প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে নারীশূন্যতা আর কতদিন?

নিজস্ব প্রতিবেদক
করপোরেট সুশাসন ও নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে গবেষণা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস। তার এ গবেষণার সূত্র ধরে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় নারীর উপস্থিতির নমুনা অনুসন্ধান করা হয়। এতে উঠে আসে হতাশাব্যঞ্জক চিত্র। অল্প কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে রয়েছেন
নারীরা। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদের নারী কর্মকর্তার পেশাগত অভিজ্ঞতা ও ক্যারিয়ার ভাবনা তুলে ধরেছেন তানিয়া আফরোজ
সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ডিপার্টমেন্ট, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু ক্ষমতায়নের যুুগে এ বৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক নয়। দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে তাদের অধিকাংশ উপস্থিতিই ফ্রন্ট ডেস্ক, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নার্সিং বা শিক্ষকতার মতো কয়েকটি পেশায় সীমাবদ্ধ। ক্যারিয়ারের প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করার আগেই থেমে যায় অনেক নারীর কর্মজীবন।
গত দু’দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোর মেধাতালিকায় একচেটিয়া মেয়েদের অবস্থান চোখে পড়ে। তবে কর্মজীবনে এর প্রতিফলন খুব অল্পই পরিলক্ষিত হয়। যারা কর্মক্ষেত্রে যোগ দিচ্ছে, তাদের ভেতরও ক্যারিয়ারের সিঁড়ি বেয়ে খুব কমসংখ্যকই পারছে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বাধীন পর্যায়ে পৌঁছাতে। শীর্ষ ব্যবস্থাপনা দূরে থাক, মধ্য পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে ঝরে পড়ছে অনেক সম্ভাবনাময়ী নারী। প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিকÑকোথায় যাচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে মেধা ও মননে দাপিয়ে বেড়ানো মেয়েগুলো? কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে সেসব মেয়ে, যারা সম্পূর্ণ নিজ যোগ্যতায় এক সময় পা রেখেছিল করপোরেট জগতে? অন্য উন্নয়নশীল দেশের চেয়েও বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, জোর দেওয়া হয়েছে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায়। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারেÑকরপোরেট জগতের লিডারশিপ এখনও পুরুষের দখলে কেন?
লিডারশিপ রোলে নারীশূন্যতা কেবল বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বেই আলোচিত বিষয়। গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতা, ভাবমূর্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিসহ বিভিন্ন সুফল নিশ্চিত করে। নারীর কর্মদক্ষতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক উন্নতির সম্পৃক্ততার প্রমাণও পাওয়া গেছে বিভিন্ন দেশের গবেষণায়। তারপরও লিডারশিপ রোলে নারীর উপস্থিতি এখনও নগণ্য। এক অদৃশ্য দেয়াল যা কিনা ‘গ্লাস সিলিং’ নামে পরিচিত, এর পেছনেই আটকে আছে কর্মক্ষেত্রে নারীর সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের করপোরেট জগতে নারীশূন্যতার অন্যতম কারণ প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত বাধা। এর সঙ্গে দায়ী পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে
নারী-পুরুষের মধ্যে যে বেশি সময় দিতে পারে, সে-ই এগিয়ে থাকে। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে হাতেগোনা পরিবারের নারীই সে সুযোগ পায়। এ সমাজে এখনও নারীকে কাজে যোগদানের অনুমতিই ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স’এর একমাত্র সাহায্য হিসেবে বিবেচিত। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের পাশাপাশি সংসারের পুরো দায়িত্ব ক্লান্ত করে তোলে তাকে। আবার কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতির সঙ্গে কাজের চাপও বাড়তে থাকে। বাড়তি এ চাপ সামলাতে না পেরে এক সময় সে চাকরিটাই ছেড়ে দেয়। এছাড়া নারীর আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়প্রত্যয় ও দূরদর্শিতার অভাবকে দায়ী করেছেন অনেকে। অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জিং কাজ নিতে পুরুষের তুলনায় নারীদের অনুৎসাহের অভিযোগও উঠেছে।
এসব বাধা ধীরে ধীরে অতিক্রম করা গেলেও লিডারশিপ নিয়ে সমাজের যে প্রথাগত ধারণা, তা অতিক্রম করা দুঃসাধ্য। ‘ক্যারিয়ারিস্ট’ শব্দটা পুরুষের জন্য অভিবাদন হলেও নারীর জন্য অনেকটাই অভিসম্পাত। সফল নেতৃত্ব বলতে মানুষ তার কল্পনায় একজন পুরুষকেই ভেবে নেয়। দৃঢ়প্রত্যয়, দূরদর্শিতা, আত্মবিশ্বাস ও লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়তা এসব গুণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রতিষ্ঠানের দিকনির্দেশনার জন্য অপরিহার্য। এগুলো কোনো পুরুষ আত্মস্থ করলে সমাজে ও প্রতিষ্ঠানে প্রশংসিত হয়। কিন্তু একই দক্ষতাসম্পন্ন কর্মজীবী নারীকে সমাজ প্রায়ই গ্রহণ করতে পারে না। এ সূক্ষ্ম কাচের অদৃশ্য দেয়াল ভেদ করে প্রতিষ্ঠানের দিক নির্ধারক পর্যায়ে পৌঁছানো তাই নারীদের জন্য আদতেই দুষ্কর।
করপোরেট জগতে নারীশূন্যতা যেমন বাস্তব, এও বাস্তব যে, এ বাংলাদেশেই অনেক সফল নারী আছে যারা সম্পূর্ণ নিজ যোগ্যতায় লিডারশিপ অবস্থান আলোকিত করে আছে। তারা গ্লাস সিলিং ভেঙে এগিয়ে চলেছে বীরদর্পে। প্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্ব এসব আলোকিত নারীর সফলতা ও দীর্ঘ যাত্রার চিত্র তুলে ধরা। কেননা তাদের সফল যাত্রাপথের গল্প ভবিষ্যতের নারীদের স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস