নন-লাইফ বীমার ০% কমিশন নিয়ে কাদা ছোড়াছোড়ি কেন?

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর ০% কমিশন নিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং বীমা মালিকদের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) এর মধ্যে টম এন্ড জেরি খেলা চলতে চলতে বীমাখাত যখন ডুবতে বসেছে, সেইসাথে পুঁজি বিনিয়োগ করা মালিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, ঠিক তখনই অতীতের সকল হিসাব নিকাশ বাদ দিয়ে আইডিআরএ‘র উপর নির্ভর না করে বিআইএ কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে আইডিআরএ প্লাস বিআইএ ০% কমিশন বলবতের কঠিন সিদ্যান্তে উপনিত হন, যা ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কঠোরভাবে কার্যকর করত সমস্ত নন-লাইফ বীমা কোম্পানীকে আইডিআরএ‘র মাধ্যমে আদেশক্রমে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এসব বজ্রকঠোর সিদ্ধান্তের দু-মাস যেতে না যেতেই নিজস্ব উদ্যোগে নেয়া সিদ্ধান্তও ভিতরে ভিতরে বিতর্কিত হতে শুরু করেছে, কিন্তু কেন…!!!
আসলে দেশের জিডিপিতে অংশীদারিত্বের দাবীদার বীমা শিল্প। এই বীমা শিল্পের উন্নয়নে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র নিকট নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর প্রায় শতভাগ ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের দাবী ছিল ০% মানে শুন্য কমিশন। অপরদিকে নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর মালিকপক্ষ চাহিদা তার উল্টো। কারণ ব্যবসায়ীরা খুঁজে, ব্যবসা! তাদের কাছে নীতি নৈতিকতা মূল্যহীন। আর এই মূল্যহীন অবস্থা চলতে চলতে বীমা শিল্পের আজ বেহাল দশা। মালিকপক্ষ ছাড়াও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)ও ভিন্নতায় এগিয়ে আছে, আর না থাকবেই বা কেন? আইডিআরএ শুধু তর্জন গর্জনে আছে। যারা নীতি আদর্শ নিয়ে কাজ করেন তাদের জন্য না হলেও যারা নিয়মের ভিতরে ভিতরে অনিয়মের জন্ম দেন তাদের সাথে সবসময় সখ্যতায়। বীমা শিল্পের বিকাশে আইডিআরএ বড় বাধা হল সংশ্লিষ্টখাতে নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের প্রধান যারা হয়ে আসেন তাদের প্রকৃত বীমাখাতে অনভিজ্ঞতা, এবং রাজনৈতিক পদায়ন। ফ্যাসিবাদি সরকারের পতন এবং পলায়নের পর নতুন সদস্য (লাইফ,নন-লাইফ) যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তারা কতটুকু কি করতে পারবেন এর উপরও অনেকে নির্ভর করতে পারছেন না বলে মতামত প্রকাশ করেন।
এখন প্রশ্ন হল, সম্প্রতি ১ জনুয়ারি ২০২৬ হতে কার্যকরি হওয়া আইডিআরএ এবং বিআইএ’র যৌথভাবে শক্ত সিদ্যান্তে নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর ০% কমিশন দু-মাস যেতে না যেতেই ব্যাবসায়িক বাস্তবতায় সাময়িক বাধা খাওয়াতে নন-লাইফ বীমা কোম্পানী গুলোর এমডি/সিইওদের একজন অপরজনের দিকে সন্দেহের তীর নিক্ষেপ ও কাদা ছোড়াছোড়ির পর্যায়ে পর্যায়ে রূপ নিয়েছে। এসব কাদা ছোড়াছোড়ি দেশের বীমা খাতের জন্য অশনি সঙ্কেত এবং নতুন করে হাতে নেওয়া নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর ০% কমিশন প্রকল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে যাচ্ছে, যদিও বেশকিছু কঠিন শাস্তির ঘোষনা দিয়ে বিআইএ কয়েকজন এমডি/সিইওকে নিয়ে বানরের পিঠা ভাগ করে খাওয়ার মত একটি সার্ভিলেন্স টিম গঠন করেছে বিআইএরও অনেকের মতামত না নিয়ে।
মুলত: খাত সংশ্লিষ্ট বোদ্ধাদের মতে বীমা খাতকে শিয়ালের মুখ থেকে বাঘের মুখে দিতে না চাইলে এক কথায় বীমা খাতকে ব্যবসা বান্ধব এবং জিডিপির অংশীদার হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে একের পর এক আইন করা বা বারবার আইন সংশোধন না করে লিগেল সমর্থিত আইন পরিপালন(ইপ্লিমেন্ট) করাটাই জরুরী, যাতে করে মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে। কারন, দূরদর্শী চিন্তা ভাবনা না করে বারবার আইন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন এবং বিয়োজন করলে আইনের প্রতি মানুষ শ্রদ্ধাশীল না থেকে অনীহা পোষন করে। বিশেষ করে বিআইএ এবং আইডিআরএ‘র যৌথ উদ্যোগে নেয়া নন-লাইফ বীমা কোম্পানীর ০% কমিশন প্রথা চালু রাখার মোক্ষম পদ্ধতি হিসেবে এমডি/সিইওদের কমিশন নিয়ে অনৈতিক প্রতিযেগিতার কাধা ছোড়াছোড়ি না করে নিম্ন উল্লেখিত পদ্ধতি গুলির সঠিক প্রয়োগ এবং পরিপালন করার মাধ্যমে বীমা খাতের সুফল অর্জন করা সহজ হবে বলে আশা করাটা কোন ব্যাপার বলে মনে হয় না।

১) প্রত্যেক নন-লাইফ বীমা কোম্পানী গুলোর গঠনতন্ত্রের অর্গানোগ্রাম একই রেখে এমপ্লয়ীদের সেলারি স্ট্রাকচার ১৫%এ ফিক্সড রাখতে হবে।
২) অন্য কোন উপায়ে অর্থ্যাৎ যে মালিকদের বীমা কোম্পানী ছাড়া ও অন্যকোন ইন্ডাস্ট্রি আছে তা থেকে এমপ্লয়ীদের সেলারি বা কমিশন সমন্ময় করা যাবে না।
৩) প্রত্যেক নন-লাইফ বীমা কোম্পানী গুলোর চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং সিইওদের জেন্টেলম্যান এগ্রিমেন্ট ঠিক রাখা এবং কারো ব্যবসা কেউ নিবে না।
৪) আগামী ২ বৎসর কোন ডেভেলাপমেন্ট অফিসার কোন কোম্পানী পরিবর্তন করতে পারবে না এবং প্রতি মাসের আয় ব্যয়ের হিসাব পরবর্তী মাসের ৫ তারিখের ভিতর আইডিআরএ এবং বিআইএ তে জমা দিতে হবে । এতেকরে কোম্পানীগুলোর সঠিক হিসাব বেরিয়ে আসবে।
আইডিআরএ’র যদি স্বদিচ্ছা থাকে তবে প্রতিটি বীমা কোম্পানীর জন্য ০% কমিশনসহ এক ও অভিন্ন বেতন অবকাঠামোর নজির তৈরী করে দেখানো ক্ষমতার অপব্যবহার নয় সেইসাথে এমডি/সিইওদেও সরকারী চাকুরির মত নিশ্চয়তা বিধান বা স্থায়ীপদ তৈরি করে দেখানোই মুল ব্যাপার, আর এটা করে দেখানোই প্রকৃত প্রশাসনিক যোগ্যতা ও দুরদর্শিতা, যা বীমা খাতকে সুদুর প্রসারি অবকাঠামো তৈরি এবং জিডিপিতে অবদান রাখতে সহায়তা করবে। যেহেতু একজন সিইও’র উপর নির্ভর করেই একটা কোম্পানী চলে।
আইডিআরএ’র প্রশাসনিক দক্ষতার কথা বলতে গেলে আইডিআরএ গঠনের সময়ে প্রবীণ বীমা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি “এডভাইজরী বোর্ড” গঠনের কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা পরিলক্ষিত হয় নাই। এখন এই দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশে বীমা জ্ঞানে সমৃদ্ধ বীমা পেশাজীবিদের নিয়ে অতিসত্ত্বর বীমা “এডভাইজারী বোর্ড” গঠন করা উচিত, যা বিআইএ‘র সার্ভিলেন্স টিম গঠনের চেয়েও দরকারি ছিল। তাহলে আইডিআরএ’র অনৈতিক ও আইন অমান্যকারী সিদ্ধান্ত থেকে বীমা শিল্প কিছুটা রক্ষা পাবে এবং আইডিআরএ কিছুটা হলেও নিয়মতান্ত্রিকতায় আসবে, সেই সাথে কোম্পানীগুলো সঠিকপথে চলতে পারবে বলে খাত সংশ্লিষ্ট সকলের ধারনা।
বিঃ দ্রঃ : নন-লাইফ বীমা কোম্পানী গুলোর ভিতরে ভিতরে গোপনে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রায় ২০/২১টি কোম্পানীর নাম এবং কমিশন প্রতিযোগিতার তথ্য অর্থনীতির ৩০ দিন এবং অর্থনীতির ৩০ দিন বিডি ডটকম এর হাতে আছে। আমাদের অনুসন্ধানী টিম এ নিয়ে কাজ করছে এবং খুব সহসাই কোম্পানী গুলোর নামসহ প্রকাশ করার অপেক্ষায় আছে…
দ্বিতীয় পর্বে আসছে বিআইএ’র দেওয়া ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারীর ব্যবসায়ীক হিসাব নিয়ে কমিশন প্রতিযোগিতার মুল বিষয় …