
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
জীবনটা যেনো একটা পাগলা ঘোড়া, আলোর পথে সামনের দিকে যতক্ষণ দৌড়ে এগিয়ে চলছেতো চলছেই, কারণ সে নিজের ছায়াটাও দেখতে পারছে না। শেষ দৌড়ে একটা প্রান্তে গিয়ে তাকাতেই নিজের ছায়াটা সামনের দিকে ভ্রুকুটি করবে তখন নিজেকে ঠিক রাখাটাই মানব জীবনের তাত্ত্বিক অনুভূতির প্রয়াস বয়ে চলে। এইযে কিছুদিন আগেও রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেযেতে রাস্তার পাশে থাকা সাধারণ খাবার হোটেলগুলি থেকে বিভিন্ন রকম ছায়াছবি বা বিভিন্ন রকম প্রেম পীরিতির গান শোনা যেত। সময়ের ব্যবধানে এগুলি এখন যেনো হারিয়ে গেছে…। মানুষ এখন অনেক বেশি কর্মমুখর, তাই কেমন যেনো মনে হয়, মানব জীবন থেকে ভালোবাসা, আনন্দময়তা এবং রোমান্টিকতাও দ্রুত থেকে আরো দ্রুত গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে। রিমঝিম বৃষ্টি কেটে যাওয়ার পরেও শরতের শিশিরের উষ্ণ ভেজা হাওয়া মনের ভিতর কেমন একটা ভাবের সঞ্চার করে চলেছে। আনমনা হেঁটে চলেছিতো চলেছি, বৃষ্টি শেষে মেঘের ফাঁকে উঁকিঝুঁকি দেয়া সূর্যের সোনালী আলোয় রুদ্র ছায়ার খেলায় গাছের পাতায় জমানো বৃষ্টির পানি এখনো দু-এক ফোঁটা করে গড়িয়ে পড়ছে। সমস্যাযুক্ত জীবনে কার মনে আবার মৃদু ভালোবাসার উদ্রেক হল, জানি না, যেনো উপছে পড়া ভালোবাসা নিয়ে মধুর সুরে বাজানো হেমন্তের গানের সুর ভেসে আসলো কানে “আমি এতো যে তোমায় ভালো বেসেছি… তবু এ যেনো গো নয় কিছু নয়… কেনো আরো ভালো বেসে যেতে পারে না হৃ দ য়…।” নিরুত্তাপ মনে একটু স্লো হাঁটার গতিটায় দারুণ একটা হোচট খেল, বৃষ্টিস্নাত গাছের পাতাগুলিতে জমে থাকা পানির ফোটাগুলো সামান্য বাতাসের একটু ঝাঁকুনিতে টুপটুপ করে পড়ে ড্রেসআপ করা আনমনা পথচলাকে একটু সিটকে নিয়ে পাশের ছাউনিতে দাঁড় করাল। মনে পড়ে গেল সেই রবীন্দ্র সঙ্গিতের কথা, “পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে… পাগল আমার মন নেচে উঠে, কিন্তু নেচে উঠবে কি ভাবে ? আমি যে তখন ঘরের বাইরে বেরিয়ে ফুটপাতে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে চলমান।
ডান-বাম সামনা-পেছন না ভেবে শুধু দৌড়ানোর গতিফল সবসময় ভালো নাও হতে পারে, মানুষের জীবনটা যেন প্রতিযোগিতায় পাগলা ঘোড়ার মত না হলেও এর চেয়ে কমও নয়। পাগলা ঘোড়ার কথা মনে হওয়াতে সেই বিশ্ব বিজয়ী আলেকজান্ডার দ্যা কংকারার অব দ্যা ওয়ার্ড (আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ) এর একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। এক লোকের একবার একটি ঘোড়া কিনার ইচ্ছে হল এবং তিনি ঘোড়ায় চড়ে দেশ-বিদেশ গুরে বেড়াবেন, যেই কথা সেই কাজ ঘোড়াও কিনে নিলেন, এবং ঘোড়াটির নাম দিলেন ভুসেপুলাস, কিন্তু সমস্যা হলো, তিনি দীর্ঘদিন ভুসেপুলাসকে লালন-পলন করার পরও কোনক্রমেই ভুসেপুলাসকে পোষ মানাতে পারছেন না। ভুসেপুলাসের মালিক মনে করেছেন হয়তো ভুসেপুলাসের খাবার দাবার বা সেবা শুশ্রƒষা কম হতো তাই হয়তো ভুসেপুলাস পাগলামি করছে, তাই তিনি ভুসেপুলাসের জন্য আরো লোকজন নিয়োগ এবং আরো বেশি খাবার দাবারের ব্যবস্থা করলেন। ভুসেপুলাসও দিনদিন আরো ত্যাজি ও নাধুস নুধুস হয়ে উঠল, কিন্ত ভুসেপুলাসের পাগলামিও আরো বেড়ে গেল, ভুসেপুলাসকে কোন অবস্থাতেই থামানো যাচ্ছেনা, ভুসেপুলাস পেছন থেকে কারো ছায়া নড়াচড়া দেখামাত্র বা সামনেও কাউকে দেখামাত্র পেছনে ও পার্শ্বের সবাইকে ল্যাং মেরে ফেলে দেয়। কাউকে নিকটে ঘেঁষতে দেয় না, এমনকি নিজের ছায়াটাও তার সম্মুখ দিকে দেখামাত্র মনে করে অন্য কোন ঘোড়া নাকি তাকে আক্রমণ করতে আসছে তাই আরো বেশি লাফিয়ে চারিদিকের সবাইকে ল্যাং মেরে একাকার করে ফেলে। এমতাবস্থায় ভুসেপুলাসের মালিকতো মহা ফ্যাসাদে, প্রসঙ্গক্রমে ভুসেপুলাসের মালিক সেই বিশ্ব বিজয়ী আলেকজান্ডার দ্যা কংকারার অব দ্যা ওয়ার্ড (আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ) এর এর কথা শুনে ঈর্ষা ফিলকরে জানান দিলেন যে বিশ্ব বিজয়ী আলেকজান্ডার সেলকার্কের ক্ষমতা দেখা যাবে যদি তিনি ভুসেপুলাসকে জয় করতে বা আয়ত্তে আনতে পারেন, তাইলে (আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ) কৃতিত্ব বুঝা যাবে।

সে অনুযায়ী একদিন সকালবেলা আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট কে দাওয়াত করা হল, তিনি আসলেন এবং সবাই তার কার্যক্রম দেখার অপেক্ষায় অধির। আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট যেখানে বসলেন ঠিক তার সম্মুখপাশে এক ভদ্রলোক দাঁড়ালেন, তার সূর্যালোকের ছায়া আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট এর শরীরের উপর পড়ল, তখন আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট লোকটিকে বললেন, “You can Remove Yourself Out of the Sunshine Do not take from me, What you can not Give.” অর্থ্যাৎ, তুমি তোমার নিজেকে আমার (সূর্যালোক) থেকে সরিয়ে নাও, যা তুমি আমাকে দিতে পারনা তা তুমি আমার থেকে নিও না। বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলে তিনি সবাইকে পরাজিত করলেন। এরপর বিশ্ব বিজয়ী জানতে চাইলেন তাকে দাওয়াতের কারণ, ভুসেপুলাসের মালিক থেকে তিনি সবকিছু জানতে পেরে অদূরে ভুসেপুলাসের অবস্থান দেখে আস্তেআস্তে ভুসেপুলাসের দিকে এগিয়ে গেলেন ও খুব আয়েসি ভাবে ভুসেপুলাসের মাথায় হাত বুলিয়ে ভুসেপুলাসের লাগাম ধরে সূর্য়ের দিকে ফিরিয়ে বেঁধে দিলেন, তখন সম্মুখ সূর্যালোকে ভুসেপুলাসের নিজে ছায়া পেছনে চলে গেল এবং আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ভুসেপুলাসের পিঠে চড়ে বহুদূর ঘুরে আসলেন এবং সূর্যের দিকে মুখকরে বেঁধে দিলেন। সেথেকে ঘোড়ার লাগামে চোখের পেছন অংশে চামড়ার একটা বেষ্টনি দেওয়ার প্রচলন হয়, ঘোড়া যাতেকরে সম্মুখ দিক ব্যতিত তার পেছনের দিকের কোন কিছু দেখতে না পারে এবং ভীত না হয়।
আমার অতটুকু বর্ণনায় লেখার অর্থটা হলো, আল্ কোরানের ভাষায় আমরা আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টির অন্যান্য সকল কিছুকে বাদ দিয়ে হলেও মানুষ মানুষের মূল্যায়নের দিকটাও কখনো কি একবারও ভেবে দেখেছি? সেটা আত্মীয়তার সম্পর্ক হোক, হোক ভাই বোনের বা ছেলেমেয়েসহ পারিবারিক সম্পর্ক এমন কি হোক সেটা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কতো আরো স্পর্শ কাতর, যে সম্পর্কে অনেক সময় কোন বাঁধ মানে না। কিন্তু আমরা মানুষ শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থটাই বেশি দেখি এবং দেখতে চেষ্টা করি, কেউ কাউকে অনুভব করি না। পরিবার নিয়ে লিখতে গেলে বা লিখতে চিন্তা করলে মনেহয় যেনো সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যায়, কি লিখব বুঝতে পারি না শুধু একটু চেষ্টা করা নিজের ইচ্ছেমতে।
একটা প্রবাদ আছে, “খেলতে খেলতে খেলোয়াড় আর লিখতে লিখতে লেখক।” ইচ্ছে হল পরিবার নিয়ে লিখব, কিন্তু কি লিখব, লিখতে বসলেই যেমন মাথায় কোন কাজ করেনা। সব উলট পালট লাগে… সব কিছু থাকার পরেও ভীষণ একা লাগে মাঝে মাঝেই, নিজেকে কেন আপন করে নিতে পারি না। একইসাথে থেকেও যেনো চাহিদা ব্যতীত দুরত্বই বেশি… কিন্তু কেন? বেশির ভাগ সময়ই আমরা শারীরিক চাহিদা ছাড়া কখনো একজন অন্যজনকে জড়িয়ে ধরি না, ধরতে চেষ্টা করিনা। খোড়া যুক্তি দেখাই, এত বেশি ভালোবাসা ভালো না, কিন্তু কেনো, আমরা কি নিজেরা ভালোবাসা দিয়ে নিজেদেরকে আলিঙ্গনে রাখতে পারি না? পরিবারের এই লোকটিতো তার ২০/২৫ বা ৩০ বছরের লালিত স্বপ্নকে বিচ্ছিন্ন করে এককভাবে নতুনত্বের অবস্থানে সারা জীবনের জন্য চলে এসেছে। আমরা এরও মূল্যায়ন করতে পারি না। আসলেই কি আমরা হৃদয়হীন রুষ্ট কোন মানুষ? ভবালোবাসা কি আমাদের হৃদয় থেকে মরে গেছে, নয়তো ভাবি পাছে লোকে কিছু বলে। এক সাথে একই বিছানায় ঘুমালে, একই টেবিলে খাবার খেলে, একই রিক্সায় যাতায়াত করলে অথবা লোক সমাজকে দেখানো হিসেবে কোন অনুষ্ঠানে গেলেই কিন্তু মানুষটার কাছে যাওয়া যায় না। দেখাযায় একটা রুমে একই ছাদের নিচে বছরের পর বছর একই খাটে ঘুমালেও প্রয়োজনের সময়টুকু ছাড়া কি একটা মানুষের আপন হওয়া যায় না। এভাবে আপন হওয়া বা কৃত্রিম সুখ পরিহার করে নিজেদের সুখ উপলব্ধি করা বা আভিধানিক সুখ উপভোগ করাটা সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যপার নয় কি? যা কেউ কাউকে দিতে পারে না। এরই মাঝেও আবার কখনো কখনো জীবনে কেউ আসে কেউ চলেও যায়। আসলে একথাটা বললে অত্তক্তি হয় না যে, আমরা মানুষ, সেকি শুধু ভুল, তবে ভেঙ্গেচুরে দাও, ধুয়ে মুছে দাও মানুষ তো নয় যেনো নাচের পুতুল, এই পৃথিবী আমার।

হঠাৎ হঠাৎ মাথায় কোন কোন একটা বিষয়ের উদ্রেক হয়, এ বিষয়ের উপরই একটু লিখতে চেষ্টা করি, বিষম চিন্তা কবিতার মত, মাথায় কত প্রশ্ন আসে দিচ্ছেনা কেউ জবাব তার, সবাই বলে মিথ্যে বাজে বকিসনে আর খবরদার। এমন ধারা ধমক দিলে কেমন করে শিখব সব, সবাই বলবে মূর্খ বাজে বলবে আমায় গো-গর্ধব। আসলে আমি এবং আমরা (সবাইকে নয়) একটা গো-গর্ধবই বটে। আমরা যারা বহু বছরধরে সংসার করার পরও সংসারের মানে বুঝে উঠতে পারেনি! আমাদের এই সংসার জীবনটাকে পরিবার, সমাজ এমনকি আত্মীয়-স্বজনরাও একসময় ধরে নেয়, একই খাটে বা বালিশে ঘুমানো, একই টেবিলে খাওয়া, একই রুমে থাকা এবং একইসাথে রিক্সা গাড়িতে ঘুরে বেড়ানো এবং ইচ্ছা অনুযায়ী মাঝে মাঝে দৈহিক মিলনে অংশগ্রহণ করাটাই সংসার, ব্যপারটা কি আসলে তাই? প্রকৃতভাবে আমরাতো তৈরি করা কোন যন্ত্র বা রোবট নই, যার কোন আবেগ অনুভূতি আদর সোহাগ বা মানবিক মূল্যবোধ থাকতে পারে না। না কি থাকতে পারে না কোন রোমান্টিক ভাবের আদান প্রদান। সংসার জীবনের ঘানি টানতে টানতে সংসারের কর্তা ব্যক্তিটা এমনই হয়ে যাই যেনো সারাটাদিন তাকে গাধার মত খাটবে বা খাটতে হবে শুধু পরিবার বা সংসারের ভরণ পোষণের জন্য, একমাত্র এটাই তার কাজ, এবং আমরা বরাবর এটাই করে আসতেছি। জীবন ধারায় নিজেদের তৈরি করা এই রীতিনীতি অনুযায়ী সংসার করতে করতে একসময় এটাকেই মানুষ ধরে নেয় তাহলে, কিছু সংসার কখনো কখনো টিকে না থাকারও কারণ হয় কেন? তারাও তো একই বিছানায় ঘুমায়! একই টেবিলে খাবার খায়! একজন অন্যজনকে দৈহিক মেলামেশার মাধ্যমে কো-অপারেট করে! কিন্তু…তবুও, সংসারগুলোর মাঝে দূরত্ব তৈরি হতে হতে বেশিরভাগ সময় বেশিরভাগ সংসারই ঠুনকো কারণ বা সামান্য ভুল বুঝাবুঝির কারণে ভেঙে যায়, অশিক্ষিত পরিবার গুলোর চেয়ে শিক্ষিত পরিবার বা সংসার গুলিতে বিচ্ছেদ বা ভাঙার প্রবণতা একটু বেশি পরিলক্ষিত হয়, আর মধ্যবিত্ত সংসারগুলিতে এমন অবস্থা তৈরি হলেও আত্মসম্মান ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান রেখে দূরত্বের মধ্যেই কোন রকমে সমতা বজায় রেখে জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত কাটিয়ে যেতে চেষ্টা করে। আমার দৃষ্টিতে আমি এমন অনেক সংসার বা পরিবার দেখি এবং চিনি। এ লেখাটা যেন এসব পরিবার গুলোর বাস্তব জীবনের একটা অংশ এবং এসবকিছু তাদের জানা এবং বুঝার অংশ মাত্র, আবার বলারই বা কি আছে।
মানুষের ভিতর বা মানুষে মানুষে যখন দূরত্ব তৈরি হয় তখন নিকটতম মানুষটি কাছে থাকুক,পাশে থাকুক এমনকি চোখের সামনে থাকলেও উভয়ের মাঝে তবুও একটা স্নায়ুবিক দূরত্ব থেকেই যায়। আর এই স্নায়ুবিক দূরত্ব বেশ অন্যরকম! বলা যায় না! বুঝানো যায় না! সহ্যও করা যায় না! কখনো কখনো কারোর বুকের উপর মাথা রেখে শুয়ে থেকেও মাঝে মাঝে নিজেকে কতটা যে একা একা লাগে তা বলে বুঝানো যায় না!
মনেহয় যেন কথাগুলি বার বার মনে আসে এবং বার বার বলি, আরো মনে হয় কথাগুলি একমাত্র আমি ব্যতীত প্রত্যেকটা মানুষের মনের কথা, আমি সবার কথাগুলো শুধুশুধুই মানুষের মনের আয়নাতে তুলে ধরেছি মাত্র। আবহাওয়াগত ও আমাদের মনোগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দাম্পত্য জীবনে আমি ও আমরা আসলে কি চাই? আবার কোনটাই বা না চাই, সবটাই চাই, বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সবাই যা যা করে! আমি কারো বিরক্তির অতিরিক্ত কি কি আছে সেটাও চাই, দেনা পাওনার শেষ কোথায়, শেষ আরো কি আছে তার জন্য ফোর্স করি, যেটা অনেকেই করে না! আমাদের একটা কনসেপ্ট, সংসার মানে আসলে কেমন একটা আদিম ধর্মীয় ধারাবাহিকতায় চলার বা চালানোর অভ্যাস, এই কনসেপ্টটা থেকে আমরা কেন জানি বেরিয়ে আসতে পারি না। ক্রমবর্ধমান আধুনিকতার যুগেও আমি বা আমরা সেই ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির ধারায় মিলে যাই, অভ্যাসতো অবশ্যই, যেমন আমরা কথায় কথায় বলি, মানুষ অভ্যাসের দাস। কেন আমরা অভ্যাসকে মানুষের দাস বানাতে পারিনা বা দাসত্বের মানুষকে পরিবর্তন করতে পারিনা করিনা। তবুও সবই কি অভ্যাস? নতুন কিছুই কি আমাদের থাকে না থাকতে পারে না? অভ্যাসতো সূর্য উঠা বা সূর্য ডুবার মত চিরসত্য কিছু নয়।
হ্যাঁ, আমরা নতুন কিছু করতে পারি, সবার ভিতরেই নতুনত্বের কিছু অনুভুতি যে জাগেনা তা নয়। কিন্তু দীর্ঘ দিনের লালিত অভ্যাস পরিবর্তন করে একটু ভিন্ন অনুভুতির ছোঁয়া দিতে গেলেই উল্টো আবার কোন ঝামটি শুনতে হয় কি না? শুনতে হয় কিনা এত বছর পর আবার যে তোমার ভালোবাসা উথলে উঠলো কেন, নাকি বুড়ো বয়সে আবার ভীমরতি ধরল? ছোট বড় ছেলে মেয়ে আশেপাশে থাকলেতো আরো উপস্থিতভাবে অপ্রস্তুত হয়ে যেতে হয়। কারণ আমরা এবং আমাদের সংসার, পরিবার, সমাজসহ সবগুলো মানুষ লজ্জা, সঙ্কোচ এবং ব্যবধান কাটিয়ে এখনো সমালোচনার উর্ধ্বে উঠে আসতে পারি নাই। কবি কামিনী রায়ের কবিতা, করিতে পারি না কাজ, সদা ভয় সদা লাজ, সংসয়ে সংকল্প সদা টলে, পাছে লোকে কিছু বলে…। আমরা পাছে লোকে কিছু বলে সংকল্পে না থেকে পাশের লোকে কিছু বলে এই সংকল্পেই লজ্জিত হয়ে নিজেদের আড়াল করে রাখি। অথচ আমরা একই ছাদের নিচে থেকেও কখনো একসাথে খোলা আকাশটাকে দেখি না, দেখার চেষ্টা করি না, কখনো নদীর পাড়ে বসে বসে দুজনে একসাথে কফির মগ হাতে নিয়ে নির্ভরতার কাঁধে মাথা রেখে আঙ্গুলের স্পর্শে সুড়সুড়ি দিয়ে তৃপ্তি অনুভব করি না, এর বাইরেও আরো কত কি যে আছে, আমরা তা উপভোগের চেষ্টা করি না। আমরা কখনো জিজ্ঞেস করিনা ” তুমি কেমন আছো? তোমার মন খারাপ কেন?” আমরা হাত ধরে বসে থাকি না! আমরা দৈহিক আকর্ষণ ছাড়া একজন অন্যজনকে জড়িয়ে ধরি না…। আমরা বুঝি না, আমারা পুরো সময় সাথে কাটানোর পরও কেউ কাউকে সময় দেওয়া প্রয়োজন বোধ করি না। উভয়ে শরীরের দিক থেকে কাছে আসি হররোজ, কিন্তু মনের দূরত্ব যেন হাজার মাইল সমান্তরালে চলে যুগের পর যুগ অর্থ্যাৎ আজীবন। দৈহিক উপভোগের জন্যেতো যেমন রাতের রানীই যথেষ্ট, ঠিক তেমনি রান্নার জন্যও কাজের বুয়াই পারফ্যাক্ট, যদি অন্য দৃষ্টিতে তাদের ব্যবহার না করে থাকি, আসলে অনেক কিছুই যেন চোখের সামনে চলমান, যার বর্ণনা যুগ যুগ ধরেও শেষ করা যাবে না। এতকিছুর পরেও দিনের শেষে আমি, আমরা একা, একান্তই প্রত্যেকে একা এবং একা…। কখনো নিঃশ্বাস ফেলতেও একাকিত্ব অনুভব করি। আবার এটাও ফেলে দেওয়া যায় না যে আমাদের ধর্মীয় অবস্থা এবং ইসলামিক পর্দানুশীলতাও আমাকে আমাদেরকে অনেকটা আবদ্ধ করে রেখেছে।
পুরো সময়তো গেলো আমার কথা, কিন্তু নারীদের বেলায়? নারীরা কখনোকি স্বীকার করে যে, বাস্তবতায় নারীরাও পরিবারের প্রতিটি পুরুষদেরকে অধিক দহনে দাহ করে রাখে। যা সংসার, পরিবার থেকে সমাজের সর্বস্তরে পর্যন্ত পুরুষদের চাপা আর্তনাদে বেরিয়ে আসে। তবে অভ্যন্তরীণভাবে নারীদের দ্বারা পুরুষদের দাসত্বাবস্থার উষ্ণ অশ্রু, যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে এই নির্মমতা কখনো দেখা যায় না। প্রতিটি মানুষের জন্যই আমার লিখাটি অন্তত একবার হলেও পড়া আবশ্যক বলব না কিন্তু পড়লে অন্তত উপকৃত হবেন বলে আশা করি…।‘দ্য ম্যানিপুলেটেড ম্যান’ বইটির লেখক জার্মানির এসথার ভিলার্স, যে কোন না কোন লোককে তার বইটি পড়তে হবে বলেছেন, লেখক তার বইটিতে নারীরা কিবাবে তাদের ইচ্ছাশক্তি এবং নিবৃত ফ্যাসিষ্ট সাইকোলজিতে একজন পুরুষকে তাদের শৃংখলে কারাবদ্ধকরে রাখে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। এই বইটি মহিলাদের কাছ থেকে ক্ষোভ এবং শত্রুতামূলক সমালোচনার কারণ হয়েছে, এটি ব্যাখ্যা করে যে, কীভাবে নারীরা আদিকাল থেকে পুরুষদেরকে চালিত করেছে এবং তাদের দাসে পরিণত করেছে, তারা নির্যাতিত হওয়ার ভান করেছে। যদিও প্রকৃত অর্থে তারা নিজেরাই নিপীড়ক। তিনি ব্যখ্যা করেছেন যে কীভাবে একজন মহিলা একজন পুরুষকে দক্ষতার সাথে কোর্টশিপ এবং অবশেষে বিবাহের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিচালনা করে, তাই বলা হয় “একজন পুরুষ একজন মহিলাকে তাড়া করে যতক্ষণ না সে তাকে ধরে ফেলে”।

তাঁর বইটিতে তিনি আরো ব্যাখ্যা করেছেন যে কীভাবে পুরুষটি সারাজীবন মহিলা এবং তার সন্তানদের যতœ নেয়ার জন্য প্রতারিত হয়। সে পাথরটিকে (একজন পুরূষকে নির্বোধ পাথরের সাথে তুলনা করানো) সিসিফাসের মতো ঘূর্ণায়মান করে এবং ফলস্বরূপ কয়েক মিনিটের যৌন আনন্দের বা দৈহিক মিলনের দ্বারা পুরস্কৃত হয়। আমরা এসথার ভিলার্সকে পর্যবেক্ষণ করে দাবি করতে পারি যে একজন পুরুষ তার ইচ্ছার দাস এবং মহিলাটি হাজার হাজার বছর ধরে লাঠি এবং গাজরের মতো ব্যবহার করেছে এবং ব্যবহার করেছে যেন সর্বদাই মানুষটিকে ভ্যানিটি তাড়াতে এবং তার সেবা করার জন্য তার জীবনকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে বাধ্য হওয়া। তিনি নারীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্যাখ্যা করতে এগিয়ে যান, নিবিড় প্রভাবে কীভাবে প্রতিটি নারী নিজের জন্য একজন পুরুষের মালিক হওয়ার শক্তিশালী তাগিদ এবং প্রয়োজন অনুভব করেন।
আমি লেখক কি না জানি না, তবুও এখানে এ লিখাটিতে আমরা মানুষ হিসেবে আমার এবং অন্য দেশের একজন লেখকের প্রাত্যহিক অনুভুতির তুলনামূলক যে উপস্থাপন তুলে ধরা হল তার অনুধাবন প্রত্যেটি মানুষেরই করা উচিত বলে মনে করি।
এত কিছুর পরেও বলে বুঝাতে পারবো না যে, দিনশেষে আমার একটা আশ্রয় প্রয়োজন হয়, কাছের একজন মানুষ প্রয়োজন হয়, একটা ব্যক্তিগত নির্ভরশীলতার জায়গা প্রয়োজন আছে বলে খুঁজি, সমঝোতার হিসাব চাই, চাই নিবৃত মননে কারো কন্ঠস্বরে এবং কোমল হাতের স্পর্শের, বুঝতে পারি আমার জন্য একটু গভীর ভালোবাসা প্রয়োজন যার মধ্যে একটা পবিত্র স্পর্শ লুকানো থাকা অনেক কিছু খুঁজে পাওয়া যায়। এটা আমার একার শুধু নয়, প্রাত্যহিক জীবনে প্রত্যেকটা মানুষের এরচেয়ে বেশি কিই বা থাকতে পারে?
একটা মানুষের স্পর্শে একটা মানুষ অনেক কিছুর উর্ধ্বে চলে যেতে পারে, অনেক মূল্যবোধের জন্ম দিতে পারে, একটা প্রকৃত এবং পবিত্র ভালোবাসার জন্ম দিতে পারে, এই স্পর্শটা কামনার স্পর্শ নয়! এটা একটা স্বার্থহীন ভালোবাসার স্পর্শ, কাম ছাড়া ভালোবাসা পূর্ণতা পায়না কারো কারো মতে এটা যেমন ঠিক! তবে কাম ও যে সবসময় ভালোবাসার জন্ম দিতে পারে না, এটাও মিথ্যে নয়…।
সংসারকে অভ্যাস বা গতানুগতিক ধারা বলে চালিয়ে দেওয়া মানুষরা আসলে ভালোবাসার দায়বদ্ধতাকে এড়িয়ে যেতে চায় একঘেয়েমিতার মত করে, এটা বুঝতে না পারার বাকি থাকেনা যে, যখন কোন দাম্পত্যে প্রেম-ভালবাসা থাকে না, সেখানে অভিনয় করে দায়সারা বেঁেচ থাকতে হয়। আমাদের সংসারে, পরিবারে ও সমাজে এমন অনেক আমি (দম্পতি) আছে, যারা শুধু অভিনয় করেই পুরো জীবন একটা পছন্দ-অপছন্দের মানুষের সাথে একই ছাদের নিচে কাটিয়ে যাই শুধু পাছে লোকে কিছু বলার সঙ্কোচকে লোক দেখানো এড়িয়ে যাবার জন্য।
তারতম্যের উদ্ধৃতি দেওয়া এসথার ভিলার্সের লেখার ভারসাম্য করে বলতে গেলে একজন পুরুষ সারাদিন কাজ করে ঘরে ফিরে স্ত্রীকে সময় দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করা স্বামীও নিয়ম অনুযায়ী দৈহিক আনন্দটা ঠিকই উপভোগ করে করে যান। জানি, জীবনযাত্রার ব্যয় সঙ্কুলানের কারণে পুরুষ মানুষটাকে অনেক ক্লান্ত এবং ব্যস্ত থাকতে হয়। তবুও ব্যস্ততা আসলে একটা অজুহাত মাত্র, যতই ব্যস্ততা থাকুকনা কেন মানুষ চাইলেই একটু সময় বের করে নিজেদের মধ্যে একটু আনন্দঘন সময় কাটানো যায়। মানসিক সঙ্কির্ণতার কারণে আমরা সেই হাসিখুশি মনোভাব টিকিয়ে রাখতে ভুলে যাই নাহয় আমরা হয়তো চাই ই না। এদিকে আবার দায়িত্ববোধ দেখিয়ে সস্তা দায়িত্ববোধের অন্তরালে যাকে নিয়ে পূর্ণ জীবন কাটাতে হবে, যার জন্য সারাদিন পরিশ্রমের অভিনয়টাও করে যাই, আবার তাকে ভালো রাখার চেষ্টাও কম করি না। কখনো মাঝে মাঝে বুঝি না বা বুঝতে চাই না যে, সে ভালো নেই।
আমি ও আমরা যেহেতু রক্ত মাংসে গড়া এবং বিবেক ও মন মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ, সে হিসেবে সুবিধা অসুবিধা ভালো খারাপ, মেজাজ মর্জি নিয়ে দাম্পত্য জীবনে কলহ থাকে এবং থাকতেই পারে। কারো কারো এটাকে আবার তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করার ক্ষমতা ও ধৈর্য সবসময় থাকে না, দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া ফ্যাসাদ না করাই অতি উত্তম, এর পরেও ঝগড়া ফ্যাসাদ বা কথা কাটাকাটি হলে পরে কান্না কাটি না করে, মান-অভিমান ভুলে নিজেকে বড়/ছোট মনে না করে নিজের মানুষটাকে পেছন থেকে একটু জড়িয়ে ধরে বসে থাকলে তেমনতো কোন অসুবিধা হয় না। বরং ভালোবাসার মানুষটার নিকট মানবিক মূল্যায়নও বেড়ে যায়, কারণ মায়া মমতার কাছে সব মানুষই একটু দুর্বল থাকে। কেহ কেহ যদি একটু নিষ্ঠুরও হয়, তখন জীবনসঙ্গী মানুষটার এরকম ভালোবাসাকে কখনো অবহেলা করতে পারে না বরং দাম্পত্য সম্পর্কটা বেশি গুণিভূত হয়।
সময়ের ব্যবধানে প্রত্যেকটি মানুষই এখন বেশ সচেতন। শুধু দুবেলা দু-মুঠো খাবারের জন্য বা দৈহিক চাহিদা মেটাবার অভ্যাসের জন্যই সংসার নয়। সেই আদিমতা বাদ দিয়ে বিবেকবোধ, শিক্ষা, সহনশীলতা, প্রেম ভালবাসা, গুরুত্ব, শ্রদ্ধাবোধ সর্বোপরি মানবিক মুল্যায়নকে প্রয়োজনে নিয়ে মনের সঙ্কির্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে একটা সুন্দর দাম্পত্য সুখের পরিবার উপহার হিসেবে পেতে পারি। যেহেতু আল্ কোরানের ভাষায়, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, তাই কবির ভাষায় বলতে হয়….
“প্রীতি প্রেমের পূর্ণ বাঁধনে যবে মিলে পরস্পরে
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখনই আমাদেরই কুড়ে ঘরে…।”
লেখক : প্রতিবাদি কবি, সব্যসাচী লেখক, কথা সাহিত্যিক ও সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন।












