শীর্ষ খেলাপিদের ঋণে ধুঁকছে সাউথইস্ট ব্যাংক

৯ কোম্পানির কাছে পাওনা ৬৫১ কোটি টাকা
অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
অটবি। শিল্পী নিতুন কুণ্ডুর হাতে গড়ে ওঠা আসবাবপত্র প্রস্তুতকারী কোম্পানি। ব্যবসায়িকভাবে শীর্ষ অবস্থানে থাকা কোম্পানিটি দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় নাম লিখিয়েছে। সাতটি বেসরকারি ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অটবির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৯২ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি সাউথইস্ট ব্যাংকেই প্রায় ১৩৬ কোটি ৯ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে অটবির। ওই ঋণের পুরোটাই খেলাপি হয়েছে।
ঋণ আদায়ের জন্য গত বছরের নভেম্বরে অটবির গুলশান মডেল টাউনের প্লট, ১৬ কাঠা জমি ও ছয়তলা ভবন নিলামে তোলার ঘোষণাও দিয়েছিল সাউথইস্ট ব্যাংক। তবে ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিলাম ঠেকিয়েছে অটবি। এখনও ওই ঋণ অটবি পরিশোধ করতে পারেনি।
খেলাপি ঋণ সম্পর্কে জানতে অটবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিমেষ কুণ্ডুর সঙ্গে কথা বলার জন্য কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হলেও তার সময় পাওয়া যায়নি। পরে ‘খেলাপি ঋণ বিষয়ে গণমাধ্যমকে জানানোর মতো কোনো তথ্য থাকলে অটবির পক্ষ থেকে পরে জানানো হবে’ বলে তার দফতর থেকে জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রামভিত্তিক লিজেন্ড হোল্ডিংসও এখন দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি। বেসরকারি ছয়টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কোম্পানিটির খেলাপি ঋণ ৩৪৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংকেই সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই ঋণের পরিমাণ ১০৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঋণের দায়ে জর্জরিত গ্রুপটির কর্ণধার আবদুল হাইও দেশ ছেড়ে কানাডায় চলে গেছেন। তাই বিতর্কিত ব্যবসায়িক গ্রুপটির কাছ থেকে খেলাপি ঋণ আদায় হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
একইভাবে চট্টগ্রামের আরেক বিতর্কিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নূরজাহান গ্রুপের মাররীন ভেজিটেবল অয়েলও সাউথইস্ট ব্যাংকের বড় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। কোম্পানিটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৪৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি ন্যাশনাল ও এক্সিম ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায় করলেও সাউথইস্ট ব্যাংকের পুরো ঋণই খেলাপি হয়ে গেছে। বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপি রাখা কোম্পানিটির কাছ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকেরও ঋণ আদায়ে গতি নেই।
অটবি, লিজেন্ড হোল্ডিং বা মাররীন ভেজিটেবল অয়েলই নয়, দেশের শীর্ষস্থানীয় ৯ ঋণখেলাপির কাছে সাউথইস্ট ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ আটকে গেছে। ওই খেলাপিদের কাছে আটকে থাকা ঋণের পরিমাণ এরই মধ্যে ৬৫১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। অন্যদিকে শীর্ষ ঋণখেলাপিদের কারণে সর্বশেষ সমাপ্ত আর্থিক বছরে বেসরকারি ব্যাংকটির প্রভিশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আর ওই বাড়তি প্রভিশনের চাপে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী মুনাফা কমছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে সাউথইস্ট ব্যাংকের মুনাফা প্রায় ২২১ কোটি টাকা বা ৬৫ দশমিক ৪১ শতাংশ কমেছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংকের কেয়ার স্পেশালাইজড হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের কাছে ৯২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, সুপার সিক্স স্টার শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের কাছে ৫০ কোটি ২৪ লাখ টাকা, ইসলাম ট্রেডিংয়ের কাছে ৪০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, ঢাকা ট্রেডিংয়ের কাছে ৩৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, ওয়ান ডেনিম মিলসের কাছে ৩০ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং অরনেট সার্ভিসেস লিমিটেডের কাছে ১৩ কোটি তিন লাখ টাকা খেলাপি রয়েছে।
বড় খেলাপিদের কাছ থেকে পাওনা আদায়ে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে সাউথইস্ট ব্যাংকের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম কামাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলার জন্য কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। পরে ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) রাশেদুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বড় খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ এজন্য কাজ করছে। তবে এ বিষয়ে আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়।’
উল্লেখ্য, ২০০০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৯১৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ৩২ দশমিক ৩৪ শতাংশ উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ছয় দশমিক ৮০ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩০ দশমিক ৯০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৩ সালে বোনাস ও নগদ মিলিয়ে ব্যাংকটি সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে। মুনাফা কমায় সর্বশেষ ২০১৭ সালে ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে ব্যাংকটি।