খোন্দকর জিল্লুর রহমান :
২০১৯ সালে শুরু হওয়া করোনা ও নানামুখি সঙ্কটে গত দুই বছরে বেহা অবস্থায় দেশের বীমা খাত। তবুও কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন উদ্যোগ নিয়ে এসেছে বীমা খাত। তাই সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ আর সম্ভাবনা নিয়েই সামনে এগিয়ে যাবে দেশের বীমা খাত -এমনটাই প্রত্যাশা বেশ কজন মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার।
এসএম নুরুজ্জামান, মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, জেনিথ ইসলমী লাইফ ইন্স্যুরেন্স:
২০১৯ সালে শুরু হওয়ার করোনার আঘাত ২০২১ সালেও আমাদের বহন করতে হয়েছে। তবে এর মাঝেও অব্যাহত ছিল বীমা সেবা। বছরের শেষার্ধে এসে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হলে বীমা কোম্পানিগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে।
গেলো বছর অনেক কোম্পানি ভালো ব্যবসা করতে পেরেছে। আলহামদুলিল্লাহ, জেনিথ ইসলামী লাইফও ভালো ব্যবসা অর্জন করেছে।
আশা করছি নতুন বছরে ভালো ব্যবসা হবে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ২০২১ সালটা আমাদের সাহস যোগাবে। আমরা নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এবং নতুন উদ্যোমে কাজ করতে চাই। ইনশাল্লাহ এ বছর আমাদের ব্যবসা আগের বছরের চেয়ে আরো ভালো হবে।
মো. জালালুল আজীম, মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স:
২০২১ সালে বীমা খাতে ব্যবসা ভালোই হয়েছে বলে আমার ধারণা, যদিও চ্যালেঞ্জ ছিল। ২০২০ সালে হঠাৎ করে আমাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। কিন্তু ২০২১ সালে আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলার করার জন্য অনেকটা প্রস্তুত ছিলাম। যার কারণে গেলো বছরের ব্যবসায় তেমন কোন ক্ষতি হয়নি।
২০২২ সালেও আমাদের সবার ব্যবসা ভালো হবে বলে প্রত্যাশা। তবে এক্ষেত্রে গতানুগতিক পদ্ধতিতে আমরা যে সেলস করে থাকি সেখান থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। আমাদেরকে ডিজিটাইজেশনের চিন্তা করতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা প্রদান করতে হবে।
বীমা খাতে বড় সমস্যা হলো ইমেজ সংকট। যদিও আইডিআরএ, বিআইএসহ সংশ্লিষ্টরা এটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে কিন্তু গেলো বছর দেশের শীর্ষ স্থানীয় দু’টি কোম্পানি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ও ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ঘটনা এটাকে আরো কঠিন করে তুলেছে।
কোম্পানি দু’টির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তারা বীমা গ্রাহকদের দাবি দিতে পারছে না। এটা কাটিয়ে ওঠা কঠিন। এ ছাড়াও দক্ষ জনবলের অভাব ও পেনিট্রেশন হার কম হওয়াটা বীমা খাতের আরেকটি বড় সমস্যা। এক্ষেত্রে বীমা নীতিমালা ২০১৪ কে নতুন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এটার মেয়াদ শেষ হলেও এর বাস্তবায়ন হয়েছে কেবল ৪০ শতাংশ।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শফিক শামিম, মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্স:
নতুন বছরে চ্যালেঞ্জ একটাই- কোভিড। যদি নতুন করে কোভিড সংক্রমন না হয় তাহলে আশা করি ভালো যাবে। গত বছরের ব্যবসার হিসাব আমরা অফিসিয়ালি এখনো শেষ করিনি, তবে ২০২০ সালের মতোই ব্যবসা হয়েছে ২০২১ সালে।
২০২২ সালে যদি কোভিড সমস্যা না বাড়ে তাহলে আমাদের ব্যবসা বাড়বে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে আমাদের পরিচিতি বাড়ছে। আমাদের প্রতি মানুষের আস্থা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন বছরটি ভালোই যাবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
এ ছাড়াও মটর ইন্স্যুরেন্স নিয়ে এখন কথা হচ্ছে যে, এটা নতুন নামে বা নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসবে। সেটা হতে পারে থার্ড পার্টি বা কমপ্রিহেন্সিভ হিসেবে। এটাতে ব্যবসা বাড়বে। সকল কোম্পানির জন্য ভালো হবে। এখন ব্যবসা হচ্ছে, মটর ইন্স্যুরেন্স বাদ দিয়ে।
আমাদের যেহেতু মটর ইন্স্যুরেন্সের বড় পোর্টফোলিও ছিল, তাই এটা ফিরে আসলে এ বছর আমাদের ব্যবসা আরো ভালো হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে আমরা পরিচিতিটা নতুন, তবে আমাদের কোম্পানির চাহিদা বাড়ছে এবং তা এখনো কমেনি, স্থিতিশীল রয়েছে।
পাশাপাশি এ বছরে আমাদের আরো দু’একটি নতুন বীমা পরিকল্প চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এগুলো চালু হলে আমি মনে করে ২০২২ সালে আমাদের ব্যবসা আরো বাড়বে।
এমএম মনিরুল আলম, মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, বেঙ্গল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স:
২০২১ সালে প্রায় সব কোম্পানি ভালো ব্যবসা করেছে। আমাদের বেঙ্গল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সও ভালো ব্যবসা অর্জন করেছে। যদিও কয়েকটি কোম্পানি ইমেজ সঙ্কট তৈরি হয়েছে তারপরও আশা করি ২০২২ সাল ভালো যাবে। আমাদের সার্ভিস তথা ম্যাচুরিটি, এসবিসহ বীমা দাবি ঠিকমতো দিতে পারলে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা আরো বাড়বে।
করোনার কারণে ব্যবসা কিছুটা কম হলেও অনেক কোম্পানি তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই সফলতা কোম্পানিগুলোকে আগামীর জন্য সাহস যোগাবে। এর ফলে বীমা কোম্পানিগুলো আরো বেশি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করবে।
করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও বীমা সেবা অব্যাহত রাখার কারণে কোম্পানিগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতা আরো বেড়েছে। পরিস্থিতি যদি ২০২১ সালের মতোই থাকে তারপরও আমি মনে করি ২০২২ সালে কোম্পানিগুলো ভালো করবে। কারণ, মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি -সবই বেগমান।
মো. খালেদ মামুন, মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স:
২০২০ ও ২০২১ সালে একই চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু আমরা সফলভাবে আমাদের কাজ করতে পেরেছি। ফিজিক্যাল ও ভার্চুয়াল উভয়ভাবেই কাজ হয়েছে। বছরের শুরু থেকেই আমরা রোটেশনের ভিত্তিতে আমাদের সেবা অব্যাহত রেখেছি। অবশ্য পরবর্তীতে আইডিআরএ’র নির্দেশনা অনুসারে ২৫ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে, পরে ৫০ শতাংশ নিয়ে অফিস পরিচালনা করা হয়েছে। বছরের শেষার্ধে এসে পরিপূর্ণভাবে গ্রাহকসেবা প্রদান করা হয়েছে।
শুরুর দিকে সবার ব্যবসাতেই উত্থাপন-পতন ছিল। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা গেছে মটর ইন্স্যুরেন্স ব্যবসায়। আমাদের অনেক ব্রাঞ্চ রয়েছে মটর ইন্স্যুরেন্স ভিত্তিক। প্রত্যান্ত অঞ্চলের অনেক ব্রাঞ্চের অবস্থা আরো খারাপ ছিল, বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এ ছাড়াও অনেক কোম্পানি কমপ্লায়েন্ট ছিল না। যার প্রভাবও ছিল ব্যবসার ওপর। তবে আইডিআরএ’র নির্দেশনা সঠিকভাবে মানলে এ সমস্যা হতো না।
সার্বিকভাবে ২০২১ সালের ব্যবসা ভালোই হয়েছে। কোভিড পরিস্থিতি যদি আর খারাপ না হয় তাহলে নতুন বছরেও আমরা ভালো ব্যবসার প্রত্যাশা করছি। এরই সাথে মটর ইন্স্যুরেন্সটা যদি চালু করা হয় এবং অসুস্থ চর্চা যদি বন্ধ হয় তাহলে ব্যবসার পরিস্থিতি আরো ভালো হবে বলেই আমার বিশ্বাস। অসুস্থ চর্চা বন্ধে বিআইএ ভালো চেষ্টা করেছে, তবে এটা বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে।
তারিক-উর রহমান, মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স:
২০২১ সালটা ভালো যায়নি, ২০২০ সালের মতোই ছিল। করোনা পরিস্থিতির কারণে বিগত দু’টি বছরে তেমন ভালো ব্যবসা হয়নি বীমা খাতে।
২০২২ সালও মনে হচ্ছে একই রকম থাকবে। কারণ এখনো করোনা আছে। তাই খুব একটা আশাবাদি না। নতুন বছরের জন্য আমি করোনাকেই বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছি।
সূত্র : ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি












