নন-লাইফ বিমা শিল্প ভাবনা

আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী
নন-লাইফ বিমা শিল্পের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, কিছু নিয়মনীতি সংশোধন করা একান্ত প্রয়োজন। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের বিমা খাত জাতীয় অর্থনীতিতে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হচ্ছে না, যা ভবিষ্যৎ বিমা শিল্পের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
নন-লাইফ বিমা শিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো হলো : নির্ধারিত এজেন্ট কমিশনের অতিরিক্ত কমিশন প্রদান। বিশ্ব বিমা বাজারের সঙ্গে আমাদের বিমার প্রিমিয়াম হার অনেক বেশি। নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে এজেন্ট প্রথা বিলুপ্ত করা প্রয়োজন। নন-লাইফ বিমা খাতে পণ্যের স্বল্পতা রয়েছে। নন-লাইফ বিমার ক্ষেত্র বিস্তারের জন্য বিমাকৃত খাতগুলো চিহ্নিত করে তা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। নন-লাইফ বিমা আইনের কিছু ধারা সংশোধনপূর্বক এ শিল্পের উন্নয়নের জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
উপরিউক্ত সমস্যার সমাধান এবং নন-লাইফ বিমা শিল্পের বিকাশে আমার কিছু ব্যক্তিগত মতামত উপস্থাপন করছি :
বেসরকারি খাতের নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স শিল্প বিকাশের জন্য সরকারি সম্পত্তির বিমা শুধু সাধারণ বীমা করপোরেশনের ওপর অর্পিত করা প্রয়োজন। এতে বিমা ক্ষেত্রে শৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। সরকারি সম্পত্তির বিমার প্রিমিয়াম অর্থাৎ ৫০ শতাংশ সব বেসরকারি নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মধ্যে সমহারে বিতরণ করার যে রীতি প্রচলিত আছে, তা বিলুপ্ত করা প্রয়োজন। নন-লাইফ বিমা শিল্পের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশে নন-ট্যারিফ মার্কেট বিবেচনা করা সময়োপযোগী হবে। কারণ দেশে ট্যারিফ মার্কেটের হার বিশ্ববাজার থেকে অনেক বেশি। ফলে অতিরিক্ত কমিশন প্রদানের প্রবণতা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া নন-ট্যারিফ মার্কেটের ফলে আমরা বিশ্বের বিমা সেবার সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বিমা সেবা প্রদানে সক্ষম হব। পুনঃবিমার ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত আইন অর্থাৎ ৫০ শতাংশ বাধ্যতামূলক সাধারণ বিমা করপোরেশনের সঙ্গে পুনঃবিমা করতে হবে, বাকি ৫০ শতাংশ ওভারসিস মার্কেটে করা যায়, তা হ্রাস করে ৩০ শতাংশ সাধারণ বিমা করপোরেশনের সঙ্গে এবং ৭০ শতাংশ ওভারসিস মার্কেটে করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে বিকল্প থাকতে পারে যে কোনো কোম্পানি। যে কোনো নন-লাইফ বিমার নতুন পণ্য যে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি উদ্ভাবন করবে, তাকে প্রথমে বাজারজাত করার সুযোগ দিতে হবে এবং যদি সফলতা আসে, তবে বিমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ থেকে ওই কোম্পানি নতুন উদ্ভাবিত পণ্যের অনুমোদন নেবে। এতে যেমন নিয়মনীতির বাধ্যবাধকতা হ্রাস পাবে, তেমনি বিভিন্ন কোম্পানি নতুন পণ্য উদ্ভাবনে উৎসাহ পাবে।
মূলত বিমা দাবি যে কোনো নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সক্ষমতার পরিমাপের প্রধান মানদণ্ড। তাই বর্তমানে প্রচলিত বিমা দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও নথিপত্র প্রদানের যে প্রক্রিয়া রয়েছে, তা সহজীকরণ প্রয়োজন। নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বিমাপত্র প্রসারে প্রিমিয়াম পরিশোধে কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রিমিয়াম পরিশোধে পরবর্তী দিনে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকরণের যে আইন আছে, তা কিছুটা শিথিল করে ন্যূনতম এক মাস করা প্রয়োজন এবং এক মাসের পর যদি প্রিমিয়াম পরিশোধ না হয়, তবে প্রতিদিনের জন্য বিবেচনাযোগ্য জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে।
উপরিউক্ত বিষয়াদি পর্যালোচনা ও বিবেচনাপূর্বক আমরা যদি সুষ্ঠু ও বাস্তবসম্মত বিমা কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নিয়মনীতি সংশোধনপূর্বক নন-লাইফ বিমা শিল্প পরিচালনায় সক্ষমতা অর্জন করতে পারি, তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ওপর গ্রাহকের আস্থা বাড়বে এবং এ শিল্পের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী : মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোং লি.