয় ১ অক্টোবর থেকে এ আইন কার্যকর হবে। এরপর ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর এর বিরুদ্ধে জনস্বার্থে এইচআরপিবি এ রিট দায়ের করে। একই বছরের ২১ অক্টোবর আদালত রুল জারি করে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ এর ৪১ (১) ধারাকে কেন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৬ ও ৩১ এর মৌলিক অধিকার পরিপন্থী হওয়ায় বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না মর্মে রুল জারি করেন। রুল শুনানি শেষে আদালত রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেন এবং ওই সরকারি চাকরি আইনের ৪১ (১) ধারাকে মৌলিক অধিকার ও সংবিধান পরিপন্থী বলে বাতিল ঘোষণা করেন।