
ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম
কিছুদিন আগেই ২০১৮ সাল শেষ হলো। কিছু অর্থে একটি বছরের সমাপ্তি ও একটি নতুন বছরের সূচনা মানুষের জীবনে তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসে না। একটি বছরের সমাপ্তি ও আরেকটির শুরু একটি সাধারণ পরিবর্তন। যা-ই হোক, একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য হলো, নতুন বছরের শুরুতে মানুষ গত বছরের বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন এবং আগামী বছরের চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবেলা করা যাবে, তার পর্যালোচনা করতে বসে। এ প্রবন্ধে দেশের অর্থনীতি নিয়ে সীমিত আলোচনা করব। জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং এর অন্তর্নিহিত নির্দেশকের ভিত্তিতে ২০১৮ সাল শেষে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং দুই অংকের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে যে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করা হয়েছে, তা পূরণে যেসব চ্যালেঞ্জের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, তা নিয়ে আলোচনার প্রয়াস থাকবে।
২০১৯ সাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মাত্র কিছুদিন আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হলো। ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলটির নেতৃত্বেই একটি নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে ১০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা বলেছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, তবে অর্জন অসম্ভব নয়। বিশ্বে খুব বেশি দেশ নেই, যারা স্থিতিশীলভাবে ১০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। যে একমাত্র দেশ দুই দশকের বেশি সময় ধরে এটা করতে সমর্থ হয়েছে, সেটি হলো চীন। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির এগিয়ে চলা অব্যাহত রয়েছে। ২০০২-১০ সময়ের গড় ৫ দশমিক ৯ থেকে ২০১৬-১৮ সময়ে বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। ধারণা করা যেতে পারে, যদি এ গতি অব্যাহত থাকে, তবে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে না।
এ প্রেক্ষাপটে এখানে বলা যেতে পারে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালে বাংলাদেশের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭ থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এটি ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের সামনে বেশ বড় চ্যালেঞ্জকে নির্দেশ করছে।
প্রবৃদ্ধির দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মূলধন ও শ্রম। এদের সংশ্লিষ্ট ইস্যু নিয়ে নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
মূলধন
পুঁজি সংযোজন বিনিয়োগ থেকে আসে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা সাধারণভাবে নির্দেশ করে যে, বিনিয়োগ/জিডিপি অনুপাত ও জিডিপির প্রবৃদ্ধি হারের মধ্যে একটি শক্তিশালী ইতিবাচক সংযোগ রয়েছে। টেকনিক্যালি এ সম্পর্ক নির্দেশ করে ইনক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল/আউটিপুট রেশিও (আইসিওআর)। ২০১৬-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় আইসিওআর ছিল ৪ দশমিক ১৩। এটা বলছে যে, ১০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইলে জিডিপির ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হবে। ২০১৮ অর্থবছরের ৩১ দশমিক ২৩ শতাংশের তুলনায় এটি ঢের বেশি। জিডিপি প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগের হার বিশাল আকারে বৃদ্ধি অবশ্যই একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। এটি বিশেষভাবে কঠিন এজন্য যে, জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ একটি পুরো দশক ধরে কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে। ২০০৯ অর্থবছরের ২১ শতাংশ ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৮ অর্থবছরে হয়েছে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
এ আলোকে বলা যায়, একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু যা নতুন সরকারকে মুখোমুখি হতে হবে, তা হলো কীভাবে বিনিয়োগের গতি বাড়ানো যায় এবং বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ। বাংলাদেশে বেসরকারি খাত বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হলো ভূমির সহজপ্রাপ্যতা। অন্যান্য বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহ (গ্যাস, বিদ্যুৎ), দুর্বল পরিবহন অবকাঠামো ও বন্দর ব্যবস্থা। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এসব সমস্যা সমাধানে। কিন্তু এসব প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া দুঃখজনকভাবে শ্লথ। অন্যদিকে বেশকিছু নির্দেশককে আমরা সামাজিক অবকাঠামো বলতে পারি, যা বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোয় বাংলাদেশের অবস্থান খুব খারাপ। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের ইজ অব ডুইং বিজনেস ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম, যা নির্দেশ করছে যে, ১৭৫টি দেশ অপেক্ষাকৃত ভালো করছে। এ নির্দেশক প্রস্তুত করা হয় ১১টি সাব-ইন্ডিকেটরের ভিত্তিতে: ব্যবসা শুরু, নির্মাণ পারমিট, বিদ্যুত্প্রাপ্তি, সম্পত্তির নিবন্ধন, ঋণপ্রাপ্তি, সংখ্যালঘু শেয়ার ধারণকারীদের স্বার্থ রক্ষা, কর প্রদান, সীমান্ত ছাড়িয়ে ব্যবসা, চুক্তি কার্যকর, দেউলিয়াপনা সমাধান ও শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ।

বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত সুশাসন নির্দেশকেও বাংলাদেশের অবস্থান ভালো নয়। ২০১৭ সালে নমুনা হিসেবে গ্রহণ করা ১২টি দেশের (বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, রিপাবলিক অব কোরিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, শ্রীলংকা ও ভিয়েতনাম) মধ্যে ১০টি দেশ আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংসতার অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় ভালো করেছে; মতপ্রকাশ ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় ভালো করেছে সাতটি দেশ এবং রেগুলেটরি মানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খারাপ করেছে বাংলাদেশ।
বেসরকারি খাত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো ব্যাংকিং খাতে বাড়তে থাকা অস্থিরতা। ২০১০ সালের ধসের পর থেকে মূলধন বাজার কার্যত নিষ্ক্রিয় রয়েছে, অর্থনীতির প্রকৃত খাতে বিনিয়োগে অর্থায়নের প্রাথমিক উৎস ব্যাংকিং খাত। বিভিন্ন সমস্যায় ব্যাংকগুলো ডুবে রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি কমছে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে এটি ছিল ৯ শতাংশ। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার তুলনায় বেশ কম। তবে ব্যাংকিং খাতের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো শ্রেণীকৃত ঋণের বৃদ্ধি। আউটস্ট্যান্ডিং লোনের অনুপাত হিসেবে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের ৮ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে এটি বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। টাকার অংকে ২০১৮ সালের জুনের ৮৯ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে পুনঃতফসিলকৃত ১৯ হাজার ১২০ কোটি টাকা এবং অবলোপনকৃত ৩৭ দশমিক ২৬০ কোটি টাকা। ব্যাংকারসহ কিছু লোকের দাবি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের শ্লথ প্রবৃদ্ধির জন্য দায়ী তারল্য সংকট। তবে সংশ্লিষ্ট তথ্য এটি সমর্থন করে না। কিছু নির্দিষ্ট ব্যাংকের গুরুতর তারল্য ঘাটতি রয়েছে, কিন্তু পুরো ব্যাংকিং খাতে যথেষ্ট অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ৮১ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১৩ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা অবিনিয়োগকৃত নগদ অর্থ।
ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট সমস্যার পেছনে যেসব কারণ রয়েছে সেগুলো হলো:
- ঋণ আদায় নিশ্চিত করার জন্য জামানত মূল্যায়ন, ভবিষৎ রাজস্বের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং যেসব প্রকল্পে ঋণ দেয়া হয়েছে, সেগুলো থেকে অর্থপ্রবাহ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অপর্যাপ্ত পেশাদারিত্ব;
- ব্যাংকে দুর্বল সুশাসনের জেরে ঋণ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য না হলেও বন্ধু, আত্মীয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঋণ পাচ্ছে;
- ঋণ অনুমোদন, ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে রাজনৈতিক প্রভাব;
- ঋণ আদালতে বা উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশের ফলে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ মামলা অকার্যকর বিচার ব্যবস্থাকে প্রতিফলিত করছে;
- অনেক বেশি ব্যাংকের সংখ্যা, যেটি ব্যাংক খাতের অর্থনীতির ভারসাম্য খর্ব করে এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের দিকে নিয়ে যায়।
উল্লিখিত সমস্যাগুলো যদি কার্যকরভাবে সামাল দেয়া না হয়, তবে বেসরকারি খাত বিনিয়োগের ঊর্ধ্বগতি না দেখার সম্ভাবনাই বেশি।
বিনিয়োগের অর্থ পাওয়ার আরেকটি সম্ভাবনাময় উৎস হচ্ছে শেয়ারবাজার। ২০১০ সালের বিপর্যয়কর ধসের পর, শেয়ারবাজার কার্যত মৃতপ্রায় অবস্থায় চলে গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যসূচক ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারির ৬ হাজার ২৮০ পয়েন্ট থেকে কমে ২০১৮ সালের জুনে হয় ৫ হাজার ৪০৫ পয়েন্ট। তবে সম্প্রতি শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সূচক বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৯৬ পয়েন্টে। যদি এ ঘুরে দাঁড়ানোকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার নির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে শেয়ারবাজারে নতুন প্রতিষ্ঠান, মুনাফা অর্জনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে খ্যাতিসম্পন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশে কাজ করা বহুজাতিক কোম্পানি, তালিকাভুক্তির জন্য সব ধরনের চেষ্টা করার এখনই সবচেয়ে ভালো সময়।
সারণি-১ থেকে দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মূলত প্রধান অবদান রেখেছে সরকারি বিনিয়োগ। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বেসরকারি বিনিয়োগ সংকোচনের কিছুটা সামাল দিচ্ছে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। যা-ই হোক, বাংলাদেশে সরকারি বিনিয়োগে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। অগ্রাধিকার নিরূপণ ছাড়াই অনেক বেশি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর ফলাফলে, বেশির ভাগ প্রকল্প অপর্যাপ্ত বরাদ্দ পেয়েছে। এ কারণে বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে এবং প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণা নির্দেশ করছে, বর্তমান বরাদ্দ অনুযায়ী ১ হাজার ৩৪টি প্রকল্প অর্থবছর ২০১৫ সালের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমান হারে বরাদ্দ দিলে এগুলোর মধ্যে ১০৬টি প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে ১১ থেকে ১০০ বছর এবং ৩২টির ১০০ বছরের বেশি। এছাড়া বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বরাদ্দকৃত অর্থের সময়মতো ব্যবহারের ব্যর্থতাও সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ।
শ্রমিক
প্রবৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শ্রমিক। বিশ্লেষকরা সাধারণভাবে একমত হবেন, জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর্মক্ষম বয়স্ক শ্রেণী হওয়ার সুবিধা বাংলাদেশ পাবে। কিন্তু এ সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন পড়বে কর্মশক্তিতে আরো বেশি করে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ। গার্মেন্টস খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নারী কাজ করলেও সামগ্রিকভাবে কর্মশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী এশিয়ার ১২ দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। একমাত্র পাকিস্তানের কর্মশক্তিতে নারীদের নিম্নতর অংশগ্রহণ ২২ শতাংশ।
যা-ই হোক, কর্মশক্তির শিক্ষা ও দক্ষতার স্তর বাড়ানোর দিকে যথাযথ নজর দিতে হবে, যাতে তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে: অংশগ্রহণের হার ১০০ শতাংশ। কিন্তু এ স্তরের পর ঝরে যাওয়ার পরিমাণ প্রচুর। ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৬৯ শতাংশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ১৭ শতাংশ। এ হার অন্যান্য এশিয়ার দেশের তুলনায় নিম্নতর।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের নিম্নহার ছাড়াও বেশকিছু সমস্যা রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে শিক্ষা প্রদান করা হয়, তা এখনো প্রত্যাশিত মানের নয়। উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে যে ধরনের পাঠ্যক্রম প্রয়োজন, তা তৈরি করা হচ্ছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর ফলাফল হিসেবে, স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার হ্রাস কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ২০১৩ সালের ৯৫ লাখ ৩০০ থেকে কমে ২০১৭ সালে হয়েছে ৮৭ লাখ ৬০০। মোট কর্মসংস্থানে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের অংশ খুব উচ্চ, ২০১৭ সালে ৮৫ শতাংশ। সাধারণভাবে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান কম উৎপাদনশীল।
অর্থনীতির জন্য কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন, তা নির্ধারণে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে এবং এরপর বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কাজে লাগাতে হবে অথবা নতুন প্রতিষ্ঠান করতে হবে যোগ্য শ্রমশক্তি তৈরি করার জন্য।
উপসংহার
১০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব নয়, কিন্তু এ পথে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে - জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন অবকাঠামো ও বন্দর সুবিধার ঘাটতির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে যে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, সেগুলো উপশম করতে হবে।
- ইজ অব ডুয়িং বিজনেস ইন্ডিকেটর র্যাংকিংয়ে উন্নতি করতে হবে।
- সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- ব্যাংকিং খাতের সমস্যা দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করতে হবে।
- শেয়ারবাজার পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, বিশেষ করে দেশী ও বহুজাতিক নতুন প্রতিষ্ঠান তালিকভুক্তির মাধ্যমে।
- প্রাথমিক শিক্ষার বাইরেও অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
- বাজার চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন শিক্ষা ও দক্ষতা কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
- শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক










