আইডিআরএ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সেচ্ছাচািরতায় ৬০ বীমা কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন আটকে রেখেছে

বিশেষ প্রতিবেদক :
আইডিআরএ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সেচ্ছাচািরতায় ৬০ বীমা কোম্পানির লাইসেন্স নবায়নে বর্ধিত নবায়ন ফি আদায়ের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আইনি জটিলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার খামখেয়ালিপনায় আটকে রয়েছে দেশের বেসরকারি খাতের প্রায় ৬০টি লাইসেন্সধারী লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়ন। ফলে দেশের সিংহভাগ বীমা কোম্পানি এখন কার্যত লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় ব্যবসা পরিচালনা করছে। আর এই আইনি টানাপোড়েন ও যথাযথ সমন্বয়ের অভাবে পুরো বীমা খাতে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ব্যবসায়িক স্থবিরতা ও অস্থিরতা।
খাত সংশ্লিষ্টরা মতে, বীমা আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে বৈধ ফি জমা দেয়ার পরও লাইসেন্স নবায়ন না করে ঝুলিয়ে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এটি দেশের আর্থিক খাতের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ)’র দাবি, বীমা আইন, ২০১০ এর ১১(২) ধারা অনুযায়ী সকল বীমা কোম্পানি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের নিবন্ধন নবায়নের আবেদন এবং ২০১৮ সালের সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত ফি প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামে ১.০০ টাকা জমা দিয়েছে। তাই আইনের ১১(৩) ধারা অনুযায়ী, আবেদন ও নির্ধারিত ফি পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষের জন্য লাইসেন্স নবায়ন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এই বৈধ ফি গ্রহণ করে লাইসেন্স ইস্যু না করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তা ঝুলিয়ে রেখেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ৪ ফেব্রুয়ারি একটি বিতর্কিত গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বীমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন ফি প্রতি হাজারে ১.০০ টাকা থেকে একলাফে আড়াই গুণ বাড়িয়ে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করে। কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই অস্বাভাবিক ফি বৃদ্ধির ফলে ১০০ কোটি টাকা গ্রস প্রিমিয়াম সম্পন্ন একটি কোম্পানির ফি ১০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২৫ লাখ টাকা হয়ে যাবে। বিআইএ এই বর্ধিত ফি অবিলম্বে মওকুফের দাবি জানিয়েছে এবং এটিকে খাতের জন্য একটি বড় আর্থিক বোঝা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
আইডিআরএ’র চিঠি ও অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, সরকারের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মুখেও চাপের শিকার হয়ে ইতোমধ্যে মাত্র ৬টি লাইফ বীমা এবং ১৪টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি বর্ধিত (২.৫০ টাকা) হারে ফি জমা দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করতে বাধ্য হয়েছে। তবে বাকি ৬০টিরও বেশি কোম্পানি এখনও ২০১৮ সালের আইন অনুযায়ী ১.০০ টাকা হারে ফি দিয়ে লাইসেন্স পাওয়ার দাবিতে অনড় রয়েছে। এতে করে বীমা বাজারে এক ধরনের চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে আইডিআরএ’র উপ-পরিচালক মো. সোলায়মান স্বাক্ষরিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো এক জরুরি চিঠিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি দাবি করেছে, তাদের নিজস্ব আয় থেকেই সব ব্যয় মেটাতে হয়। ডিজিটালাইজেশন, ন্যাশনাল কোর ইন্স্যুরেন্স সলিউশন ও বিভিন্ন নতুন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু করায় আইডিআরএ’র ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাই তারা সরকারি নির্দেশনার অজুহাতে বীমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বর্ধিত ২.৫০ টাকা হারেই ফি আদায়ে অটল রয়েছে এবং এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রার্থনা করেছে। এখােন খাত সংশ্লিষ্ট অনেকে মন্তব্য করে বলেন, আইডিআরএ যদি এবিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা না থাকে,এবং অর্থ মন্তনালয়ের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করতে হয় তাইলে ঠোঁটো জগন্নাত হিসেবে বিশাল খরচের এই প্রতিষ্ঠানটি রাখার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না। অর্থ মন্ত্রনালয় নিজেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, “বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনায় তারা সরকার হতে এ বিষয়ে নির্দেশনা গ্রহণের বিষয়ে সম্মত হয়েছে।”
তবে আইডিআরএ’র সাথে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অংশ নেয়া বিআইএ’র একজন প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আলোচনায় সম্মতির বিষয় ছিল যে, বীমা কোম্পানিগুলো যেহেতু ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়নের জন্য ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেছে। তাই ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়ন সম্পন্ন করতে হবে ২০১৮ সালের সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী। আর ২০২৭ সাল থেকে নতুন হারে ফি নিয়ে নিবন্ধন নবায় করা যেতে পারে। তবে বর্ধিত ফি’র হার নিয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে। এক্ষেত্রে বর্ধিত ২.৫০ টাকা হারেই ফি আদায়ের বিষয়ে কোন সম্মতি ছিল না।
আইনি নোটিশ ও রিটের হুঁশিয়ারি
আইডিআরএ’র এই অনমনীয় ও একপেশে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এরইমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে জনস্বার্থে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তনয় কুমার সাহা গত ২০ এপ্রিল জনস্বার্থে এই আইনি নোটিশ প্রেরণ করেন।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, কোম্পানিগুলো নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও লাইসেন্স নবায়ন আটকে রাখা সম্পূর্ণ অবৈধ ও আইন পরিপন্থী। আগামী ৭ দিনের মধ্যে এই জটিলতা নিরসন করে ২০১৮ সালের বিধি অনুযায়ী লাইসেন্স নবায়ন না করা হলে মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।
নিবন্ধন নবায়ন না হলে কোম্পানিগুলো আইনত নতুন কোনো পলিসি ইস্যু করতে বা গ্রাহকদের বীমা দাবি নিষ্পত্তি করতে পারবে না, যা পুরো দেশের অর্থনৈতিক ও আর্থিক খাতে একটি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।