
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
দ্রোহের অনলে পুড়িয়ে যখন দেখি মৃত্যুর পুর্বাভাস
ধর্ষিতা মা ধর্ষিতা বোনের কন্ঠে শুনি করুন দীর্ঘশ্বাস
বিদগ্ধ ভাসনার তপ্ত ললাটে চুমা চুমি অদৃশ্য থাবার
অগ্নিস্ফুলিঙ্গ মাখা রক্তিম চক্ষু নিভে আসে বার বার।
আছিয়া… আছিয়া… আছিয়া য়া য়া… হা হা হা… আছিয়া ধর্ষিত হয় নাই, আছিয়ারা ধর্ষিত হয় না, কেন আছিয়ারা ধর্ষিত হবে??? ধর্ষিত হয়েছি আমি, ধর্ষিত হয়েছে আমার দেহ, আমার বিবেক আমাকে ধর্ষন করেছে, সারা বিশ্ব! না না, বিশ্ব বিবেকের কাছে আমি ধর্ষিত হয়েছি। এখন আমার বিবেক বর্জিত দেহ নিয়ে আমি বেঁচে আছি। আমি আমার বিবেকের বিচার চাই।
আছিয়া আট বছরের কণ্যা সন্তান, শিশুও নয় কিশোরিও নয়। আছিয়াকে ধর্ষনের ঘঠনা নিয়ে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে এমনকি সোসাল মিডিয়া সরব হয়ে মানব বন্দনসহ সাধারন লোকের মুখেমুখে পর্যন্ত সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও আমি একটুও বিচলিত নই, এবং চিন্তিতও হই নাই। ধর্ষিতা আছিয়াকে নিয়ে বা ধর্ষককে নিয়ে আমার কোন মাথাব্যাথা নাই। মাথাব্যাথা তখনই হয়, চিন্তিত তখনই হই, বিচলিত তখনই হই, যখন দেখি প্রত্যেক ঘরেঘরে নিজেদের ধর্ষক কর্তৃক নিজেদের আছিয়ারা ধর্ষিত হয়। নিজের বিবেককে আর ধরে রাখতে পারি না… কেন যেন অসুস্থ হয়ে পড়ি। এক আছিয়ার আর্ত চিৎকার আকাশে বাতাসে সশব্দে ধ্বনিত না হলেও প্রত্যেক ঘরেঘরে বিভিন্নভাবে লক্ষকোটি আছিয়াদের যৌন নিপিড়নের ভাষাহীন নিঃশব্দ চিৎকার আমাকে বধির বানিয়ে দিয়েছে। একটা প্রশ্নই বার বার মাথায় ঘুরপাক খায়, সারা দেশের সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে মানব বন্দন করা স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রিরাসহ সর্বস্তরের মানুষের একটাই দাবি, ধর্ষকের ফাঁসি চাই। তাইলে এক আছিয়ার ধর্ষকের ফাঁসি হলেই কি সব সমাধান হয়ে গেল? দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন, আমি ধর্ষককে এখানে রক্ষা করার কথা বলি নাই। আছিয়াকে ধর্ষন/যৌন নিপিড়ন করেছে কারা, তারা প্রত্যেকেই নিজেদের পরিবারের লোক কিংবা নিজেদের আত্মীয় সজন।

এখন প্রশ্ন আসে, মেয়েরা কোথায় কার কাছে এবং কাদের দ্বারা ধর্ষন, যৌন নিপিড়ন বা যৌন হয়রানির শিকার হয়, অতীত থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত সমস্থ ঘটনাগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মেয়েরা বেশি ধর্ষন ও যৌন নিপিড়নের শিকার হন নিজের গন্ডি থেকে স্বজনদের দ্বারা, জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতিকেও দেখেছি ছাত্রি ধর্ষনের সেঞ্চুরি করতে। সীমিত দুচারটা ঘটনা ছাড়া সম্পর্কে মামা চাচা ফুফা শশুর থেকে শুরুকরে আপন ভাই পর্যন্ত কাউকেই বাদ দেওয়া যায় নাই, এমনকি আপন পিতা সৎ পিতা পর্যন্ত এসব পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
ভারতের একটা টিভি চ্যানেলে আমীর খান একটা অনুষ্ঠান করতেন, সত্যমেভ জয়তে। প্রায় একদশক আগে। বুদ্ধিদীপ্ত সেই অনুষ্ঠান নিয়মিত সকলের আকর্ষণীয় ছিল। একবার তিনি দর্শকদের প্রশ্ন করে ছিলেন মেয়েরা সবচেয়ে বেশি যৌন হয়রানির শিকার হয় কোথায়? কেউ বলেছেন পার্কে কেউ বলেছেন টেলিফোন বুথে কেউ বলেছেন কোন নির্জন এলাকায়। কেউ বলেছেন মার্কেট প্লেসে। কিন্তু দর্শকদের অবাক করে দিয়ে যেই তথ্য হাজির করে ছিলেন আমীর খান সেটা একেবারে বিস্ময়কর। তাঁর তথ্য মতে মেয়েরা বেশি যৌন হয়রানির শিকার হয় নিজ গৃহে এবং স্বজনদের দ্বারা একেবারে নিকট আত্মীয় স্বজন কর্তৃক। মামা চাচা ফুফা শশুর এমনকি আপন ভাই কেউ বাদ যায়নি যারা মেয়েদের যৌন হয়রানি করে নি। শুনলে আশ্চর্য হবেন যে, আপন পিতা সৎ পিতা কেউ বাদ যায়নি এই তালিকা থেকে। স্বগৃহে একা কোন মেয়ে কখনো নিরাপদ থাকে নি। কিন্তু লোক লজ্জার ভয়ে এধরনের ঘটনা প্রায় শত ভাগ গোপন থাকে বা গোপন রাখা হয়।
তথ্য অনুযায়ী গত বেশ কবছর থেকে আমাদের দেশে খুন. ধর্ষণ, ধর্ষনের পর হত্যা, গনধর্ষণ, আত্মহত্যা, যেন একটা সাধারন নিয়মে পরিণত হয়েছে। যা অতীতের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছে বললেও কমই হবে বলে মনে হয়। বিশেষ করে করোনা কালে ধর্ষণ, গনধর্ষণ, ধর্ষনের পর হত্যা, নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা পরিবারিক কলহ, স্নায়ুবিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়ন সহ নৈতিকতা ও মানবিক অবস্থান একেবারেই তলানিতে এসে লেগেছে, এগুলি কোন একক ঘটনা নয়।
অন্যান্য সময়ের তুলনায় বাংলাদেশে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বেসরকারি সংস্থা এবং পুলিশ বাহিনী থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এর পরিমাপ করা যায়। এটা এতই উদ্বেগজনক যে বর্তমান সময়ে পুলিশ, বিভিন্ন সহযোগি সংস্থা এবং মানবাধীকার কমিশনের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বয়স্ক নারীর তুলনায় কন্যা শিশুদের ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বেশি, এর ভিতরে একক ধর্ষণ, গনধর্ষণ, কখনো কখনো প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে ধর্ষণ নির্যাতন সহ কারো কারো অনৈতিক সুযোগ আদায়ের ঘটনাও। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীকে ধর্ষণের পর নিজের এবং নিজেদের অপরাধ লুকানোর জন্য নির্মমভাবে হত্যা ও লাশ গুম করা হয়েছে।
বর্তমান সময়ে এই ধর্ষণের কারণ খুঁজতে গিয়ে মনোবিজ্ঞানী সমাজবিজ্ঞানী ও সূশীল ব্যক্তিরা সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়কেই এর জন্য দায়ী বলে মতামত দেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রে দুষ্টচক্রের রাহুগ্রাস অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়া, জবাবদিহীতার অভাব, প্রসাশনিক দুর্বলতা, আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহীনির অনৈতিকতা, অদক্ষতা ও অযোগ্যতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, নৈতিক অবক্ষয়, শিক্ষার অভাব, লোভ-লালসা, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের খোলামেলা চলাচল এর কারণ।
পারিবারিক পরিমন্ডলে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাকে সচেতনভাবে মোকাবেলা করতে হবে, বোনের শাশুর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া আট বছর বয়সী মেয়ের লোমহর্ষক ধর্ষণের ঘটনা কি সেই ধারণা কে প্রতিষ্ঠিত করে না?
লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী











