মোঃ কাজিম উদ্দিন…

একজন সফল বীমা বিদের গল্প…
মোঃ কাজিম উদ্দিন বাংলাদেশের জীবন বীমা খাতের একজন স্বনামধন্য সফল ব্যক্তিত্ব ও অন্যতম সংগঠক। ১৯৮৭ সালের মে মাসে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেডের ডেভেলাপমেন্ট অফিসার হিসাবে তার জীবন তথা বীমা ক্যারিয়ার শুরু। তিনি বাংলাদেশের লাইফ বীমা (লাইফ ইন্স্যুরেন্স) শিল্পের একজন দক্ষ এবং জনপ্রিয় মোটিভেশনাল স্পিকার। সাধারন বীমায় তার স্যামক অভিজ্ঞতা থাকলেও আজকের গল্পটা সম্পুর্ণ লাইফ বীমা বিষয়ের উপর একটু ভিন্নতা নিয়ে।
মোঃ কাজিম উদ্দিন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী’র একজন সফল মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা/সিইও। প্রায় তিন বছর পুর্বে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের সফল নিয়োগ অনুমোনের মাধ্যমে তিনি এ পদে আসিন হন। সিইও (মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা) হওয়ার আগে তিনি একই কোম্পানীতে ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এবং তারও পুর্বে ২০১৪ সাল থেকে উক্ত কোম্পানীতে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৮৭ সালে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেডএ যোগদানের মাধ্যমে বীমা পেশাকে নেশা হিসাবে কর্ম জীবন শুরু করেন। তিনি সুদীর্ঘ ৩৭ বছর ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর বিভিন্ন গুরুত্তপূর্ণ পদে সফলতার সহিত দায়িত্ব পালন করেন। মোঃকাজিম উদ্দিন জীবন বীমা বিষয়ের উপর দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ সেশনে এবং বহু সেমিনারে অংশ গ্রহণ করেন। সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে, মোঃ কাজিম উদ্দিন বীমা খাতে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা সিইও হিসাবে পুরস্কৃত হন যা দক্ষিণ এশিয়ান পার্টনারশিপ সামিট (SAPS)এ দেওয়া হয়েছে।

ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে মোঃকাজিম উদ্দিনের অন্যান্য পুরুস্কারের সাথেসাথে সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ আরো একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে। ৩০ মার্চ ২০২৩ নর্থ ইংল্যান্ডের একটি হোটেলে Fenic Media কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে Best Life insurance company of the year হিসেবে ন্যাশনাল লাইফের সিইও মোঃ কাজিম উদ্দিনের হাতে গৌরবময় Prestige Award-2023 তুলে দেন। গ্রাহক সন্তুষ্টি, সর্বোচ্চ বীমা দাবী পরিশোধ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য আর্থিক খাতের বাংলাদেশী কোম্পানী ন্যাশনাল লাইফকে ইংল্যান্ডের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান Fenic Media কর্তৃপক্ষ Prestige Award প্রদানর জন্য মনোনীত করে এবং পরবর্তীতে Prestige Award-2023 গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষ গত ২ মার্চ ২০২৪শে ন্যাশনাল লাইফের সিইও মোঃ কাজিম উদ্দিনকে পত্র প্রেরণ করে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার অর্জনে ন্যাশনাল লাইফ পরিবার গর্বিত ও অনুপ্রাণিত।

ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড বাংলাদেশের জীবন বীমা বাজারে অতি সুপরিচিত একটি নেতৃস্থানীয় জীবন বীমা কোম্পানী।

পারিবারিকভাবে মোঃ কাজিম উদ্দিন কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট থানার কাকইরতলা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন।

দুপুরে খাবারের অবসরে বাংলাদেশের লাইফ বীমার বিভিন্ন দিক, লাইফ বীমার সফলতা, বিফলতার গল্পসহ আজ তার জীবনের অজানা বিষয়গুলোর উপর অর্থনীতির ৩০ দিন সম্পাদক প্রকাশক (খোন্দকার জিল্লুর রহমান) এর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় কিছুটা সময়…
অর্থনীতির ৩০ দিন : বীমা শিল্পে আসারপর আপনার প্রথম জীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রথম জীবনের দিনগুলি কেমন ?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : বীমাশিল্পে আমার প্রথম পদচারণা ১৯৮৭ সালে যখন আমি ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেডএ ফিল্ড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাই এবং বীমা শিল্পকে পেশা হিসাবে মন থেকে স্থির করে নিয়েছি। বীমাশিল্পে পদার্পণের পর প্রথমেই যে বিষয়টি লক্ষ্য করি সেটি হলো সাধারণ মানুষের মনে বীমার প্রতি আস্থার সংকট। সেজন্য যোগদানের পর প্রথমেই বীমা শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে চেষ্টা করি। বিশেষ করে শুরু থেকেই আমি চেষ্টা করেছি সেবাধর্মী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রাহকসেবা, বীমা দাবি পরিশোধ, সততা, নিষ্ঠা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, আন্তরিকতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে মানুষকে বীমা সুবিধা প্রদান করতে চেষ্টা করি।
এখনো যে বিষয়টা আমার মনের ভিতর স্থান করে বসে আছে সেট হল, ১৯৮৭ সালে যখন চট্টগ্রামে আমি ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেডএ প্রথম জীবন শুরু করার সুযোগ পাই তখন সাধারণ মানুষ বীমা কি এটাও জানত না এবং নগদ টাকায় বীমা করে টাকা ফেরত পাবে কিনা মানে বীমার প্রতি আস্থার সংকট। ন্যাশনাল লাইফে চট্টগ্রামে যুক্ত হওয়ার পর প্রথম আমি আমার বাসার জন্য একটা চেয়ার ও টেবিল কিনতে একটা কাঠের দোকানে যাই, কথা বলতে বলতে দোকানিকে বললাম, আপনি বীমা করেছেন ? দোকানি বলল, বীমা কি সে জানে না। তখন আমার চেয়ার টেবিল কেনার সুযোগে তাঁকে সব বুঝালাম, আমার প্রতি বিশ্বস্থতায় বীমা পলিসি গ্রহন করে এবং চারশত পঞ্চাশ টাকা(৪৫০/-) নগদ প্রিমিয়াম জমা করে। মেন রোডের পাশে কাঠ দোকান, বেশ কদিন পর অসাবধানতা বসত রাস্তা পার হওয়ার সময় চলন্ত গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে লোকটা মারা যায়, দ্বিধায় ছিলাম তাঁকে তার পাওনাটা ফেরত দিতে পারব কিনা? আমার কর্তৃপক্ষকে জানানোর কদিনের মধ্যে দোকানির পরিবারের হাতে চল্লিশ হাজার(৪০,০০০/-)টাকার চেক তুলে দিয়ে বীমা দাবীর দ্বায় শোধ করতে পেরে নিশ্চিত হতে পারি যে, জীবনের জন্য এবং পরিবারের জন্য পৃথিবীতে বীমাই(জীবনবীমা) হল সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ট পেশা এবং সর্বশ্রেষ্ট নিরাপদ বিনিয়োগ। তখন থেকেই বীমাকে জীবনের পেশা এবং সম্মান হিসাবে গ্রহন করি।

অর্থনীতির ৩০ দিন : চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইলের এত ছোট্ট একটা দেশে এতগুলি বীমা কোম্পানী, শোনা যাচ্ছে আরো কয়েকটা কোম্পানী অনুমোদনের অপেক্ষায় পাইপ লাইনে, প্রকৃতভাবে এতগুলি কোম্পানীর প্রয়োজনীয়তা আছে কি ?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : ৫৪ হাজার বর্গমাইলের বিপুল জনসংখ্যার ছোট্ট একটি দেশ হলেও বাংলাদেশে বীমা গ্রাহকের হার অত্যন্ত পুওর। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ বীমার আওতায়। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বীমার অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ। যেখানে উন্নত বিশ্বে এই হার প্রায় শতভাগ। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জিডিপিতেও বীমার অবদান ৪ দশমিক ২ শতাংশ। নেপাল, থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশেও এ হার মোটামোটি সন্তোষজনক। আমাদের দেশের বীমা খাত পিছিয়ে থাকার বড় কারণ গ্রাহকের আস্থা ও সচেতনতার অভাব। বীমার প্রতি মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে হলে বীমা কোম্পানীগুলোকে গ্রাহক সেবার মান বৃদ্ধি, সময়মত বীমা দাবী পরিশোধের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। দেশে জীবন বীমা কোম্পানির সংখা কিছু বেশি হলেও জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক বিবেচনায় নির্দিষ্ট মাত্রার জীবন বীমার গ্রাহক তৈরি করা গেলে এতগুলি কোম্পানিতেও তেমন কোন প্রভাব পড়বেনা বলে আশা করা যায়।
অর্থনীতির ৩০ দিন : আপনার মতে বীমা শিল্পের প্রতি আমাদের দেশের সাধারন মানুষের নেতিবাচক ধারনার এবং বীমা শিল্পের চাকুরিতে আসতে না চাওয়ার কারন কি এবং কেন?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : একটু সহজ ও সাবলিল ভাষায় বললে, বীমার উপকারিতা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকা এবং বীমা নিয়ে নানা নেতিবাচক প্রচারণা বা অপপ্রচার এই খাতকে পিছিয়ে রেখেছে, যার কারণে বাংলাদেশে বীমা শিল্পের কাক্সিক্ষত প্রসার ঘটেনি। এ জন্য সাধারণ মানুষ বীমা কোম্পানীগুলিতে চাকরিতে আসা বা পলিসি গ্রহণে অনাগ্রহী। তবে আশার কথা হলো- সরকার ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ)এর নানামুখী পদক্ষেপের ফলে বীমার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বীমা আইন ২০১০ এবং জাতীয় বীমানীতি ২০১৪ প্রণনয়, বীমা কোম্পানীগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সারা দেশে জাতীয় বীমা দিবস পালনের মাধ্যমে বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ছে এবং বীমা শিল্পের প্রতি শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আগ্রহ ক্রমান্ময়ে বাড়ছে। বীমা খাতের এটা সফল বার্তা।
আমরা জানি আমাদের জাতির পিতা একজন বীমা বান্ধব ব্যক্তি ছিলেন। তার এই বীমাখাতে যোগ দেওয়ার দিনটিকে স্মরণিয় করে রাখতেই ১লা মার্চ জাতীয় বীমা দিবস পালন করা হয়। বীমা খাতের জন্য বীমা দিবসটি বেশ সম্মান ও গৌরবের…

অর্থনীতির ৩০ দিন : ব্যাংক ও বীমা দেশের অন্যতম আর্থিক খাত হলেও শুধু বীমা খাতে জাতীয় দিবস পালিত হচ্ছে। একটি স্বনামধন্য বীমা কোম্পানীর মুখ্য নির্বাহী হিসেবে বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন।
মোঃ কাজিম উদ্দিন :
জাতীয় বীমা দিবস অবশ্যই দেশের বীমাখাতের জন্য গর্বের ও সম্মানের। যেকোনো জাতীয় দিবসের সঙ্গে দেশের গৌরব, মর্যাদা এবং সম্মান জড়িত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত ১ মার্চ জাতীয় বীমা দিবস ঘোষণার মাধ্যমে বীমা শিল্পকে গৌরবময় এবং মর্যদাপূর্ণ করেছেন। এর মাধ্যমে অবহেলিত বীমা শিল্প একটি সম্মানজনক স্থানে পৌঁছেছে বলে আমি মনে করি। আর এই খাতের একজন কর্মী বলেই বীমা দিবসটি আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
অর্থনীতির ৩০ দিন : যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বীমা দিবস পালিত হয় তার বাস্তব প্রতিফলন কতটুকু ঘটছে?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : বীমা খাতের জন্য বীমা দিবসটি বেশ সম্মান ও গৌরবের। এই দিবসকে কেন্দ্র করে বীমা কোম্পানীগুলো নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আইডিআরএ এর নির্দেশনায় সারা দেশে সরকারীভাবে বীমা নিয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য শোভাযাত্রা, লিফলেট বিতরণ, আলোচনা সভাসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে বীমা প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ছে। তাই আমি মনে করি, বীমা দিবস পালনের কারণে এ খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অর্থনীতির ৩০ দিন : অতীতের তুলনায় বর্তমানে বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কী বাড়ছে?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : এক সময় বীমা কোম্পানীগুলো প্রিমিয়াম আদায় করতো হাতে লেখা রশিদ দিয়ে। এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহক সেবায় জটিলতা হতো। তবে বর্তমানে সময় বদলেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশে বীমা কোম্পানীগুলোর কায়ক্রমও ডিজিটাল হচ্ছে। এখন প্রিমিয়াম আদায়ে ডিজিটাল রশিদ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ গ্রাহক প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার মুঠোফোনে এসএমএস চলে যাচ্ছে। আইডিআরএও এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদের পলিসির তথ্য দিচ্ছে। এতে গ্রাহক তার প্রিমিয়াম জমা হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছে। ফলে অনাস্থা দূর হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বাসও বাড়ছে।
অর্থনীতির ৩০ দিন : দেশের জনসংখ্যার তুলনায় জীবন বীমা গ্রাহকের হার অতি নগণ্য। পার্শ্ববর্তী দেশেসহ উন্নত বিশ্বে বীমা গ্রাহকের হার অনেক বেশী। বাংলাদেশের মানুষ বীমা গ্রহণে অনিহা কেন?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : বিপুল জনসংখ্যার দেশ হলেও বাংলাদেশে বীমা গ্রাহকের হার অত্যন্ত নগণ্য। আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ বীমার আওতায় এসেছে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বীমার অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ। উন্নত বিশ্বে এই হার শতভাগের কাছাকাছি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জিডিপিতেও বীমার অবদান ৪ দশমিক ২ শতাংশ। নেপাল, থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশেও এ হার বেশ সন্তোষজনক। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশের বীমা খাত পিছিয়ে থাকার বড় কারণ গ্রাহকের আস্থা ও সচেতনতার অভাব। আরও সহজ করে বললে, বীমার উপকারিতা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকা এবং বীমা নিয়ে নানা নেতিবাচক প্রচারণা বা অপপ্রচার এই খাতকে পিছিয়ে রেখেছে। এ কারণে বাংলাদেশে বীমাশিল্পের কাক্সিক্ষত প্রসার ঘটেনি। এ জন্য সাধারণ মানুষ বীমা পলিসি গ্রহণে অনাগ্রহী। তবে আশার কথা হলো- সরকার ও আইডিআরএ এর নানামুখী পদক্ষেপের ফলে বীমার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বীমা আইন ২০১০ এবং জাতীয় বীমানীতি ২০১৪ প্রণনয়, বীমা কোম্পানীগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সারা দেশে জাতীয় বীমা দিবস পালনের মাধ্যমে বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ছে। তবে বীমার প্রতি মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে হলে বীমা কোম্পানীনিগুলোকে গ্রাহক সেবার মান বৃদ্ধি ও সময়মত বীমা দাবী পরিশোধ করতে হবে।

অর্থনীতির ৩০ দিন : সদ্য প্রবর্তিত ব্যাংকাস্যুরেন্সের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কতটুকু দেখছেন?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : বাংলাদেশে ব্যাংকাস্যুরেন্সের বিপুল সম্ভাবনা সম্ভাবন রয়েছে। ব্যাংকাসুরেন্স প্রবর্তন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে বীমা জনগণের কাছে আরও সহজলভ্য হবে ও জনগণের আর্থিক নিরাপত্তা সুবিধা সম্প্রসারিত হবে। বাংলাদেশের বর্তমান ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ১০ কোটি মানুষ প্রাপ্তবয়ষ্ক। কিন্তু এই ১০ কোটি কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে বীমার আওতায় আছে ১ কোটিরও কম। আশা করছি ব্যাংকাসুরেন্সের মাধ্যমে বীমার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে এবং বীমায় পেনিট্রেশন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যাংকাসুরেন্সের মাধ্যমে বীমা গ্রহণের হার প্রায় ৫৫% এবং এজেন্সী এবং অন্যান্য চ্যানেলের মাধ্যমে বীমা গ্রহণের হার প্রায় ৪৫%। শুধুমাত্র ভারতের এসবিআই লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০২২ সালের তাদের অর্জিত মোট প্রিমিয়াম ২৯,৫৯০ কোটি রুপির মধ্যে ব্যাংকাসুরেন্সের মাধ্যমে আয় করেছে ১৭,৮৩০ কোটি রুপি, যা তাদের মোট প্রিমিয়ামের ৬০%।
আমরাও সার্বিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যাংকাসুরেন্সকে এগিয়ে নিতে পারলে আমাদেরও বিপুল প্রিমিয়াম আয় সম্ভব হবে যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
অর্থনীতির ৩০ দিন : বীমা দাবী পরিশোধ বিষয়ে আপনার সার্বিক মতামত উল্লেখ করুন?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : বীমা দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য বীমা দাবি পরিশোধকে উৎসাহিত করা। বর্তমানে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এ ব্যপারে কার্যকর ভুমিকা পালন করছে। বীমা দাবি পরিশোধে শুধু যে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক লাভবান হন তা নয়, বরং এতে পুরো বীমা খাত লাভবান হয়। সঠিক সময়ে বীমা দাবি পরিশোধ করা হলে বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও আস্থা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ জন্য কোম্পানীগুলোকে মেয়াদ পূর্তির পরই দ্রুত বীমা দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। পদ্ধতিগত কার্যক্রমের নামে সময়ক্ষেপন না করে দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি করতে হবে। দাবির চেক প্রদানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা গেলে বীমা নিয়ে নেতিবাচক ধারনা দূর হবে এবং ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে; যা নতুন গ্রাহক সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ন্যাশনাল লাইফ ২০২৩ সালে ১০৯৩ কোটি টাকা দাবী পরিশোধ করে। ফলশ্রুতিতে ২০২৩ সালে আমরা সর্বমোট ১৮৬৪ কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করতে সক্ষম হয়েছি।

অর্থনীতির ৩০ দিন : সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী আপনার প্রতিষ্ঠানের সর্বমোট মোট বিক্রিত পলিসির সংখ্যা, গ্রাহকের সংখ্যা, পরিশোধিত দাবীর সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ, দাবি নিষ্পত্তির হার, লাইফ ফান্ড, বর্তমান বিনিয়োগ কত?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : ২৩ এপ্রিল ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৪০ বছরে ন্যাশনাল লাইফের বিক্রিত বীমা পলিাসর সংখ্যা ৬৭ লক্ষাধিক, সর্বমোট প্রিমিয়াম অর্জিত হয়েছে ১৭,১৮১ কোটি টাকা, লাইফ ফান্ড ৫ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা, বিনিয়োগ রয়েছে ৫ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা এবং মোট সম্পদ ৬ হাজার ০৬৪ কোটি টাকা। তাছাড়া ২৩ এপ্রিল ২০২৪ সাল পর্যন্ত সর্বমোট দাবী পরিশোধ করা হয় ১০ হাজার ১২৪ কোটি টাকা।
আমাদের লাইফ ফান্ডের ৯৫ শতাংশই সরকারি ট্রেজারি বন্ডে ৩৮% সহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা আছে। কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় ও গ্রাহকের দাবি পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখতে গত ৩৯ বছর ধরে লাইফ ফান্ডের টাকা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। অতীতে ন্যাশনাল লাইফে কখনও আর্থিক সংকট দেখা দেয়নি, ভবিষ্যতেও এমন সম্ভাবনা নেই। প্রতি বছরে লাইফ ফান্ড উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ জন্য ন্যাশনাল লাইফ আজ সুদৃঢ় আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতির ৩০ দিন : বীমা খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ভুমিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : বীমা খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিআইএ গঠনের পর থেকে সংগঠনটির বীমা শিল্পের উন্নয়ন ও সমস্যা সমাধানে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে। ইতোপূর্বে যারা সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন তারা সবাই বীমা শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে বিআইএর বর্তমান প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেনের বিচক্ষণ ও দূরদর্শী চিন্তাচেতনায় বাংলাদেশের বীমা খাত অনেক এগিয়ে গেছে।
আইডিআরএ গঠন, নতুন বীমা আইন প্রবর্তন ও জাতীয় বীমা দিবসসহ বীমা শিল্পের সার্বিক উন্নয়নে বিআইএ জড়িত। বিআইএর প্রচেষ্টায় জাতীয় বীমা দিবসে কোম্পানীগুলোকে জাতীয় পুরস্কার প্রদান বিআইএর অন্যতম অবদান।

অর্থনীতির ৩০ দিন : আপনার মতে বীমা খাতের উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে আরও কি ধরণের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন?
মোঃ কাজিম উদ্দিন : বীমা খাতের সার্বিক উন্নয়নে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে আসছে। তারপরও এ খাতের উন্নয়নে সংস্থাটির আরো কিছু পদক্ষেপ গ্রহনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে আমি মনে করি। বিশেষ করে লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো লাইফ ফান্ডের টাকা আইডিআরএ এর গাইডলাইন অনুযায়ী সরকারী ট্রেজারী বন্ডে বিনিয়োগ করছে কিনা তা নিশ্চিতকরণে আইডিআরকে বিশেষ তদারকি করতে হবে। লাইফ ফান্ডের টাকা যথাযথ বিনিয়োগ করা হলে বীমা দাবী পরিশোধে কোম্পানীগুলোকে সমস্যায় পড়তে হবেনা। ফলে এখাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। তাছাড়া তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, যুগোপযোগী বীমা পরিকল্প প্রণয়নে কোম্পানীগুলোকে নীতি সহায়তা প্রদান, বীমা প্রসারে সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করতে হবে ও সকলের জন্য জীবনবীমা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
অর্থনীতির ৩০ দিন : অর্থনীতির ৩০ দিন পত্রিকাটি সম্পর্কে কিছু বলুন
মোঃ কাজিম উদ্দিন : অর্থনীতির ৩০ দিন পত্রিকাটি (ম্যাগাজিন) দেশের ব্যাংক, বীমা, শিল্প বিষয়কসহ তথ্যবহুল অর্থনীতি, দেশ জাতি ও সমাজ উন্নয়নের পটভুমির উপর নির্ভরশীল সু-পরিছন্ন একটি পত্রিকা। সাহিত্য সাংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সমৃদ্ধ একটি জ্ঞানের ভান্ডার হিসাবেও ভাল ভুমিকা রাখার এবং পড়ার মানসম্মত একটি পত্রিকা । শিক্ষিত ও সুশীল সমাজের নিকট পত্রিকাটির অত্যদিক গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও রাখবে বলে আশা করি।
অর্থনীতির ৩০ দিন : আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই…
মোঃ কাজিম উদ্দিন : আপনাকে এবং অর্থনীতির ৩০ দিন পরিবারের সবাইকে ধন্যবাদ, শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন…