অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
খেলাপি ঋণে জর্জরিত ওটিসির মুন্নু ফ্যাব্রিক্স লিমিটেড। রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকসহ আট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ খেলাপি হওয়া কোম্পানিটির মোট ঋণের সিংহভাগই এখন খেলাপি। দফায় দফায় পুনঃতফসিল সুবিধা নিয়েও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে লোকসানি কোম্পানিটি। টাকার অঙ্কে খেলাপি ঋণ প্রায় ৩৩৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ঋণ আদায়ে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে সোনালী ব্যাংক।
তথ্যমতে, মুন্নু ফ্যাব্রিক্সকে কনসোর্টিয়াম ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী, জনতা ও বিডিবিএল। পরে অনিয়মের মাধ্যমে এ ঋণ দেওয়া, বন্ধকী রাখা সম্পত্তি গোপনে বিক্রি ও অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের অভিযোগ উঠে। ব্যবসায়িকভাবে পিছিয়ে পড়ায় ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটি। সর্বশেষ ওই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা। এর জেরে দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি থেকে শীর্ষ ঋণখেলাপি কোম্পানির তালিকায় নাম লিখিয়েছে মুন্নু ফ্যাব্রিক্স। আরও পাঁচটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে কোম্পানিটির বর্তমান ঋণ প্রায় ৪৩২ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে খেলাপি প্রায় ৩৩৯ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ আদায়ে বাধ্য হয়েই কনসোর্টিয়াম লিডার সোনালী ব্যাংকের তরফে মুন্নু ফ্যাব্রিক্সের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
ব্যাংকটির মতিঝিল স্থানীয় কার্যালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র আরও জানিয়েছে, দফায় দফায় সুবিধা-সময় দেওয়ার পরও মুন্নু ফ্যাব্রিক্স পাওনা পরিশোধ করেনি। বাধ্য হয়েই মামলা করা হয়েছে। মামলার পর কোম্পানির পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ ও মামলা প্রত্যাহারের জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে। কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকা প্রতিটি কিস্তির শর্তে রাজি হলে সেক্ষেত্রে মুন্নু ফ্যাব্রিক্সের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
মামলার কথা স্বীকার করে মুন্নু ফ্যাব্রিক্সের পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ ফয়েজ মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘আমরা ঋণের কিস্তি দিয়েছি। তবে ব্যাংকের চাহিদামতো দিতে পারিনি। এ কারণেই মামলা হয়েছে। আমরা ঋণ পরিশোধের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সময় চাইব। কারণ এখন যে অবস্থা তাতে এ সময়ের আগে ঋণ পরিশোধ করার সামর্থ্য নেই।’
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বস্ত্র খাতের কোম্পানি মুন্নু ফ্যাব্রিক্স ৯০ দশকের শেষদিকে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। ২০০০ সালে ১৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা লোকসানের মধ্যদিয়ে পিছিয়ে পড়া কোম্পানির তালিকায় নাম লেখায়। বর্তমানে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে রয়েছে মুন্নু ফ্যাব্রিক্স। তিন বছর টানা লোকসান ও গ্যাস সংকটে ২০১০ সালের অক্টোবরে কোম্পানিটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। লে-অফ ঘোষণার প্রায় দেড় বছর পর ২০১১ সালে আবারও উৎপাদনে ফেরে মুন্নু ফ্যাব্রিক্স। তবে বাণিজ্যিকভাবে পণ্য উৎপাদনের জন্য নয়, কোম্পানির মূল্যবান যন্ত্রপাতি চালু রাখার স্বার্থে। চাহিদামতো গ্যাস না পেয়ে জোড়াতালি দিয়ে চলছে মুন্নু ফ্যাব্রিক্স। বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে কোম্পানিটি। এক সময়ের লাভজনক ব্যবসায়িক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, গ্যাস সংকট, পরিচালনা-ব্যবস্থাপনায় রদবদল, ঋণের কারণে ও প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
মুন্নু ফ্যাব্রিক্সের পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ ফয়েজ মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘কারখানার কল-কব্জা চালু না রাখলে জং ধরে নষ্ট হয়ে যাবে। এ জন্য শুধু কল-কব্জা রক্ষার জন্য গ্যাস প্রাপ্তি সাপেক্ষে দৈনিক পাঁচ-ছয় ঘণ্টা কারাখানা চালানো হচ্ছে। কখনও কখনও একটি ইউনিট বন্ধ রেখে অন্যটি চালু করি। বর্তমানে দেড়শ’র বেশি শ্রমিক কাজ করছে। এখনও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ার কারণে পুরোপুরি উৎপাদনে ফেরা যাচ্ছে না। তবে উৎপাদন খরচ কমায় লোকসান কমেছে।’
এদিকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে ২০০৮ সাল থেকে লোকসান গুনছে মুন্নু ফ্যাব্রিক্স। ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ছয় বছরে কোম্পানিটির লোকসান ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি আর্থিক বছরের ৯ মাসেও প্রায় চার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। আর পুঞ্জীভূত লোকসান প্রায় ১৬৭ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় মুন্নু ফ্যাব্রিক্স। লোকসান, লভ্যাংশ না দিয়ে ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে চলে যাওয়া ও উৎপাদন বন্ধ হওয়ার কারণে ২০১০ সালের অক্টোবরে মূল মার্কেট থেকে আরও কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে ওটিসি মার্কেটে পাঠানো হয়। লোকসানের কারণে প্রায় এক দশক কোনো লভ্যাংশ দিচ্ছে না কোম্পানিটি। লভ্যাংশ না দেওয়া, ওটিসিতে অবস্থান ও টানা লোকসানের কারণে ক্রেতা সংকটে মুন্নু ফ্যাব্রিক্স। গত ২৮ মে কোম্পানিটির শেয়ার ওটিসিতে সর্বশেষ ছয় টাকা ৬০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে। কোম্পানিটির মোট ১১ কোটি ৫০ লাখ শেয়ারের মধ্যে বর্তমানে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে ৫৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে এক দশমিক ৫ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। সূত্র : শেয়ার বিজ












