আইডিআরএ’র সদস্যর বিদেশ ভ্রমণশর্তে সোনালী লাইফের ১৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ ধামাচাপার চেষ্টা

অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের টাকায় সপরিবারে বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ উঠেছে বীমাউন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের এক সদস্যের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে মোটা অংকের আর্থিক সুবিধাও নিয়েছেন তিনি, সুত্রের খবরে জানা যায়। আর এই সুবিধা নেয়ার প্রেক্ষিতে সোনালী লাইফের ১৮৭ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৬৬ টাকা আত্মসাতের ঘঠনা ধামাচাপা দেয়া এবং সাসপেন্ড পরিচালনা পর্ষদের হাতে বোর্ডের দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে তিনি মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসকে সব ধরণের সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে বলে সুত্রের খবর।
অভিযোগ উঠেছে, ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে সপরিবারে ভ্রমণ করেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওই সদস্য। গ্যালাক্সি ট্রাভেল ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই ভ্রমণের সব আয়োজন করে দেয়। এতে ভিসা, বিমান ভাড়া, হোটেলে থাকা এবং যাতায়াত বাবদ ব্যয় হয় ১৯ লাখ টাকা। সূত্রের খবর, এই হিসাব পারিবারিক কেনাকাটা বা অন্যান্য লাক্সারিয়াস সামগ্রীর ক্রয় খরচ ব্যাতিত।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে গ্যালাক্সি ট্রাভেল ইন্টারন্যাশনালকে সোনালী লাইফ পরিশোধ করে ৬ কোটি ৭০ লাখ ১৩ হাজার ১৭৯ টাকা। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই অর্থাৎ ওই সদস্যের সপরিবার ভ্রমণের পরের মাসেই পরিশোধ করা হয় ৩৯ লাখ ১৫ হাজার ২১০ টাকা। এই টাকার পুরোটাই আইডিআরএ’র ওই সদস্যের স্বপরিবারে বিদেশ ভ্রমণ বাবদ পরিশোধ করা হয় বলে সোনালী লাইফের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে। (ভিসা ও ভ্রমন তথ্যের পিডিএফ কপি সংরক্ষিত।)

প্রশাসক প্রত্যাহার করে সোনালী লাইফকে কোম্পানিটির ১৮৭ কোটি টাকা আত্মসাতে অভিযুক্ত সাসপেন্ডেড পরিচালনা পর্ষদের হাতেই কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগ নেন আইডিআরএ’র এই সদস্য। সূত্রের খবরে আরো জানা যায়, তিনি আইডিআরএ’র চেয়ারম্যানসহ বাকী অন্য তিন সদস্যকেও পর্ষদ ফিরিয়ে দেয়ার পক্ষে ম্যানেজ করেন, অভিযোগ রয়েছে, গত ১৯ আগস্ট মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় সভাটি আয়োজনের নেপথ্যে ছিলেন আইডিআরএ’র উক্ত সদস্য। যদিও এই সভায় বিষয়টি বিচারাধীন বলে পর্ষদ পুনর্গঠন ও প্রশাসক প্রত্যাহারের ব্যাপারে আদালত সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলে সাসপেন্ডেড পরিচালনা পর্ষদকে জানিয়ে দেয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আবদুর রহমান খান, যিনি এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেরও (এনবিআর) চেয়ারম্যান। আইডিআরএ’র সদস্য বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, দলিল উদ্দিন, মো.নজরুল ইসলাম ও কামরুল হাসান এবং সোনালী লাইফের সাবেক দুই চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ও কাজী মনিরুজ্জামান।
কিন্তু ১৯তারিখের ওই বৈঠকে সফল না হওয়ায় এরপরের দিন সোনালী লাইফের কর্মকর্তারা আইডিআরএ কার্যালয় অবরুদ্ধ করেন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে রাত ১টায় শর্তসাপেক্ষে সমঝোতা হয়, যার খবর পরেরদিন বেশকিছু ছবিসহ অর্থনীতির ৩০ দিন বিডিডটকমে বিষদ প্রকাশ করে। বিশেষকরে দুই শর্তের ওই সমঝোতার পরই আইডিআরএ’র কার্যালয় ছাড়েন সোনালী লাইফের কর্মকর্তারা।
২০ আগস্ট ২০২৪ মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকেই সোনালী লাইফের কর্মকর্তারা আইডিআরএ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে। এ সময় তারা নিজেদেরকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য ও সকল বীমা কোম্পানির মাঠকর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়।
২ শর্তের মধ্যে একটি ছিল- সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের প্রশাসক প্রত্যাহার ও পরিচালনা পর্ষদ পুনর্বহালের বিষয়ে অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি সভা করার জন্য আগামীকাল অর্থ্যাৎ ২১ আগস্ট ২০২৪ বুধবার অনুরোধ করে কর্তৃপক্ষ হতে পত্র প্রেরণ করা হবে।
শর্ত অনুযায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে পাঠানো আইডিআরএ’র চিঠির প্রেক্ষিতে আবারও ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করে অর্থমন্ত্রণালয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব অমরকৃষ্ণ মন্ডলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়-সোনালী লাইফের প্রশাসক প্রত্যাহার এবং পরিচালনা পর্ষদ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে অর্থ উপদেষ্টা।
এই বৈঠক আয়োজনের নেপথ্যেও ছিলেন আইডিআরএ’র উক্ত সদস্য। তিনি যেকোন বিনিময়ে তদবির করে সোনালী লাইফের অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িতদের হাতে কোম্পানি পরিচালনার দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়ার জন্য অর্থমন্ত্রণালয়ের দু’জন অতিরিক্ত সচিবকেও ম্যানেজ করেন। সূত্রের খবরে বিশেষ ভাবে জানা যায়, অর্থমন্ত্রণালয়ের ওই দুই অতিরিক্ত সচিব ইতোমধ্যেই প্রশাসক প্রত্যাহারের বিষয়ে সুপারিশ করে অর্থউপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।
সূত্রমতে উল্লেখ, ১৮৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সোনালী লাইফের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দিয়ে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল প্রশাসক নিয়োগ করে আইডিআরএ। পরে ১৮৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২৫ জুলাই মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক। অপর দিকে জুলাই মাসেই সোনালী লাইফের ১০ বছরের ব্যবসায়ীক কর্মকান্ডের দুর্নীতি ও অনিয়ম ক্ষতিয়ে দেখতে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদাভাসিকে নিয়োগ করে আইডিআরএ। এছাড়া বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনও সোনালী লাইফের অনিয়ম দুর্নীতি ক্ষতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করে।

সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লাইসেন্সপায় ২০১৩ সালে। লাইসেন্স পাওয়ার পরপরই তারা ব্যবসায়ীক কর্মকান্ড শুরু করে এবং ২০২৩ সালে সোনালী লাইফের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস। এরপরে ১৮৭ কোটি টাকা আত্মাসাতের বিষয়টি সামনে আসে। বিভিন্ন সূত্রের খবরে জানা যায়, মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের অতিত জীবনের ঘঠনাবহুল কর্মকান্ড। তিনি চট্টগ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের সময় মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস চট্টগ্রামের হাটহাজারি থানার ওসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আলোচিত এ হত্যাকান্ডে তার জড়িত থাকার কথা সেসময়ের লোকাল, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সকল মিডিয়াতে ফলাউ করে প্রকাশিত হয়। মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস বর্তমান বীমাখাতের দুষ্টচক্রের বহুল আলোচিত ব্যক্তি হিসেবেও পরিচিত।
আইডিআরএ ও সোনালী লাইফ সূত্রমতে পাওয়া যায়, অবৈধভাবে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির তহবিল থেকে বের করে নেয়া অর্থের পরিমাণ ছিল মোট ১৮৭ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৬৬ টাকা। এর মধ্যে পরিচালকদের নামে শেয়ার ক্রয় করতে তহবিল থেকে নেয়া হয়েছে ৯ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। জমি/ ভবন ক্রয়ের অগ্রিম দেখিয়ে অবৈধ ভাবে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে সোনালী লাইফের তহবিল থেকে অবৈধভাবে দেয়া হয়েছে ১৪১ কোটি ৫৬ লাখ ৯০ হাজার ৫শ’ টাকা। সোয়েটার ক্রয়, আপ্যায়ন, ইআরপি মেনটেনেন্স বাবদ মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে ৭ কোটি ৮৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮১৭ টাকা। নিজ পরিবারের ৮সদস্য পরিচালকদের মাসিক বেতন বাবদ নেয়া হয়েছে ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অবৈধভাবে বিলাস বহুল অডি কার ক্রয়ে খরচ করা হয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। নিজ পরিবারের সদস্য পরিচালকদের অতিরিক্ত ডিভিডেন্ড দেয়া হয়েছে ১কোটি ৬০লাখ ১০হাজার ৭৫০ টাকা। বিদেশে চিকিৎসা, শিক্ষা, ভ্রমণব্যয় ১ কোটি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার ৮শ’ টাকা। গ্রুপ বীমা পলিসি থেকে পরিচালক মেয়ে-জামাই ড্যানিয়েলকে অবৈধ কমিশন দেয়া হয়েছে ৯লাখ টাকা।
ঋণ সমন্বয়, অনুদান, এসিক্রয়, কোরবানির গরু ক্রয়, বিদেশ ভ্রমণ, পলিসি নবায়ন উপহার, আইপিও খরচের নামে নেয়া হয়েছে ৮ কোটি ২৬ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫৯ টাকা। অফিস ভাড়ার নামে ড্রাগন আইটিকে প্রদান ১১ কোটি ৯৪ লাখ ২০ হাজার ১৭ টাকা। সম্পূর্ণ ইম্পেরিয়েল ভবনের ইউটিলিটি বিল পরিশোধ ১ কোটি ৭২ লাখ ৪২ হাজার ২২৩ টাকা। ড্রাগন সোয়েটার ও স্পিনিং লিমিটেডের ট্যাক্স পরিশোধ ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।