

বাংলাদেশের ইন্স্যুরেন্স সেক্টর শেষ পর্যন্ত কমিশন প্রতিযোগিতাসহ কোম্পানীগুলির মালিকদের চিহ্নিত লুটপাটের চারণ ভূমিতে পরিণত হলো বলে জনসাধারণের নিকট প্রতিয়মান।
খোন্দকার জিল্লুর রহমান
বিভিন্ন পত্রিকার সূত্র অনুযায়ী গত ১০/১২ বছরে বীমা খ্যাতের অব্যবস্থাপনা, লুটপাট এবং হযবরল চিত্র, বিশেষ করে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোপানীগুলির চেয়ে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোপানীগুলির মালিক এবং কর্মকর্তারা বেশি এগিয়ে আছে, এটা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোপানীগুলির কর্মকর্তাদের অবস্থা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আর বর্তমানে বীমা খাতের অভিভাবক হিসাবে আইডিআরএ কতটুকু দায়িত্বশীল তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশেষ করে লেজুড়বৃত্তি, অযোগ্যতা, অদক্ষতা, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাসহ বড় বড় পদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রধানদের কারণ-ই বীমা খাতে এ অবস্থার জন্য দায়ী বলে বিশিষ্টজনরা মতামত দেন। কেউ কেউ বলেন, সরকারের জবাবদিহিতা না থাকার কারণে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রধানরা নিজেদের মধ্যে কৌশলে আরেকটি গোপন সিন্ডিকেট তৈরি করে নিজেদের রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বীয় স্বার্থ হাসিলে মশগুল। অনেক সময় এদের কাউকে কাউকে চিহ্নিত করা গেলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে এরা চলে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, সুযোগ সন্ধানীরা তখন সুকৌশলে সেই সরকারের ভেতরে ঢুকে রাষ্ট্রের চলমান অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে তৎপর হয়ে ওঠে, এদের অবস্থান খুবই শক্ত, যা একটা উন্নয়নমুখি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। সরকারও নাকি এদের থেকে সুযোগ সুবিধা (আর্থিক ও রাজনৈতিক) আদায় করে থাকে, যার ফলে সরকার প্রকৃত অপরাধীদের বের করে শাস্তির আওতায় আনতে পারে না।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিশেষ করে করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠার পর ইউক্রেন রাশিায়র যুদ্ধ এবং ব্যবসায়ীক মন্দার ছুতা ধরে বাংলাদেশের ইন্স্যুরেন্স সেক্টর (নন-লাইফ) কমিশন প্রতিযোগিতায় ব্যবসা সংগ্রহের মাধ্যমে কোম্পানীগুলির মালিকদের চিহ্নিত লুটপাটের ক্ষেত্রে পরিনত হল বলে জনসাধারনের নিকট প্রমানিত হওয়ার বিশেষ একটা বাকি নেই। অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, মিথ্যাতথ্য দিয়ে তহবিল আত্মস্বাত, কোন রকম বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে বা কোন রকম নিয়ম নিতির অবলম্বন ছাড়াই ভুয়া নিয়োগ/ প্রমোশন দেখানোর মধ্যদিয়ে বেতন ভাতার নামে বিশাল অঙ্কের টাকা উত্তলন করে নেওয়া, অবৈধ পথে জনগনের জামানো অর্থ বিদেশে পাচার করা, সরকারের কর ফাকি দেওয়া, আইডিআরএ’র বেঁধে দেয়া আইন ভঙ্গকরে অতিরিক্ত কমিশনে ব্যবসা কারা, অতিরিক্ত কমিশনকে জায়েজ করার জন্য ডামি কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে পলিসি/ কাভারনোট বাতিল করে ভুয়া ডকমেন্ট তৈরি করে ক্লেইমের মাধ্যমে সমন্ময় দেখিয়ে তহবিল লুটে নেয়াসহ মালিকদের লোভ, অতি মুনাফা, অনৈতিক মনোভাবসহ স্বীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্যদের দুই-তৃতিয়াংশের সন্মতি ছাড়া নিজের পছন্দসই (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) এমডি/সিইইউ/ মুখ্য নির্বহী কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে পুরো বীমা সেক্টরকে টালমাটাল অবস্থায় দাড় করিয়েছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়,এমডি বা সিইও নিয়োগের ব্যপারে নিজেদের জুতসই না হলে কোম্পানীর প্রভাবশালী মালিকপক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (আইডিআরএ)’র তিন বছরের নিয়োগ অনুমোদনকে তোয়াক্কা না করে এক অথবা দুই বছরের নিয়োগ দিয়ে এমডি/সিইওদেরকে চাপের মধ্যে রাখেন নিজেদের বলয়ে কাজ করার জন্য। যেহেতু বীমা কোম্পানীগুলির এমডি/সিইও নিয়োগ এবং অপসারন ক্ষমতা একমাত্র মালিকের ইচ্ছার উপর নির্বরশীল, নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ)’র শুধু নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া ছাড়া অন্য কোন ক্ষমতার অধিকারি নন, যার কারনে বীমা সংশ্লিষ্ঠ বোদ্ধারা অনেকেই বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা(আইডিআরএ)কে কাগুজে বাঘ বলেও উল্লেখ করেন, যা একটা দেশের আর্থীক তথা বীমা খাতের জন্য অশনি সঙ্কেত ছাড়া কিছুই নয়।

গোপন পরিসংখানে পাওয়া যায় উল্লেখযোগ্য দুর্নীতির মাত্রায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)‘র স্থান শীর্ষমাত্রায়, সেটা বোঝা যায় আইডিআরএ‘র সদস্য নিয়োগ দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে। আইডিআরএ‘র সদস্য হওয়ার জন্য বীমা কোম্পানির একজন সিইও সকল সুযোগ সুবিধাসহ ৩ থেকে ৫ লক্ষ টাকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে কেনো মাত্র প্রায় ১ লক্ষ টাকার চাকরির জন্য হন্যে হয়ে বিভিন্ন তদবির তকলিফ এবং যা যা করার দরকার তা করে থাকেন। এটা বিশেষ ভাবে পশ্নবিদ্ধ যে, কেনো একজন এমডি প্রায় ৪ লক্ষ টাকার সম্মানি এবং ৩ বছর করে ২ বার নবায়ন যোগ্য পদ ছেড়ে ১ লক্ষ টাকার সম্মানি এবং মাত্র ২ বছরের জন্য(পরে বাড়তেও পারে নাও পারে) নিয়োগ হয়ে আইডিআরএ’র সদস্য পদের জন্য উঠেপড়ে লাগেন, অর্থাৎ “ডাল মে কুচ কালা হে”।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েসন (বিআইএ)’র অফিসে এসোসিয়েশন অব ইন্স্যুরেন্স এক্সিকিউটিভস (এআইই) আয়োজিত অভিষেক অনুষ্ঠানে মালিক ও ব্যবস্থাপকদের স্বীকারোক্তি তুলে দেওয়া হল…
বীমা খাতকে কমিশন ভিত্তিক না করে সেবা ভিত্তিক বীমা খাত গড়তে হবে বলে মন্তব্য করেছেন এসোসিয়েশন অব ইন্স্যুরেন্স এক্সিকিউটিভস (এআইই) আয়োজিত অভিষেক অনুষ্ঠানের আলোচকরা। নন-লাইফ বীমা খাতে অবৈধ কমিশন দেয়ার বিষয়টি তুলে ধরে বক্তারা বলেন, নিজের টাকা অন্যকে দিয়ে আমরা কেন মিথ্যা ঘোষণা দিচ্ছি, কেন মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি। এই মিথ্যা ঘোষণা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের নিজস্ব স্বীকারোক্তি দেখে হবুচন্দ্র রাজা এবং গবুচন্দ্র মন্ত্রীর কবিতার কথাই মনে করিয়ে দিল…
নন-লাইফ বীমা খাতে অবৈধ কমিশন দেয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পনীর লিঃ এর চেয়ারম্যান মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন, নিজের টাকা অন্যকে দিয়ে আমরা কেন মিথ্যা ঘোষণা দিচ্ছি, কেন মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি। তিনি মুখ্য নির্বাহীদের মিথ্যা প্রশ্রয় না দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এই মিথ্যা ঘোষণা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। বীমা খাতকে কমিশন ভিত্তিক না করে সেবা ভিত্তিক করতে হবে অর্থাৎ প্রকৃতভাবে তিনি অবৈধ কমিশনের কথা স্বীকার করে নিলেন।
বিআইএ’র প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ (পাভেল) বলেন, নন-লাইফ বীমা খাতের সমস্যার সমাধান করার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু পুরোপুরি সমাধান হয়নি। কোথাও কোন একটা সমস্যা রয়েই গেছে। এ জন্য আমাদের সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে।
বিআইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও নিটল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান এ কে এম মনিরুল হক বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্প হলো বীমা। পৃথিবীর সব দেশের বড় বড় বিল্ডিংগুলো বীমা কোম্পানির। তিনি বলেন, এক একা বড় হওয়া যায়, তবে এক সাথে বড় হওয়ার মধ্যে আনন্দ বেশি। তিনি নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার কথা বললেও নিজের কোম্পানীতেই কমিশন বানিজ্যের তালিকায় নাম উঠে আসেছে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ)’র প্রেসিডেন্ট বি এম ইউসুফ আলী বলেন, দেশে জাতীয় দিবসগুলোর মধ্যে বীমা দিবস চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও মাতৃভাষা দিবসের পরেই জাতীয় বীমা দিবস। প্রশাসনের সহায়তায় দিবসটি সারাদেশে মহোৎসবে পালিত হয়। এটি আমাদের জন্য সৌভাগ্য। এই শিল্পের স্বার্থে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
অথচ গত বেশ কিছুদিন ধরে পত্রপত্রিকায় ফারইষ্ট ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লুটপাট, দুর্নীতির চিত্র দেখে দেশের সাধারন মানুষ আতঙ্কিত হলেও লাইফ বীমা খাতের গ্রাহকদের অবস্থা জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতই। অন্যান্য পত্র-পত্রিকাসহ আর্থনীতির ৩০ দিন বিডিডটকম এ ফারইষ্ট লাইফের লুটপাট, দুর্নীতি নিয়ে ৯/১০ খন্ডের ধারাবাহিক চিত্রে তা প্রমাণিত হয়েছে।
আমাদের অনুসন্ধানী টিম লাইফ এবং নন-লাইফ বীমাখাতের বিভিন্ন অনুসন্ধানী তথ্য উদঘাটনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, পরবর্তি সংবাদের জন্য চোখ রাখুন www.arthoniter30dinbd.com (অর্থনীতির৩০দিনবিডি.কম) এবং অর্থনীতির ৩০ দিন ম্যাগাজিন‘র পাতায়।
ধারাবাহিক চলবে….
ম্যাগাজিনের জন্য যোগাযোগ :
খোন্দকার জিল্লুর রহমান
সম্পাদক ও প্রকাশক: অর্থনীতির ৩০ দিন
৮৫/ডি পুরানা পল্টন লাইন
ঢাকা – ১০০০
ফোন ০১৫২১ ৭৯ ৫১ ৪০ / ০১৭১২ ০৫ ২৭ ৮১












