
খোন্দকার তাজরী রহমান

বাবা ও মা। শব্দ দুটি পৃথিবীর সবচেয়ে অন্যরকম, সবচেয়ে সুরক্ষিত, সবচেয়ে ভালবাসার, যা ধরে ডাক দিলে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান বলে মনে হয়। মনে হয় যে, আমি এমন এক জিনিসের অধিকারী, যা শত কেন হাজার কিছুর বিনীময়েও পাওয়া সম্ভব নয়। বাবা-মা একজন সন্তানের জন্য ঠিক একটি ‘বাড়ি’ স্বরূপ। ঠিক যেমনটি একটি বাড়ি কল্পনা করলে বাড়িটির চার দেয়াল হচ্ছে ‘মা’, এবং এ বাড়িটির ছাদ হচ্ছে ‘বাবা’। মা সার্বক্ষনিক ভাবে তার সন্তানের যেভাবে লালন পালন করে, সর্বদা তার মঙ্গল কামনা করে, ঠিক বাবাও কোন অংশে কম নয়। একটি বাড়ির যেমন শুধু চার দেয়ালেই শেষ নয়, ছাদ ছাড়া যেমন বাড়িটা অপূর্ণ, ঠিক তেমনি বাবা ছাড়া একটি পরিবার, একটি বন্ধন অপুর্ণ। বাবার আশ্রয় যার নেই সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অমুল্য সম্পদ থেকে বঞ্চিত। আর যার মা নেই, সে যেন পৃথিবীর আলো থেকেই বঞ্চিত।
তবু এতকিছুর পরেও আমরা আমাদের বাবা-মা দের বৃদ্ধবয়সে বা আমরা যখন নিজের পায়ের উপর দাড়িয়ে যাই তখন তাদেরকে বোঝা ভেবে, বাড়তি ঝামেলা ভেবে ঝামেলামুক্ত স্থানে (বৃদ্ধাশ্রমে) পৌঁছিয়ে দেই। কিন্তুু এই বাবা-মায়ের জন্যই আমাদের পৃথিবীর আলো দেখা, নিজেদের সখ আহল্লাদ পুরণ করা থেকে একসময় একজন সফল মানুষ রুপে পরিনত হওয়া, সবই তাদের জন্য। অসুখ-বিসুখ থেকে শুরু করে আমাদের রাগ, খোভ, বকা ঝকা, ইচ্ছা, সখ-আহল্লাদ সবকিছু সহ্যকরে যখন একজন পরিনত মানুষে পৌঁছিয়ে দেয়, যখন তাদের দায়িত্বের এক অংশ তারা শেষ করে (যদিও বাবা-মার দায়িত্ব অধিকার কখনো শেষ হয় না), যখন আমাদের তাদের জন্য কিছু করার সময় আসে বা সময় শুরু হয়, তখনই আমরা তাদের বোঝা ভেবে, তাদের অসুস্থতার সময় দু-চার মিনিট পাশেবসে জিজ্ঞাস করার, তাদের কোন কথা আদেশ উপদেশ শোনার, এমনকি তাদের ডাকে কাছে গিয়ে একটু ভালবাসা-অদর নেওয়াও তখন আমাদের সময় থাকেনা, এসবকে বোঝা-ঝামেলা বলে মনে হয়।

কিছু কিছু সন্তান আছে যারা তাদের বাবা-মা কে সেই ঝামেলামুক্ত স্থানে (বৃদ্ধাশ্রমে) না রেখে নিজেদের কাছেই রাখে। ফাদার্স ডে-মাদার্স ডেতে কেক এনে গিফ্ট দিয়ে ভাবে যে অনেক ভালবাসা,অনেক যতœয়াত্তি দেখানো হয়ে গিয়েছে। তারা হয়তো নিজেদের সমাজের কথা-বার্তা সম্মানের খাতিরেই এই মহৎ কাজটুকু করে। তারা ভাবে বাবা-মা কে তাদের প্রয়োজনীয় সকল কিছু এবং নিজেদের অর্জিত টাকা পয়সা দিলেই ছোটবেলার দায়িত্বের ঋণ শোধ হয়ে যাবে। তারা আবার এ বলে দাবি করে যে, তোমরা যা যা করেছে আমাদের জন্য, আমরাতো এখন তোমাদের কোন কিছুর কি কমতি রাখছি? তোমরা যেমন আমাদের কোন কিছুর অপূর্ণতা রাখনাই আমরাওতো তোমাদের কোন কিছুর অপূর্ণতা রাখছিনা। কিন্তুু আসলে পিতা-মাতার সাথে সন্তানের কি শুধু এই প্রয়োজন মেটানোর সম্পর্ক-ই?
আমাদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরানেও বলা হয়েছে, “তোমাদের পিতা মাতা তোমাদের যেভাবে লালন পালন করেছে,তোমরাও তাদের ঠিক সেভাবেই লালন পালন করবে”। আল কোরানের এই আয়াতের অর্থকে আমরা প্রয়োজন মিটিয়ে দায়িত্ব শেষের সাথে তুলনা করেছি। ভাবি যে “তারা আমাদের বড় করেছেন তাদের স্বার্থে যে বৃদ্ধ বয়সে নিজেরা কর্মক্ষেত্র থেকে অবসর প্রাপ্ত হলে আমাদের ব্যবহার করবেন। কিন্তুু আমাদের স্বাধীনতার কথা একটিবারের জন্যও চিন্তা করেনা। আমাদেরও জীবন আছে,আমাদেরও সখ আহল্লাদ, স্বপ্ন আছে,” হু ম্ ম্… আমরা কতটা নিষ্ঠুর ও নিম্ন মানের মানুষ, আবার আমরাই বড় মনের মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখি। “মায়ের পায়ের নিছে সন্তানের বেহেস্ত, বাবার দোয়া আল্লাহ কবুল করেন” এসব কথা আমাদের কাছে তাদের প্রয়োজন মিটানোতেই শেষ, আর তারপর আমরা জান্নাতি, আর আল্লাহর নির্দেশ পালনকারী হয়ে যাই।
মা যেমনটি আমাদের দেখাশোনা, খোঁজ খবর, খাওয়া দাওয়া, লেখাপড়াসহ সকল কিছুই করেছেন, ঠিক তেমনই বাবার অবদানটিও কম নয়। বাবাও ঠিক তার সন্তানের সকলপ্রকার ইচ্ছা চাহিদা, সখ আহল্লাদ পুরনের জন্য রাতদিন চিন্তা না করে, কঠোর পরিশ্রম করে। নিজের সুবিধা-অসুবিধা সুস্থ-অসুস্থতা কোন কিছুরই পরোয়া না করে, নিজের প্রয়োজন অপ্রয়োজনের কথা না ভেবে আমাদের কোনটা প্রয়োজন তার জন্য খেটে যান কিন্তুু কেন? কারণ তার কষ্টের ছায়াও যেন তার সন্তানের স্বপ্ন চাহিদা বা শখের উপর প্রভাব না আসে। বাবা-মা কিছু পাওয়ার জন্য নয় বরং সন্তানের সাফল্যে তারা তখন তাদের সাফল্য অর্জন করে। তাদের ইচ্ছা, চাওয়া, পাওয়া এবং প্রয়োজন শুধু সন্তানের হাঁসি-খুশি, সাফল্যের মধ্যেই। সন্তান খুশিতো বাবা-মা’র অর্জন সেখানে ই। তারা (পিতা-মাতা) তখন নিজেদের সর্বোচ্চ অর্জনের অর্জিতা বলে ঘোষনা করেন। অথচ আমরা সেই বাবা-মা’কেই, সেই কষ্টের গভীরতা চিন্তা না করে সব সময়ের মত স্বার্থপর সেজেই আমাদের বোঝা ভেবে নামিয়ে দিয়ে আসি সেই বোঝা বা ঝামেলামুক্ত স্থানে (বৃদ্ধাশ্রমে)। সেখানে তাদের থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনের জন্য প্রতি মাসে টাকা পাঠানো আর মাসে একবার দেখা করা মানেই আমরা স্বার্থক মনে করে ফিরে আসি, এটাই আমাদের অর্জন। কিন্তুু ফিরে আসার পথে আবার সেই বাবা-মা’ই আমাদের মঙ্গল কামনায় মাথা ও শরীরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে দেয়, আল্লাহ হায়াৎ দারাজ করুক, এবং দেখে শুনে নিরাপদে বাড়ি যাস, আর যতক্ষন পর্যন্ত সন্তান দৃষ্টিগোচর না হয় ততক্ষন পর্যন্ত পথপানে চেয়ে থাকে।
“শিক্ষাই জাতীর মেরুদণ্ড”- যে আমাদের এই মেরুদণ্ড শক্তকরে দাড়াতে শিখিয়েছে, তৈরি করে দিয়েছে এই মেরুদণ্ড ব্যাবহার করে নিজেকে একজন সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে, আর আমরাই তাদেরকে আমাদের মেরুদন্ডের মধ্যে চাপ ভেবে চাপ সরিয়ে দেই। এই সফলতা অর্জনের থেকেতো জন্মেতেই মৃত্যু বরন করা শ্রেয়। তবে তাও বাবা-মা’র সেই মুখবন্ধ কষ্টের মাধ্যমে প্রতিদিন ভিতরে ভিতরে মৃত্যুবরন করার সামনে কিছুই না।
“ডিজিটাল যুগ”- এই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা ডিজিটাল সভ্য হয়ে অনেক পন্থা আবিস্কার করেছি নিজেদের জীবনকে সহজ-সরল ও আধুনিকায়ন করার, আর এতটাই সভ্য হয়েছি যে সভ্যতার খাতিরে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ আবিস্কার করে ঝামেলা-বোঝা সেখানেই ফেলে আসি, সেটাকে আমরা বলি আমাদের মর্ডানিটি (Modernity)। যার এই পিতা-মাতা নামক ঘর নেই, সেই একমাত্র বুঝে, যে ঘরে থেকেও ঘর ছাড়া থাকার শূন্যতা।
আমরা বর্তমানে আরো সভ্য হওয়ার খ্যাতিরে নিজেদের অবস্থান আরো উন্নত করার লক্ষে নিজেদের (Lifestyle) নিয়ে এতটাই ব্যাস্তযে এর গুরুত্ব বুঝার মত এবং গুরুত্ব দেওয়ার সময়টুকুও হয়তোবা আমাদের নেই…।
লেখক : ছাত্রী, এল এল বি, (সম্মান), ষ্টেট ইউনিভার্সিটি, ধানমন্ডি, ঢাকা।











