সংশোধিত ব্যাঙ্কাস্যুরেন্সন বীমা শিল্পের মাইলফলক

মীর নাজিম উদ্দিন আহেমদ :
অর্থনীতির ৩০ দিন, ব্যাংক বীমা অর্থনীতি, ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি ও ব্যাংক বীমা শিল্প পত্রিকার মাধ্যমে ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স সম্পর্কে স্যমক ধারনার ভিত্তিতে ২৯শে মে, ২০২৩ইং তারিখে ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স প্রয়োগিক ভাবনা এই বিষয়ে আমার একটি লেখা কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নন-লাইফ বীমার শাখা ব্যবস্থাপকগণ ইতিমধ্যে ‘ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স’ বন্ধ করার জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (অইডিআরএ), বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে তাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের ১ম ভাইস প্রেসিডেন্ট নাসির উদ্দিন আহমেদ (পাভেল), ভাইস প্রেসিডেন্ট এ.কে.এম মনিরুল হক এবং এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য মোজাফ্ফর হোসেন পল্টু সাহেব তাদের আশ্বস্থ করেন যে, তারা এসোসিয়েশনের সম্মানিত প্রেসিডেন্ট জনাব শেখ কবির হোসেন এর সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সকল নন-লাইফ বীমার শাখা ব্যবস্থাপকগণ নিরবতা পালন করেন। ইতিমধ্যে ১৮ই জুলাই, ২০২৩ মন্ত্রণালয় হতে “বাংলাদেশ তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স প্রবর্তনের লক্ষ্যে” গেজেট নোটিফিকেশন জারি করা হয়। ২০শে জুলাই, ২০২৩ইং তারিখে বিআইএ এর প্রেসিডেন্ট মহোদয় জনাব শেখ কবির হোসেন ‘ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স’ গাইড লাইনে কিছু তথ্য সঠিক নয় বলে তা সংশোধনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মহোদয়ের নিকট ‘ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স’ চালুর জন্য কিছুটা সময় চান।
সম্মানিত বিআইএ-র প্রেসিডেন্ট মহোদয়কে সময় চাওয়া লাগতো না যদি ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স গাইডলাইন্স তৈরী কমিটিতে বীমা কো¤পানী থেকে যোগ্য, শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত, বীমা ব্যবসার উন্নয়নের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত দক্ষতা স¤পন্ন বীমা মনস্ক ব্যক্তিদের নির্বাচন করা যেত যারা বীমা ব্যবসা নিয়ে গবেষণা করেন ও বীমা শিল্পকে বিধি নিষেধের মধ্যে থেকে উচ্চ মাত্রায় নিয়ে যেতে চান।
সেদিনই “প্রথম আলো” পত্রিকায় বিআইএ-কে হেয় প্রতিপন্ন করে জনাব ফখরুল ইসলাম একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যার হেড লাইন এমন “ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স চালু করতে বীমা মালিকদেরই বাধা, নেপথ্যে কি”?
এই বিষয়ে তথ্য প্রমান দিয়ে আমি ‘ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স’ প্রয়োগিক ভাবনা-২ ১০ইং আগস্ট, ২০২৩ইং তারিখে “প্রথম আলো” পত্রিকার সংবাদের প্রতিবাদ করি। সংবাদ পড়ার পর বিআইএ এর সম্মানিত প্রেসিডেন্ট সাহেব আমাকে ফোন দিয়ে অভিনন্দন জানান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক সংশোধিত ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স ১২ই ডিসেম্বর ২০২৩ ইং থেকে কার্যকর হয়েছে। এই জন্য অবশ্যি কিছু নিয়ম কানুন পরিপালনের কথা বলা হয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ১৯শে ডিসেম্বর ২০২৩ ইং তারিখে একটি সংশোধিত ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স নির্দেশনা জারি করেছেন। তাতে নন-লাইফ
বীমার আওতাভুক্ত পণ্য সমূহ শুধুমাত্র মোটর, ভ্রমন, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শস্য বীমা ব্যাংকসমূহ বিপণন করতে পারবে বলা হয়েছে। সেজন্য সকল পক্ষকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
বীমা ব্যবসায় বীমা কোম্পানী এবং বীমা ব্যবসা সংগ্রহে নিয়োজিত বীমা কর্মীবৃন্দ বীমার প্রাণ। এদের বাদ দিয়ে যেমন বীমা ব্যবসা সংগ্রহ করা যায় না তেমনিভাবে আমাদের ব্যবসা প্রসারে বিকল্প সোর্সেরও প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশে লাইফ ইন্স্যুরেন্স এর প্রচার প্রসারে ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স বিরাট ভুমিকা পালন করবে। ব্যাংক তার প্রত্যন্ত অঞ্চলের শাখাগুলোর মাধ্যমে বীমা গ্রহীতাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারবে সে ক্ষেত্রে তাদের বীমা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে বা যথাযথ জ্ঞান স¤পন্ন লোকজনদের ব্যাংকে নিয়োগ দিতে হবে। ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহারের ফলে যারা বীমা করবেন অর্থাৎ গ্রাহকগণ তাদের প্রিমিয়াম ব্যাংকে জমা দিয়ে নিশ্চিত হতে পারবেন যে তার জমাকৃত টাকা কেউ আত্মসাৎ করতে পারবে না। এই প্রক্রিয়া লাইফ বীমার জন্য পজেটিভ দিক।
লাইফ বীমার ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স একটি সমস্যা হতে পারে যা হলো ব্যাংক কর্মকর্তাদের বীমা গ্রহীতাদের সব সময় মনিটরিং করে বীমা প্রিমিয়ামের কিস্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া বা তাগাদা দিয়ে তা জমার ব্যবস্থা করা সম্ভব নাও হতে পারে।
অন্যদিকে এজেন্টগণের সংসার অর্থাৎ রুটি-রুজি যেহেতু সংগৃহীত বীমা প্রিমিয়ামের উপর নির্ভরশীল তাই তারা প্রতিনিয়ত বীমা গ্রহীতাদের কাছ থেকে কিস্তি আদায়ে তৎপর থাকে যা ব্যাংকের ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটতে পারে।
বর্তমানে বীমা শিল্পে কর্মরত অনেক বীমাকর্মীরা/উন্নয়ন কর্মকর্তারা/এজেন্টরাই বীমা শিল্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন বীমা প্রকল্প সম্পর্কে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং স্বাচ্ছন্দে কাজ করছেন। ব্যাংক কর্মকর্তা বা ব্যাংকে যারা বীমা নিয়ে কাজ করবেন তাদের প্রশিক্ষণের কথা সংশোধিত ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স নির্দেশিকায় বলা আছে। তবুও তাদের ৭২ ঘন্টার প্রশিক্ষণের বদলে এক মাস বা তিন মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের নির্দেশনা বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ থেকে দিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
লাইফ বীমার কয়েকটি কোম্পানীর অর্থ লোপাটের ফলে পুরো বীমাশিল্পে যে অন্ধকার নেমে এসেছে। বীমা গ্রহীতাদের সকল প্রকার দাবী পরিশোধ করে তা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।

নন-লাইফ বীমা ব্যবসা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ব্যাংক লোন ও এল.সি. খোলার সময় বীমা করা বাধ্যতামূলক। তাই এই ব্যবসা সংগ্রহে লাইফ বীমার মতো তেমন কোন চ্যালেঞ্জ নেই, তবে নন-লাইফ বীমা ব্যাংকের উপর অনেকটা নির্ভরশীল আর সেই কারণেই অনৈতিক কমিশন বাণিজ্য হয় যার কারণে নন-লাইফ বীমায় ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধি পায়। সংশোধিত ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স নির্দেশিকার ফলে কিঞ্চিত ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমতে পারে যদি ব্যাংক থেকে কর্পোরেট এজেন্ট এর নির্ধারিত কমিশনে ব্যবসা আহরণ করা যায়।
ব্যাংকগুলোই নন-লাইফ বীমাকে নিয়ন্ত্রণ করে তাই ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স বাস্তবায়ন করতে হলে সর্ব প্রথম ব্যাংকগুলোর অনৈতিক কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করার উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে, নতুবা সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ বিফলে যাবে।
দ্বিতীয়তঃ ব্যাংকের ইন্টারনাল সার্কুলার বন্ধ করতে হবে যার মাধ্যমে ব্যাংক নির্দিষ্ট কিছু নন-লাইফ বীমার সাথে কাজ করার নির্দেশনা তাদের শাখাগুলোকে দিয়ে থাকে।
তৃতীয়তঃ ব্যাংকে এফ.ডি.আর. তাদের চাহিদা মতো দিতে না পারলে কাজ পাওয়া যায় না। আবার কখনো কখনো চাহিদা মতো এফ.ডি.আর. সরবরাহ করার পরে বলে ব্যবসা নেই বা অন্য কোম্পানী আরো বেশী এফ.ডি.আর. ও বেশী কমিশন দিচ্ছে তাই তাদেরকে কাজ দিচ্ছি।
চতুর্থতঃ কয়েকটি বীমা কোম্পানীর লাইফ এবং নন-লাইফ দুই সেক্টরেই বীমা ব্যবসা থাকাতে লাইফ এর এফ.ডি.আর. দিয়েও নন- লাইফের বীমা ব্যবসাকে প্রভাবিত করছে।
ব্যাংকের কাছে কোন বীমা কোম্পানীর সার্ভিস, দাবী পরিশোধ ইত্যাদি বড় কথা নয় বরং কমিশন এবং এফ.ডি.আর. ব্যবসা পাবার বড় নিয়ামক। ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স বাস্তবায়নে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনকে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে বসে এর সমাধান করতে হবে নতুবা কিছু
বড় কোম্পানী লাভবান হবে। তবে মাঝারী ও ছোট কোম্পানীগুলোর ব্যবসা দ্রুততার সাথে কমতে থাকবে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে “ব্যাংকগুলো কর্পোরেট এজেন্ট লাইসেন্স” প্রাপ্তির পর বিভিন্ন লাইফ ও নন-লাইফ কোম্পানীর সাথে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হবে। ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স এর মানদন্ড অনুযায়ী ও বিভিন্ন পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৩৪টি ব্যাংক যাদের বীমা কোম্পানীর সাথে বর্তমানে কর্পোরেট চুক্তি করার মতো অবস্থা নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বীমা কোম্পানীর তুলনায় ব্যাংকগুলো আরো বেশী রুগ্ন।
বাংলাদেশে ৬১টি ব্যাংক থাকলেও ৩৪টি রুগ্ন ব্যাংক বাদ দিলে ২৭টি ব্যাংক ব্যাঙ্কুস্যুরেন্স গাইডলাইন্স অনুযায়ী কার্যতঃ কর্পোরেট এজেন্ট হিসাবে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে ৭-৮টি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ও ব্যবসায়িক লেন-দেন ভালো বাকীগুলো মাঝারী মানের। যে সকল বীমা কোম্পানীগুলো ভালো ব্যাংকগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হবে তাদের আর্থিক অবস্থা বর্তমান অবস্থা থেকে আরো ভালো হবে ও যারা অবস্থাকৃত দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাথে কাজ করবে তাদের অবস্থার তেমন কোন উন্নতি হবে না।

বীমা শিল্পে সলভেন্সি মার্জিন একটি বড় ফ্যাক্টর। কোম্পানীসমূহের কমিশন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সঠিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে সলভেন্সি মার্জিন রক্ষা করা সম্ভব হবে না। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বড় শহরগুলোতে বীমা কোম্পানীর কয়েকটি শাখা বা উপশাখা একটি স্পেস-এ চালুর অনুমতি দিলেও খরচ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অন্ততঃ অফিস ভাড়ার খরচ অনেকটা সাশ্রয় হয়। সে বিষয়টি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।
বীমা কোম্পানী, বীমাকর্মী, উন্নয়ন কর্মকর্তা ও এজেন্ট, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সকল তফসিলি ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সার্বিক সমর্থন ও সহযোগীতায় ব্যাঙ্কাস্যুরেন্স এর সফল বাস্তবায়ন কামনা করছি।
“বীমা জীবনের, বীমা স¤পদের, বীমা নিরাপত্তাই হউক আমাদের মূলমন্ত্র”। কেউ যেন কখনো আঙুল উচিয়ে বীমা শিল্পের সাথে জড়িত কাউকে বলতে সাহস না পায় “কত পার্সেন্ট কমিশন মফিজ”!

লেখকঃ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)
ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স কোং লিঃ