আল আরাফাত
২০১৬ সালের শেষে একবার আমার দেশে যাওয়া হয়েছিল। গ্রামের বাড়িতে এক আত্মীয় আমাকে দেখে বললেন, ‘মামা, আপনি থাকলে আমার বাড়িটা ফ্রি ডিজাইন করে দিতে পারতেন। অন্য ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে বাড়ি ডিজাইন করতে পাক্কা ৫ হাজার টাকা বেরিয়ে গেল!’ বলাই বাহুল্য, তিনি ইঞ্জিনিয়ার বলতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারই বুঝিয়েছেন। দেশে ছয় বছর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। তাই এমন ঘটনার মুখোমুখি হওয়া আমার জন্য নতুন নয়। তবু কানাডায় বেশ কয়েক বছর থাকার পর আবার নতুন করে এমন অভিজ্ঞতা রীতিমতো আমাকে মুষড়ে দিয়েছিল!
কেমন কানাডার প্রকৌশল পেশা?
কানাডার প্রতিটি প্রদেশে একটি করে প্রাদেশিক সরকার অনুমোদিত স্বনিয়ন্ত্রিত সংস্থা প্রকৌশল পেশার আইনকানুন ও বিধিনিষেধ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে। এসব সংস্থার মধ্যে অল্প-বিস্তর পার্থক্য থাকলেও একটা ব্যাপারে সবাই একমত— চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি থাকলেই কেউ নিজেকে এঞ্জিনিয়ার (হ্যাঁ, এটিই সঠিক উচ্চারণ) হিসেবে দাবি করতে পারবেন না। নিজেকে একজন প্রফেশনাল এঞ্জিনিয়ার বা ‘পিইঞ্জ’ হিসেবে দাবি করলে কয়েকটা ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
আমি অন্টারিও প্রদেশে থাকি। কানাডার সবচেয়ে বড় প্রদেশ এটি। তাই এঞ্জিনিয়ারের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি এখানে। এখানকার এঞ্জিনিয়ারিং সংস্থাটির নাম হলো ‘প্রফেশনাল এঞ্জিনিয়ারস অব অন্টারিও’ বা সংক্ষেপে ‘পিইও’। পিইওর নিবন্ধন ছাড়া কেউ নিজেকে এঞ্জিনিয়ার দাবি করলে তিনি অন্টারিও সরকারের বিধি অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধে অভিযুক্ত হবেন, যেমন হয়েছিলেন ফেডারেল সংসদ সদস্য মাজিদ জাওহারি। তিনি নিজে একসময় পিইওর বৈধ সদস্য ছিলেন। রাজনীতিতে যোগ দেয়ার কারণে প্রকৌশল পেশা থেকে বেশ কিছুদিন দূরে থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেকে পিইঞ্জ হিসেবে পরিচয় দেন তিনি। পরে পিইওর কাছে তিনি লিখিত ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং বেশ বড় অংকের জরিমানা দেন। ভবিষ্যতে প্রকৌশল পেশায় না ফিরলে পিইঞ্জ লিখবেন না বলে মুচলেকাও দেন তিনি। পাঠকের কাছে প্রশ্ন, বাংলাদেশের কয়জন রাজনীতিবিদ নিজেকে এঞ্জিনিয়ার বলে পরিচয় দেন?
কানাডিয়ান সরকার অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রকৌশল বিষয়ে চার বছরের ডিগ্রি থাকলে যে কেউই পিইওর সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে সদস্যপদ পাওয়া মানেই পিইঞ্জ সনদ পাওয়া নয়। পিইওর পূর্ণ সদস্য অর্থাৎ পিইঞ্জ হতে হলে একজন আবেদনকারী সদস্যকে অন্তত তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়— (১) কানাডিয়ান সরকার অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তত চার বছরের স্নাতক ডিগ্রি (২) চার বছরের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা এবং (৩) এথিকস ও প্রফেশনাল মিসকন্ডাক্ট পরীক্ষায় পাস। এছাড়া অন্তত তিনজন পিইঞ্জের রেফারেন্স দরকার পড়ে। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের কোনো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কানাডা সরকার কর্তৃক এখনো অনুমোদিত নয়। ফলে কানাডায় অভিবাসন নিয়ে আসা প্রকৌশলীদের আবার সবকিছু প্রায় নতুন করে শুরু করতে হয়। অনেকেই ‘গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ’ অর্থাৎ মাস্টার্স বা পিএইচডি করার দিকে ঝুঁকে যান। তারপর সেই ডিগ্রি দিয়ে পিইঞ্জের জন্য আবেদন করা যায়। গবেষণাভিত্তিক গ্র্যাড স্টাডিজের পড়াশোনা সত্যিকারের পেশাগত কর্ম হিসেবে গণ্য হয়। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ডিগ্রি থেকে সর্বোচ্চ এক বছর অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখানো যায়। তার পরও তিন বছর বাকি থাকে। অনেকেই দেশের প্রকৌশল অভিজ্ঞতাকে কানাডার প্রকৌশল সেক্টরে কাজ করার সমতুল্য অভিজ্ঞতা হিসেবে দাবি করেন। সেক্ষেত্রে পিইও একটি পরীক্ষা বা ভাইভার আয়োজন করে। সন্তোষজনক ফল পেলে পিইওর অনুমোদিত সর্বোচ্চ দুই বছরের অভিজ্ঞতা পেতে পারেন। তার পরও অন্তত এক বছর কানাডিয়ান প্রকৌশল অভিজ্ঞতার দরকার হয় পূর্ণাঙ্গ পিইঞ্জ হওয়ার জন্য। মাস্টার্স ও পিএইচডি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, যেটা অনেকের জন্যই সুবিধাজনক নয়। সেক্ষত্রে বিভিন্ন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবেদনকারীর কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাড়তি কিছু কোর্স করার সুপারিশ করে পিইও। এ কোর্সগুলোকে বলে ব্রিজিং কোর্স।
অনেকেই পিইঞ্জ সনদ পাওয়ার আগে এঞ্জিনিয়ার-ইন-ট্রেনিং (ইআইটি) সদস্যপদ নিয়ে থাকেন। এটি পিইঞ্জ পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন প্রার্থীর মনোবাসনাকে প্রকাশ করে। পিইঞ্জ পাওয়ার জন্য ইআইটি নেয়া বাধ্যতামূলক না হলেও এতে অনেক সুবিধা আছে। যেমন— বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে ফ্রি প্রবেশাধিকার থাকে। এ ইভেন্টগুলোয় একই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা লোকদের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারলে চাকরি পেতে খুব সুবিধা হয়। আমরা প্রায়ই মজা করে বলি, মামা-চাচার জোর না থাকলে বাংলাদেশে চাকরি পাওয়া যায় না। কানাডায় এ ব্যাপারটির অবস্থা আরো খারাপ! প্রায় ৭৫ শতাংশ চাকরি এসব প্রফেশনাল লিংক থেকেই হয়! গাড়ি বা বাসার ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়ামেও বেশ ছাড় পাওয়া যায় ইআইটি থাকলে।
কানাডায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পড়াশোনা করা খুব খরুচে একটা ব্যাপার। ১৮ বছর বয়স হয়ে গেলে ছেলেমেয়েরা সাধারণত নিজেদের খরচ নিজেরাই মেটায়। ফলে দ্রুত আয়-রোজগারের তাগিদে অনেকেই ডিপ্লোমা এঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমানের টেকনিশিয়ান ডিগ্রির দিকে ঝোকে। চাকরির সংখ্যা মন্দ নয়। এরা মূলত সাইটে ইন্সপেক্টর বা ক্যাড ডিজাইনার হিসেবে প্রবেশ করে। একজন টেকনিশিয়ান পরীক্ষার মাধ্যমে ‘সার্টিফায়েড এঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজিস্ট’ বা সংক্ষেপে ‘সিইটি’ হতে পারে। কোনো এঞ্জিনিয়ারিং রিপোর্ট বা ড্রয়িংয়ে টেকনিশিয়ান বা সিইটি স্বাক্ষর করার অধিকার রাখে না। তবে তারা প্রজেক্ট ম্যানেজার হয়ে অনেক উপরের পোস্টেও যেতে পারে। প্রজেক্ট ম্যানেজার হতে গেলে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্রফেশনাল (পিএমপি) সনদপত্র কাজে আসে। প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট বা পিএমআই থেকে পিএমপি সার্টিফিকেট পরীক্ষা দেয়া যায়।
প্রশ্ন হতে পারে, এঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে এত কড়াকড়ির প্রয়োজন কী? কারণ একটাই— জননিরাপত্তা। কানাডা প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ উন্নত ও ধনী দেশ। এদের কাছে জীবনের নিরাপত্তার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। নিরাপত্তাজনিত কোনো রকম সন্দেহ থাকলে যেকোনো কর্মী বা শ্রমিক চাইলে কাজ না করতে পারেন। এজন্য কোনো নিয়োগদাতা তাকে যোগদান করতে বাধ্য করতে পারবেন না। আরেকটি ব্যাপার হলো, এখানকার সবকিছুই ‘স্পেশালাইজড’। অর্থাৎ প্রায় প্রতিটি পেশার জন্যই আলাদা সনদপত্রের প্রয়োজন হয়। সেটি ছাড়া কেউই নিজেকে পেশাদার হিসেবে দাবি করতে পারবেন না। পিইঞ্জ পাওয়া কেউ চাইলেই প্রাইমারি স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক হতে পারবেন না। তাকে প্রাইমারি স্কুল টিচিংয়ের প্রশিক্ষণ আর সনদ নিয়ে আসতে হবে। সম্ভবত এজন্যই বিভিন্ন পেশার প্রতি পারস্পরিক সম্মানের জায়গাটা অটুট থাকে।
মজার ব্যাপার হলো, নির্মাণ সাইটে কর্মরত শ্রমিকরা পিইঞ্জ বা সিইটিদের চেয়েও বেশি বেতন পেয়ে থাকেন। ইউনিয়নভুক্ত হওয়ার কারণে এদের বাড়তি অনেক বেনিফিটও আছে! মার্সিডিজ বা আউডির মতো দামি গাড়ি এরা হরহামেশায় চালান। সাম্প্রতিক সময়ে একজনকে পেলাম, যার আবার নিজস্ব ছোট উড়োজাহাজও আছে! এসব শ্রমিককে নিয়ে বিস্তারিত কথা না হয় আরেক দিন বলা যাবে!
লেখক : মাটিকৌশল প্রকৌশলী











