

খোন্দকার জিল্লুর রহমানঃ
ঋতুরাজ বসন্তের ভাবাদর্শে পুরুনো সবকিছুকে ঝেড়ে ফেলে রোমান্টিক হাওয়ায় মাতানো জীবন ধারাকে চঞ্চলা ও আনমনা করে তুলেছে সৃষ্টিসেরা মানুষ থেকে জীব বৈচিত্র পর্যন্ত। বৃক্ষরাজি যেনো নতুনত্বের আলিঙ্গনে পুরুনো সব পাতা গুল্মকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সবুজের আলপনায় নিজেদেরকে সাজিয়ে তোলার আকাঙ্খায় নিত্য নতুন সাজে সাজিয়ে স্বাগত জানাতে আলিঙ্গনের অপেক্ষায় অধির আগ্রহে অপেক্ষমান। গাছে গাছে সিমুল, পলাস আর কৃষ্ণচুড়ার লাল গালিচায় সজ্জিত রাজপথ যেন রজনীগন্ধার মৌমৌ গন্দে জীবনের প্রান চাঞ্চল্যতার পাগলকরা অনুভুতিতে আলতোভাবে স্পর্শের টোকা দিয়ে জানান দিয়ে যায়, কে আছো তপ্ত ললাটে অধির আগ্রহে দাঁড়িয়ে দুয়ারে বরন করিতে তোমারে…।
ভোরের তন্দ্রা বিধুর ভাবটা গত প্রায় আট বছরেও তোমার অবয়ব থেকে একটিবারের জন্য হলেও কাটায়ে উঠাতে পারিনি, আহত পাখীর মত চটপটানো হৃদয়ে অদম্য কষ্টকে নিবৃত করে প্রতিটি ভোরের ঠান্ডা সোনালী রোদ্রের এক চিলতে রশ্মি জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে এগিয়ে এসে তোমার কপাল, চোখ এবং নাক পেরিয়ে ঠোটের উপরি ভাগে ঘাসের মাথার মত মেঘকালো পশমগুলিতে সোনালী শিশির বিন্দু হয়ে জমে থাকা ঘাম থেকে আলোক বিচ্ছুরন হয়, তখন মনে হয় পৃথিবীর সমস্থ সৌন্দর্য্য একাকার হয়ে আমার মন থেকে চোখের মাঝে ধরা দেয়। মাতালকরা সৃষ্ঠির এই অপরুপ সৌন্দর্য্যরে কারুকার্য খচিত অবয়বে নিজের চোখ দুটো বন্ধকরে একবারও যদি কপাল, চোখ এবং ঠোটে ঠোট স্পর্শ করতে না পারি ঠিক মনে হয় যেন স্রষ্টার মহত সৃষ্টির এক অনন্য স্বার্থকতা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার পুরুপুরি কষ্ট নিয়েই আমাকে পুরুদিনটি অতিবাহিত করতে হতো। তোমার দৃষ্টিনন্দন চোখ দুটি আজও নিরবে নিবৃত্বে কেন যে আমাকে তালা বিহীন শিকলে বন্দি করে রেখেছে…।
আমি জানি হয়তো তুমি এখনো ঘুমোচ্ছ। এই জানা অজানাতেও তোমার সুতিক্ষè অনুভুতি কখনোই আমার স্পর্শকে এড়ায় না। চোখ খুলে যখনই আমার স্পর্শ অনুভবে পাবে তখন নিশ্চয়ই খুব অবাক হবে তাইনা? আমার দৃষ্টিতে দৃষ্টি পড়তে পড়তে তোমার সদ্য ঘুম ভাঙা আধো আধো ঘুমঘুম খোলা চোখ ছানাবড়া করে উৎফুল্য হয়ে উঠবে, তোমার ঠোঁটের কোণায় মৃদুভাবে ফুঠে উঠা হাসির রেখা আমার সারাদিনের কর্মচঞ্চলতাকে আরো শতগুন অধিকভাবে অনুপ্রানিত করে ফুটিয়ে তুলবে। আমার তৃষ্ণার্ত মন তখন জানলার কাছে বসে তোমার সূর্যের প্রথম সোনালী রশ্মীর মতো নরম মুখখানা দেখেদেখে কল্পনার রাজ্যে অবগাহন করে নিজের মনের ক্লান্তি সারিয়ে তুলবো। মনটাকে কেনো বুঝাতে পারিনা যে, ভোরের এই সোনালী সূর্যরশ্মিটা কেনো প্রতিদিন একই সময়ে এই বেহায়া মনটাকে প্রতিনিয়ত একটা নিয়মের মধ্যে বেঁধে দিয়েছে কোন শাসন বারন ছাড়াই।

চাঞ্চল্যকর একটা রোমান্টিক সকাল যেনো প্রতিদিনই আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। একটা নরম পালকের স্পর্শ যেন দুজনের মুখে একটা মধুর সুড়সুড়ি দিয়ে বলে যায়, এ কি, তোমার স্বপ্নালোকের মায়াবি সময়টুকু বয়ে চলে যায়, আলোজলমলে মুখে দুজন কি আমাদের সাথে স্নেহাস্পদ আলিঙ্গন জানাবে না? লগ্ন যে বয়ে যায়। আজকের ভোর বেলাটা কেমন যেন একটা স্বপ্নরঙ্গিন আলোকচ্ছটা নিয়ে সাদর সম্ভাসন জানানোর জন্য শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে দুজনের শয্যায় নানারকম বাসন্তি ফুলের মেশানো পাপড়ি ছিটিয়ে আমাদের স্বাগত জানানোর অপেক্ষায়। হালকা হিম বাতাসে ভোরের পাখীর ডাকে সাড়াদিয়ে অন্ধকারের রেশ কাটিয়ে সুন্দর আলো ঝলমলে সকালের একটা কাঁচামিঠে স্বচ্ছ রোদ আমাদের ঘরে ধেয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে আমাদেরকে আলোকিত করে, অথচ কি সৃষ্টি সুখের উল্যাসটাইনা মিস করতে যাচ্ছিলাম, না কোন মিস করা নয়, আজ আমাদের আলোতেই আমরা আলোকিত, যে আলোর কোন বিকল্প হতে পারে না।
আমি পাখী বিষারদ নই, তবুও অনেক সময় পাখীদের ডাক বা পাখীদের কলকাকলি এমনকি জোড়া পাখীর অন্তরঙ্গতা সামান্যই বুঝতে পারি। আমার বাসার কার্ণিসের ওপর একজোড়া শালিক পাখি প্রায় প্রতিদিনই বেশকিছু সময় ধরে বসে বসে ওদের নিজের ভাষায় কত কী যে বলে চলে, অনেক সময় ধরে অপলক দৃষ্টিতে আমি তা অনুভব করতে চেষ্টা করি। ভোরের ঐ হালকা হিমবাহ সমিরনে প্রিয়তমার অবয়বের দিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে একইসাথে আমি শুয়ে শুয়ে শালিক জুগলের ভাষা খানিকটা বোঝার চেষ্টা করলাম ওদের কথোপকথন। কেন যেন মনে হলো “হতাম যদি পাখীর মতন”। পরক্ষনেই হঠাৎ মনে হলো আমার অত্যধিক প্রিয় জুঘল কন্ঠের একটি গানের দুটি স্তবক, “ময়ুরকন্ঠি রাতের ঐ নীলে… আকাশে তারাদের ঐ মিছিলে, তুমি আমি আজ চলো চলো যাই, শুধু দু-জনে মিলে…।” ভাবনায় মানুষ কত কিছুইনা কল্পনা করতে পারে, নিজের মধ্যে এমন আবোল তাবোল মনে আসে। আসলে আমার মত কর্মহীন পাগল টাইপের মত লোকের উদ্ভ্রান্ত মনে কতকিছুই ভাবতে থাকি। দেখতে দেখতে পরক্ষনে আবার মনে হলো, ওই পাখীজুগল যদি আমরা হতাম তাহলে তো সীমাহীন এই বিশাল নীল আকাশে বাধাহীন ভাবে সাগর নদী এমনকি সুদূর দেশ বিদেশে পাড়ি দিতাম। তারপর খানিক জিরিয়ে নিয়ে ডানা ঝাপ্টে সাগরজলে স্নান করতাম দুজনে কোনো এক নাম না জানা তটের শীতলতম স্থানে। আচ্ছা, আমার মত পাগল নাহলে কি কেউ এমন চিন্তা করে যে, পাখীরা কি আমাদের মত ভাবে, বা আমরা মানুষেরাকি পাখীদের মত ভাবি? কখনো কখনো মনে ভীষন ভীষন প্রশ্ন জাগে, আমি যদি পাখীদের অরণ্যতে বাস করতাম, বা পাখী নিয়ে গবেষনা করতাম, তখন কি আজকের হৃদ-রূপি প্রিয়তমা এই মানুষটি আমার পাশে থাকত?? অসলে একটা প্রবাদ আছে না, “পাগলের সুখ মনে মনে!!” ইশ: আমি কী যে সব পাগলের মতো কথা বলি মাঝে মাঝে!!! সত্যি সত্যিই অনেক সময় ইচ্ছে হয়, সৃষ্টিকর্তা যদি আমাদের অনেক কিছুর মত রূপ ধরার এবং এতসব উপলব্দি করার অলৌকিক কিছু ক্ষমতা দিতেন, তাহলে আমরা দুজনকে কখনো পাখি, কখনো সমুদ্রের গভীরের রঙিন মাছ হয়েও দেখতে চেষ্টা করতাম। অনেক সময় এমনও চিন্তাআসে, সাধারন মানুষ কেন যে প্রকাশ্যে আমাকে উন্মাদ বা বদ্ধপাগল বলে ডাকে না, এটাই আমার সৌভাগ্য। এসব চিন্তা আর কল্পনার জগতে ভাসতে ভাসতে হঠাৎ শালিক জোড়া উড়ে যেতেই নিজেকে ফিরে পেলাম। অনেকতো ভিন্ন জগতের কিছু হলাম, মন থেকে সব কিছু ঝেড়েফেলে এবার মানুষ হলাম, মানুষ হলে কেবলই সবসময় লুকিয়ে রাখতে হয় নিজের সবকিছু, কারন মানুষের আভিধানিক অর্থটা বিশাল পরিমাপের। রাগ, অভিমান লুকোতে হয়, প্রেম-ভালোবাসা লুকোতে হয়, লজ্জা-চোখের জল লুকোতে হয়, আবেগ-অনুভূতি লুকোতে হয়, দুরের মানুষতো আছেই সেইসাথে নিকটস্থ স্বজনদের মান-অপমানসহ অনেক কিছু বুঝেশুনেও নিজেকে লুকিয়ে যেতে হয়। শুধুমাত্র মানুষছাড়া এমন সবকিছু এমন করে আর কি কেউ লুকোতে পারে বা জানে সবকিছু তা আমার জানা নেই।

আসলে মাঝে মাঝে আমার ভীষন ইচ্ছে হয়, অন্তত একবার হলেও তোমার চোখে আমাকে দেখতে, হয়তো এটা ইহকাল বা পরকাল, কোন কালেই সম্ভব নয়। এরই মাঝে বেশ কিছু সময় পার হতেই আরো একটু সূর্যের স্বচ্ছ আলো জানালার পর্দা অতিক্রম করে মনের জানালা ডিঙ্গিয়ে প্রিয়তমার ঘুম ভাঙ্গানোর বার্তা জাগিয়ে তোলার মুহর্তে শালিক জুগল কি যেন শব্দ করে বিদায় নিতেই তোমার স্থির অবয়বের দিকে তাকিয়ে আমার কল্পনায় মনে হলো, “আধখানা চাঁদ ওই আকাশে, বাকি আধখানা চাঁদ মোর পাশে…।” মাঝে মাঝে আমারও ইচ্ছে হয়, তোমার মনের জানালার পর্দাটাকে সরিয়ে আমার করে নিতে। আর তুমি অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে থাকবে। আসলে আমি হয়তো নিজের অজান্তেই তোমার সকল সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠতে চাই। কিন্তু তোমার চোখে আমি কেবল আমাকে খুঁজি। তোমার সমস্ত সৃষ্টি জুড়ে আমার সার্বভৌম ক্ষমতা কায়েম করতে চাই আমি। আর চাই তুমি কেবলই আমার, আমার, আমার, শুধুই অমার।
বেশ বেলা হয়ে এল, এই বেলা আর না উঠে থাকি কি ভাবে? কখন যে এত বেলা হয়েগেল তা বুঝতে পারি নাই, মনে হলো আকাশ থেকে একটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছুটে এসে চোখে মুখে আগুন ধরিয়ে দিল, রোদের ত্যাজ বাড়ছে, গায়ের হালকা চাদরটাও খোলার সময় হলো, বেলা বাড়ার সাথে সাথে একটু তাতানো সূর্যরশ্মিটা জানালার গ্লাস ভেদকরে টাঙ্গানো পর্দার ফাঁক দিয়ে চোখে-মুখে লাগতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। পর্দর ফাঁকের লুকোচুরি করা সেই সূর্যরশ্মিটা জ্বালাতন না করলে হয়তো আর একটু সময় বেশি পেলে চেষ্টা করতে ছিলাম, যদি সম্ভব হতো আলতো করে মনের চাদরটুকু সরিয়ে দিয়ে তোমার সাথে আবার দেখা করতে…












