আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি
অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
ভর্তিকৃত কোনো শিক্ষার্থী নেই। নিয়োগ দেয়া হয়নি শিক্ষকও। অনুপস্থিত শ্রেণীকক্ষের মতো শিক্ষার মৌলিক অবকাঠামো। তার পরও ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অবৈধ সনদ তৈরি করছে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি।
সম্প্রতি আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে আকস্মিক পরিদর্শনে যায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) একটি তদন্ত দল। ওই পরিদর্শনে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সনদ তৈরির প্রমাণ পান তদন্ত দলের সদস্যরা।
জানা যায়, সাময়িক অনুমতিপত্রের শর্ত অমান্য ও শিক্ষার মান ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেয় সরকার। এরপর ২০০৭ সালে সরকারের আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এরপর আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে সরকারের এসআরও জারিকে অবৈধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে রায় দেন আদালত। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ইউজিসি, যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তবে ২০১৪ সালে দেয়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অন্তর্র্বতীকালীন রায়ে বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু ঢাকার মেইন ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চালাতে পারবে।’
সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিলে আদালতের রায়ের আলোকে আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি পরিচালনার অনুমতি প্রদান-সংক্রান্ত বিষয়ে একটি কমিটি গঠনের জন্য ইউজিসিকে নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটিকে সরেজমিন তদন্তপূর্বক সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আখতার হোসেনকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ইউজিসির সদস্য ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা, ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক জাফর আহম্মদ জাহাঙ্গীর এবং কমিটির সদস্য সচিব ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান।
পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয় ও আদালতের নির্দেশনার আলোকে সরকার অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়টির রাজধানীর ক্যাম্পাস (৫৪/১, প্রগতি সরণি, বারিধারা, নর্দ্দা) সরেজমিন পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয় তদন্ত কমিটি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৫ জুন বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যায় তদন্ত কমিটি। এর ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে তারা।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষা কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। কোনো শিক্ষকও নিয়োগ করা হয়নি। উল্লিখিত ঠিকানায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মতো কোনো অবকাঠামো, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত নেই, কোনো শিক্ষা কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয় না। অথচ সেখানে অসংখ্য সার্টিফিকেট তৈরি করা হচ্ছে। ভবনের বিভিন্ন কক্ষে রক্ষিত কয়েকটি কম্পিউটারে বিভিন্ন প্রোগ্রামের অবৈধ সার্টিফিকেট প্রদানের বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। কম্পিউটারে সংরক্ষিত ফাইল দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে, প্রায় ১১২ জনকে বিভিন্ন প্রোগ্রামের সার্টিফিকেট প্রদানের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন বলেন, তদন্তের জন্য আমরা আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সেখানে সরেজমিনে যা দেখতে পেয়েছি, তাই তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রতিবেদনের বাইরে কিছু বলার নেই।
পরিদর্শনে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, উল্লিখিত ঠিকানার আটতলা ভবনে সাততলা পর্যন্ত শুধু বারিধারা জেনারেল হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ভবনটিতে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও দোকান রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০-এর ধারা ৬(৩) অনুযায়ী অন্যূন ২৫ হাজার বর্গফুট অবকাঠামো নেই। ভবন ভাড়ার চুক্তিপত্রও দেখাতে পারেনি। অষ্টম তলায় আনুমানিক ২২০০ বর্গফুট জায়গা ভাড়া করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোনো শ্রেণীকক্ষ নেই। এমনকি আসবাবপত্র নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ নিয়েও দ্বন্দ্ব রয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কমিটির পর্যবেক্ষণ হলো— বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি মামলার বিবরণী থেকে এটা প্রতীয়মান হয়, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ তিনটি ভাগে বিভক্ত। তাদের পরস্পরের মধ্যে মামলা চলমান রয়েছে। পরিদর্শনকালে তদন্ত কমিটিকে ১৬ সদস্যবিশিষ্ট বিওটি গঠন-সংক্রান্ত একটি ডিড প্রদান করা হয়। তবে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৮৬০-এর অধীনে নিবন্ধন-সংক্রান্ত কোনো তথ্য তারা দিতে পারেনি। এছাড়া ওই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদে যেসব বিওটি সদস্য ছিলেন, তাদের কেউই বর্তমান বিওটিতে নেই বলে প্রতীয়মান হয়। সার্বিক বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, আদালত ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে সনদ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ধরনের আইনের লঙ্ঘন সেখানে পেয়েছে। প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।












