

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
”ভেহিক্যাল লায়বালিটিজ ইন্স্যুরেন্স” নামে পরিবর্তিত হয়ে থার্ডপার্টি মোটর বীমা ফের চালু হতে যাচ্ছে। তবে “ভেহিক্যাল লায়াবিলিটিজ ইন্স্যুরেন্স” এর পরিবর্তিত নামে কোথাও কোন মত বিরোধ দেখা যায়নাই। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পর বীমা খাতের অংশীজনদের দাবির মুখে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এই বীমা পলিসি চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে । আইডিআরএ’র সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাসের মধ্যেই এ সংক্রান্ত সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
বদলে দেওয়া “থার্ড পার্টি মোটর ইন্স্যুরেন্সের” বীমা পলিসিটির নতুন নামাকরন “ভেহিক্যাল লায়াবিলিটিজ ইন্স্যুরেন্স”। আইডিআরএ’র প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, নতুন আঙ্গিকে বাজারে আসা এই বীমা পলিসি কিনতে অতীতের চেয়ে যেমন বেশি প্রিমিয়াম দিতে হবে, তেমনি বাড়বে বীমা দাবির পরিমানও।
বীমা পলিসিটি বাজার উপযোগী করতে কাজ করছেন আইডিআরএ’র নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের এমন একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ শিগগিরই বিষয়টি নিয়ে আরো একটি সভা করতে যাচ্ছে। এই সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে এটি সেন্ট্রাল রেটিং কমিটির কাছে পাঠানো হবে। অন্যান্য অংশীজনদের মতামতও গ্রহণ করবে আইডিআরএ। দেশে বীমা ব্যবসা চালুর পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সড়কে চলাচলকারী সব ধরনের গাড়ি বা যানবাহনের জন্য থার্ডপার্টি বীমা বাধ্যতামূলক ছিল। ২০১৮ সালে এটি বাতিল করা হয় এবং সড়ক পরিবহন আইনে বিধানটি তুলে দিয়ে ঐচ্ছিক করা হয়।
আফগানিস্তান, সোমালিয়া ও সাউথ সুদান ব্যতীত পৃথিবীর সকল দেশেই মোটর বীমা বাধ্যতামূলক রয়েছে। যেসব দেশে কম্প্রিহেন্সিভ মোটর বীমা বাধ্যতামূলক নেই, সে সব দেশে ন্যূনতম থার্ড পার্টি মোটর বীমা বাধ্যতামূলক রয়েছে। থার্ড পার্টি মোটর বীমা ফের বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়ে দেশের বীমা কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) পক্ষ থেকে। চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি সংগঠনটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেল স্বাক্ষরিত একটি চিঠি আইডিআরএতে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, মোটরযানের মাধ্যমে দুর্ঘটনায় কবলিত তৃতীয় পক্ষের আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার অংশ। যা পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের সরকার বীমা কোম্পানির থার্ড পার্টি মোটর বীমার মাধ্যমে নিশ্চিত করে থাকে।
সুতরাং তৃতীয় পক্ষের সুরক্ষায় দুর্ঘটনা পরবর্তী আর্থিক ঝুঁকি লাঘবে থার্ড পার্টি মোটর বীমা পুনরায় বাধ্যতামূলক করা অত্যাবশ্যকীয়। এটি বাস্তবায়নের জন্য সেন্ট্রাল রেটিং কমিটির মাধ্যমে থার্ড পার্টি মোটর বীমাপণ্য যুগোপযোগীভাবে প্রস্তুত করতে এবং এর দাবি পরিশোধ প্রক্রিয়া সহজ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করতে আইডিআরএ’কে অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি। থার্ড পার্টি মোট বীমার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেয়ার পর হতে কম্প্রিহেন্সিভ মোটর বীমা করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে বলেও জানা যায়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের সড়ক ও মহাসড়কে চলাচলকারী মোটরসাইকেল, গাড়ি, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের মোট যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৫৬ লাখ ৬১ হাজার।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানিয়েছে, বীমা করা বাধ্যতামূলক না হওয়ায় দেশের সড়ক -মহাসড়কে চলাচলকারী প্রায় ৫৭ লক্ষ যানবাহন থেকে প্রতিবছর ৮৭৮ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এর মধ্যে কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাবদ ৮৪৯ কোটি টাকা এবং স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ ২৮ কোটি টাকা।
১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশে বীমা বাধ্যতামূলক ছিল। বীমা ছাড়া গাড়ি সড়কে চালালে জরিমানা দিতে হতো। ফার্স্ট পার্টি বীমা করলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির জন্য ক্ষতিপূরণ পেতেন মালিক। বাধ্যতামূলক ছিল থার্ড পার্টি নামে পরিচিত তৃতীয় পক্ষের বীমা। এ বীমার আওতায় দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী, পথচারীর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা ছিল। এই বীমার প্রিমিয়ামও (কিস্তি) ছিল সামান্য। বাসের জন্য বছরে দেড় হাজার টাকা এবং মোটরসাইকেলে ২২০ টাকা দিতে হতো। অন্যান্য যানবাহনে প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ৩০০ থেকে দেড় হাজার টাকা।
থার্ড পার্টি বীমা তুলে দিয়ে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৫৩ ধারা অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠন করা হয়। তহবিল পরিচালনায় ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে আইনের ৫৪ ধারা অনুযায়ী। দুর্ঘটনায় হতাহতদের পক্ষে আবেদন করলে তদন্ত সাপেক্ষে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে।












