শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নিজেই ভঙ্গ করলেন নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি। ক্যামেরাম্যানসহকারে দলবল নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গতকাল এসএসসি পরীক্ষার সময় আবারো তিনি ভঙ্গ করেছেন নিজের দেয়া ওয়াদা। গতকাল পরীক্ষা শুরুর ১৫ মিনিটের মাথায় তিনি প্রায় ২৫টি টিভি ক্যামেরাসহ ফটোসাংবাদিক নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেন।
পরীক্ষার হলে বিপুলসংখ্যক টিভি ক্যামেরাম্যান, ফটোসাংবাদিক এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রবেশ, ভিডিও দৃশ্য ধারণ, ছবি তোলা, পরীক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকার নেয়া প্রভৃতি ঘটনায় পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ মারাত্মকভাবে বিঘœ ঘটে। পরীক্ষার হলে শিক্ষামন্ত্রীর এ পরিদর্শনকে ফটোসেশন হিসেবে আখ্যায়িত করে অভিভাবকরা তখন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলাকালে ২৩ মার্চ শিা মন্ত্রণালয়ের সভাকে আয়োজিত জাতীয় মনিটরিং ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় শিামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছিলেন, তিনি আর দলবল নিয়ে পাবলিক পরীক্ষার হলে প্রবেশ করবেন না। কেন্দ্রের বাইরে থাকবেন এবং বাইরে বসেই সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবেন।
কিন্তু পরের বছরই তিনি এ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। গত বছর ২ এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিন শিক্ষামন্ত্রী টিভি ক্যামেরাম্যান, ফটোসাংবাদিক এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে ঢাকা কলেজ কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। এরপর পরীক্ষার তৃতীয় দিন আবারো তিনি সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে একই কায়দায় প্রবেশ করেন। তখনো পরীক্ষার হলে এভাবে বারবার মন্ত্রীর প্রবেশ এবং ফটোসেশন নিয়ে সমালোচনা চলে।
এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। অভিভাবকদের ক্ষোভ উপেক্ষা করে তিনি গতকাল পরীক্ষা শুরুর ১৫ মিনিটের মাথায় প্রবেশ করেন ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে। একাধিক কক্ষ তিনি পরিদর্শন করেন এবং ১৫ মিনিট তিনি হলে অবস্থান করেন। তার সাথে প্রবেশ করেন টেলিভিশনের প্রায় ২৫ জন ক্যামেরাম্যান, ফটোসাংবাদিক এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষার্থীদের সাথে কুশল বিনিময় করেন। প্রশ্ন কেমন হয়েছে জানতে চান। শিক্ষামন্ত্রী প্রবেশের পর অনেক পরীক্ষার্থী লেখা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে সালাম করতে ও তার প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য হয়। ফটোসাংবাদিকদের ক্যামেরার কিক আর টিভি ক্যামেরাম্যানদের ক্যামেরার তীব্র আলোতে পরীক্ষার হলের পরিবেশ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।
অভিভাবকদের অভিযোগ এ সময় ওই পরীক্ষার হলের কোনো পরীক্ষার্থীই ঠিকমতো মনোসংযোগ দিতে পারেনি, পারার কথাও নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন, পরীক্ষার হলে প্রতি মিনিট একজন পরীক্ষার্থীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার্থীদের নিরিবিলি শান্ত পরিবেশে পরীক্ষা দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। মন্ত্রীর এভাবে পরিদর্শনের ফলে তিনি যতগুলো কক্ষে যাবেন এবং যতক্ষণ থাকবেন তাদের সবার মূল্যবান সময় নষ্ট হবে। উচিত ছিল তাদের অন্তত আধা ঘণ্টা সময় অতিরিক্ত দেয়া।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মনোবিজ্ঞানী বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে পরীক্ষার্থীদের মনোসংযোগ ব্যাহত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। পরীক্ষার হলে মনোসংযোগ নষ্ট হওয়া থেকে মারাত্মক দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। মনোসংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে একজন শিক্ষার্থী হঠাৎ করে আপসেট হয়ে যেতে পারে। পরে এটা চেইন আকারে কাজ করে। যেহেতু পরীক্ষার হলে সময় খুব কম তাই অনর্থক বিরক্ত সৃষ্টির কারণে যদি কারোর মনোযোগ নষ্ট হয় তখন খুব স্বাভাবিকভাবে তার মনে রাগের উদ্্েরক হবে। এতে তার মস্তিষ্কে ভীষণ রকমের চাপ পড়তে পারে। ফলে তার মেমোরি সিস্টেম এলোমেলো হয়ে যেতে পারে, যা তার বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তা ছাড়া কোনো একটি বিষয়ে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তা পুনরায় ফিরিয়ে আনতে বেগ পেতে হয়।
শিক্ষামন্ত্রীর এভাবে পরীক্ষার হল পরিদর্শনকে অনেক অভিভাবক ফটোসেশন আখ্যায়িত করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্ট গতকাল এক বিবৃতিতে পরীক্ষার্থীদের যাতে কোনোরূপ সমস্যা না হয় সে জন্য পরীক্ষা চলাকালে পরীক্ষার হলে প্রবেশ থেকে বিরত থাকতে মন্ত্রী ও অন্য নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।










