খালেদার রায়ে সন্তোষ চেয়ে অস্বস্তি বেশি

দুর্নীতির দায়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডে সন্তুষ্ট আওয়ামী লীগ। তবে এর ফলে খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের সহানুভূতি বেড়ে যাচ্ছে কি না, এই অস্বস্তিও আছে। তাই রায়ের প্রতিক্রিয়া প্রকাশে এখনই বেশি উচ্ছ্বাস দেখাচ্ছে না আওয়ামী লীগ।
গত বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় এবং তাঁকে কারাগারে পাঠানোর পর থেকে শুক্রবার পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এ সময় তাঁদের মধ্যে স্বস্তির প্রকাশ দেখা যায়। তবে কেউ কেউ অস্বস্তির কথাও বলেছেন।
দায়িত্বশীল এসব সূত্র বলেছে, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং একটা বড় দলের প্রধানকে কারাগারে পাঠানোর পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় কোনো অবনতি হয়নি। এটা বড় স্বস্তির বিষয়। আদালতের রায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভালোভাবে বাস্তবায়ন করেছে। নেতারা আরও মনে করছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতির মধ্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলে সাধারণ মানুষ মনে করতে পারে, এই রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ জন্য দলের উচ্চপর্যায় থেকে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে দুর্নীতিবাজ—এটা আদালতে প্রমাণ হওয়া জরুরি ছিল, তা হয়েছে। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দেশে-বিদেশে এটা প্রচারের যথার্থ সময়। রায়ে স্বস্তির কারণ সম্পর্কে ওই নেতা বলেন, বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে এখন কঠিন সময় পার করতে হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তির চেষ্টা ছাড়াও একদিকে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, অন্যদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়াটা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। খালেদা জিয়ার জামিনের জন্য ব্যস্ত থাকতে হবে নেতাদের। ফলে নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি আদায় ও নির্বাচনের প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়বে বিএনপি।

আর অস্বস্তির জায়গা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর তাঁর প্রতি মানুষের সহানুভূতি বেড়ে যায় কি না, এই ভাবনা আছে আওয়ামী লীগের। রায়ের আগে-পরে খালেদা জিয়া ও বিএনপির নেতারাও এ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব আচরণ করেছেন।
আরেকটি অস্বস্তির বিষয়ও আছে আওয়ামী লীগের। অর্থ আত্মসাতের দায়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সাজা হওয়ার পর সরকারের ওপর আরও অনেক দুর্নীতির বিচারের জন্য চাপ বাড়বে। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ব্যক্তিগত আলোচনায় আর্থিক খাতে নানা কেলেঙ্কারি এবং এর সঙ্গে ক্ষমতাসীন কিছু ব্যক্তির জড়িত থাকার বিষয়টি এসেছে, যা সরকারকে আগামী দিনগুলোতেও মোকাবিলা করতে হবে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম প্রথম আলোকে বলেন, আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণে সন্তুষ্ট হয়ে খালেদা জিয়ার রায় দিয়েছেন। এখানে আওয়ামী লীগের খুশি হওয়া বা স্বস্তি পাওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার উচ্চ আদালতে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে।
কারাগারে যাওয়ার কারণে খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতি বাড়তে পারে এমন আলোচনা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে জেল খেটে মানুষ বড় নেতা হতেন। কারণ, সেগুলো ছিল রাজনৈতিক মামলা। কিন্তু খালেদা জিয়া তো দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত। সহানুভূতি পাবে কেন?’
রায়ের পর আওয়ামী লীগের নেতারা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে নিজেদের মধ্যে নানা আলোচনা করছেন। এসব আলোচনার মূল কথা হচ্ছে, খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। খালেদা জিয়ার এই কারাবাস দীর্ঘমেয়াদি হবে, নাকি জামিন পেয়ে অতি দ্রুত তিনি ফিরে আসবেন, এটাও বড় বিষয়।
গতকাল গাজীপুরে একটি উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করতে গেলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন, খালেদা জিয়ার রায়ের ফলে দেশের রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হলো কি না? জবাবে তিনি বলেন, ‘এ রায়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হলো না, বরং বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট ঘনীভূত হবে।’
আওয়ামী লীগের দুজন আইনজীবী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, খালেদা জিয়ার রায়ের পর বিএনপির প্রতিক্রিয়া জোরালো না হওয়ার কারণ পরিষ্কার নয়। কখনো মনে হয়েছে রায়ের আগে-পরে কর্মসূচি ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশে দলটি পরিপক্ব আচরণ করছে; আবার মনে হয়েছে সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানই তাদের নিবৃত্ত করেছে। তবে তাঁদের মতে, এই রায়ের পর আওয়ামী লীগেরও শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে। কারণ, ‘আইনি মারপ্যাঁচে’ যে কারও পরিণতি এমন হতে পারে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান প্রথম আলোকে বলেন, খালেদা জিয়ার রায় নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো লাভ-লোকসান নেই। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন, এটা প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমান সরকার নিজ দলের মন্ত্রী-সাংসদদেরও ছাড় দিচ্ছে না। দুর্নীতিবাজ যে-ই হোক, তার বিচার হচ্ছে এবং হবে।