ছোট গল্প :“অপ্রস্তুুত সময়”(দুষ্টি কলম..)

(“দুষ্টি কলম” টা আমাকে অবসর থাকতে দেয় না, না লিখলে আমাকে শুধুই বিরক্ত করে, কেন যে আমার সারাদিন-রাত লিখতে ইচ্ছে হয়, সেটা আমি নিজেও বুঝিনা, যখন দেখি পেটে বোমা মারলেও একিট শব্দ বেরিয়ে আসার কোন যোগ্যতা নাই আমার, তখন বুঝি, আসলে আমাকে দিয়ে কিছুই হবেনা শুধু অন্ন ধ্বংস করা ছাড়া…। —— খোন্দকার জিল্লুর রহমান
“অপ্রস্তুুত সময়”
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :-
ট্রেনের সময় প্রায় এক ঘন্টা লেট , চাকা ওয়ালা লাল লাগেজটা হেন্ডেল ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে প্রথম শ্রেনীর বিরতি কামরায় গিয়ে উঠলাম। প্রথম শ্রেনীর বিরতি রুম হলেও সুযোগ সুবিধা তেমন একটা আছে বলে মনে হয়নাই। ফ্লাটফরমে লাগেজ নিয়ে অত লম্বা সময় হাঁটা হাঁটি করে সময় কাটানো সম্বভ নয়। লাগেজটা পাশে রেখে গরম তেমন একটা না হলেও সিলিং ফেনটা হালকা করে ছেড়ে দিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে পা লম্বা করে বসে বসে বিরক্তিকর সময় কাটানোর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি। এরই মাঝে অনেকটা সময় কেটে যায় । ট্রেন আসার সময় হওয়াতে ষ্টেশন মাস্টারের মাইকে এ্যনাউন্সমেন্টের শব্দটা কানে আসতেই ঘুমভেঙ্গে যায়। ঘুমের জড়তা কেটে তড়িগড়ি করে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে লাগেজটার হেন্ডেল ধরে আস্তে আস্তে টেনে নিয়ে সিডিউল অনুযায়ী নিজের কম্পার্টমেন্টের পজিসনমত গিয়ে দাড়ালাম। ট্রেন প্রায় ষ্টেশনের নিকটেই এসে গেছে, আমিও ট্রেনে উঠার জন্য প্রায় প্রস্তুত।
লোকজনের প্রচুর ভিড় থাকলেও সেটা অণ্যান্য শ্রেনীর কামরা গুলিতে, প্রথম শ্রেনীর কামরার দিকে তেমন একটা ভিড় নাই বললেই চলে। এখানে ট্রেনের স্টপেজ মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মিনিট, কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই মোটামোটি আরামেই লাগেজটা নিয়ে ট্রেনে উঠে নিজের নির্ধারিত সিটের দিকে অগ্রসর হয়ে এসে দাড়ালাম। এখানে বিরতির সময় কম হওয়াতে অন্যান্য কামরার কিছু লোকজনও এই কামরায় উঠেপড়ে, ট্রেন ছাড়ার অল্প সময়ের ব্যাবধানে সবাই যার যার জায়গামত স্থানে গিয়ে বসতে শুরু করে । প্রথমদিকে লোকজনের একটু ঝামেলা থাকলেও ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই আস্তে আস্তে সব পরিস্কার হয়ে যায়। আমিও আমার নির্ধারিত সিটে তোড়াওয়ালা ছোট্ট লাগেজটার উঠানো হেন্ডেলটা ফোল্ডকরে সিটের পাশে রেখে বসার পুর্বে সিটটা একটু ময়লাযুক্ত মনে হওয়াতে লাগিজের একপাশের চেইন খুলে টাওয়াল নিয়ে নিজের বসার আসনটা পরিস্কার করতে শুরু করি। আমার অবয়ব দেখে আমার রুম দেখাশোনা করা ট্রেনের কেয়ারটেকার একটু আগবাড়িয়ে এসে নিজের ঘাড়ে রাখা টাওয়াল দিয়ে আমার সিটটাকে ভালভাবেই পরিস্কার করে দেয়। এদের এ কাজেরও একটা কারন থাকে , সেটা পরে বর্ণনা করা যাবে।
এতসময়ে নিজের আনুসাঙ্গিক কাজগুলো সেরে একটু গুছিয়ে বসতে গিয়েই নিজেকে কেমন একটা অপ্রস্তুত মনে হল, মনেহল যেন কোথাও কোন একটা ভুল হয়ে গেছে, নিজেকে ডানে বাঁয়ে দেখে নিয়েও কোন কিছু খুঝে পাচ্ছিনা, তবুও যেন অপ্রস্তুত অবস্থাটাকে ঠিক করে নিতে গিয়ে নিজে নিজেই গার্মাক্ত অবস্থা হয়ে যাচ্ছে। কেমন যেন একটা অবস্থা….। নিজেকে তবুও হালকা মানসিক চাপের মধ্যে রেখেও প্রস্তুত হয়ে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে বসি। বসার পরেও নিজের প্রতি নিজের ত্রাহি অবস্তাটা যেন আরো বেড়ে যাচ্ছে। হাতে একটা বই নেব ,যেন সেটাও নিতে পারছিনা। আসলে এটোতো হবার নয়, কোনক্রমেই নিজেকে ভিতরগতভাবে বুঝাতে পারছিলামনা যে আমি সর্বদিক থেকেই পুরোপুরি ঠিক। আসলে কখনো কখনো এমনই হয় যে কিছু উপস্থিত পরিস্থিতি নিজেকে এলোমেলো করে দেয়। আর এই এলো মেলো হওয়ার ভাষাটাও এক এক সময় এক এক রকম হয়। আড় মোড় ভাবে নিজেকে সিটের দিকে ফিরে পেন্টের জিপারটাও চেক করে নেই ,মনে হয়েছিল নাকি পেন্টের জিপার টা খোলা কিনা ,ছেলেদের সময়ে সময়ে এমন হয় যেন পেন্টের জিপার না লাগানোই শুধু ভুল হয়, আর অন্য কিছু নয়, কিন্তু কৈ- নাতো তাও নয়, সবই তো ঠিক আছে। আসলে মুল কারনটা হল
সামনের সিটের ব্যাপার, যার জন্যই এই অপ্রস্তুত অবস্থা।
আসলে একটা সময় থাকে, বা মাঝে মাঝে এমন অপ্রস্তুত অবস্থা হয়ে যায়, বা মাঝে মাঝে এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়তে হয়, এটাই স্বাভাবিক। সবকিছু উদ্যাম জোয়ারের মত থাকলেও নিজেকে বর্ষা প্লাবন খরশ্রোতা নদীর মত করেই বয়ে নিয়ে যেতে হয়, কেন আমিও কম কিসের ? কি না আছে আমার ভিতর । আমিতো সকল ব্যাপারেই স্বয়ংসম্পুর্ণ আশাকরি । জিন্সপেন্ট আমাকে অত ভাল না লাগলেও ইয়াং মেয়েদের তেমন একটা খারাপ লাগেনা এটা সত্য, জিন্স পেন্টের রঙ্গযদি নিলচে টাইপের হয়, তার সাথে জামাটাও যেন লেডিস কাটিং শার্ট, চসমাটা যেন কম দামি নয়, ভালইতো, দেখতে তো মনে হয় যেন একবারেই …. । আসলে আমার কিছুটা এলো মেলো হওয়ার ব্যাপার যে একটু ভিন্ন নয় তাও না । চুল দেখে মনে হল যেন সেই বনলতাসেনের কবিতার মতই নিজেকে আবিস্কার করে নিলাম, চুল তার কবেকার অন্ধকার বিধিশার নিশা… মুখ তার শ্রাবস্থির কারুকার্য্য, হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারিয়েছে দিশা… ব্যাপারটা এমনই যেন ঠিক দিশা হারানোর মতই। ট্রেন চলছে ট্রেনের মতই, মাঝে মাঝে দু একটা ফেরিওয়ালা বাদাম, চানাচুর , চিপস এবং রেলের কেটারিং এর বয় সে জিজ্ঞাসা করে কিছু লাগবে স্যার, স্যার শব্দটা যেন আমার সামনের জীবনের উদ্দ্যেশ্যটা বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, আমিতো টিচিং জবে জয়েন্ট করার উদ্যেশ্যেই যাচ্ছি। পথ চলতে চলতে দুজনে দুজনের দিকে এক দু বার দৃষ্টি আক্রান্ত হলেও তেমন একটা কথা হয়না, হটাৎ ট্রেনের চলার মাঝে ঝাঁকুনিতে উপর থেকে মহিলার ছোট্ট লাগেজ ব্যাগটা পড়ে যেতেই ধরে ফেলি, দুজনে একই সাথে সরি বলে উঠতেই দুজনের একটু হাসির উদ্রেক হয়। নিজের লাগেজ ব্যাগটা আমার হাত থেকে নিয়ে বসার সিটের পাশে রেখে আমাকে জিজ্ঞেস করে, আপনি কোথায় যাবেন, কথাটায় যেন আমার সমস্থ শরিরের উপর দিয়ে একটা হালকা হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করে, মনে হল এত সময়ে আমার ভিতরে বয়ে যাওয়া টর্নেডোর গতিবেগটা যেন হালকা হতে হতে চট্টগ্রাম উপকুল অতিক্রম করে উরিষ্যা নয় একেবারে যেন বেঙ্গালুরু পেরিয়ে চলে গেছে। নিজেকে নিজের মত করে ফিরে পেয়ে বললাম একটা চাকুরিতে জয়েন্ট করতে, নিজেকে স্বস্থির ভঙ্গিতে একটু মুচকি হাসির ভাবে নিজের উদ্দ্যেশ্যের সাথে মিলে যাওয়াতে অনেকটা উৎসাহি হয়ে জিজ্ঞাসা করে ,কোথায় চাকুরি করেন, না চাকুরি করিনা, নতুন জয়েন্ট করার উদ্দ্যেশ্যে যাচ্ছি। ও সরি, নিজেকে একটু হতবিহব্বল চিন্তা করে ঠিক সামলে নিয়ে আবার বললেন কোথায় জয়েন্ট করবেন? ভার্সিটিতে, ভার্সিটির নামটা না বললেও যেন জানা হয়ে গেছে, সেখানেতো ভার্সিটি যে একটাই, তাই নিজের উদ্দ্যেশ্যটা মনেহল যেন পুরুপুরিই মিলে গেল। আমিও তাই, যাক নতুন এবং অচেনা জায়গা,আপনাকেতো পাওয়া গেল, জি বলতেই আবার একটু অপ্রস্তুত ভাবেই বলে ফেললেন, না তাই না , মানে নতুন অচেনা জায়গাতো একজন পরিচিত লোক পাওয়াতে বেশ ভালই হল । আমি ‘পরিচিত’ বলতেই সে আবার একটু হতচকিত হয়ে নিজেকে গুরিয়ে নিয়ে বলে, এই দেখুন না- সব যেন একরকম মিলেও যাচ্ছে, আবার যেন সব এক বারে তাল গোল পেকে যাচ্ছে। এতক্ষন যেতে যেতে আর কথা বলতে বলতে উভয়ে উভকে অনেকটা পরিচিতের মতই করে নিল।
আমার নাম মীরা, না- মানে মীরা চৌধুরী, আ প না র, অর্থ্যাৎ আমার নাম জিজ্ঞাসা করার পুর্বেই থামিয়ে দিয়ে বললাম, ও তাই, আমি মারুপ খান। অল্পক্ষনেই মনে হল যেন দুজন যোযন যোযন মানে যুগ যুগের পরিচিত। বাদামওয়ালা থেকে বাদাম কিনে দুজনে বাদাম খেতে খেতে দুজনের ছোট কাল, শিক্ষাজীবন,পারিবারিক অবস্থান এবং দুজনের পছন্দ-অপছন্দের বিভিন্ন পর্ব আলাপ আলোচনা হয় এবং অনেকদুর এগিয়ে যাই। জানতে পারি সেও কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে যাইতেছে এবং জানলাম সেই একই শহরে অন্য একটা বিদেশী সংস্থায়, কথায় কথায় যানা গেল ও রাজশাহির মেয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্ব্যালয় থেকে একাউন্টিংএ মাস্টার্স ফাষ্টক্লাস সেকেন্ড, আমার দুই বছরের জুনিয়র বেছ, আর আমি জার্নালিজমে মাস্টার্সএবং একই রেজাল্ট। যেতে যেতে অনেক কথার ফাকে একটা লেখকের বিভিন্ন লেখা নিয়ে আলাপ করতে করতে আমার নামার গন্তব্য চলে আসে, সে পরের অর্থ্যাৎ লাষ্ট ষ্টেশনে নামবে। আমি নামার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে একটু হোঁচট খেয়ে পড়তে গিয়ে দেখি ওর হাতের মধ্যে থাকা পত্রিকার উদৃত্য লেখাটি আমার ছবিসহ ছিল । আমার নেমে যাওয়ার সময় নিজের কাগজগুলি গুছিয়ে নিতে গিয়ে ছবিটা সামনে পড়ে যাওয়াতে দেখেই বুঝেগেল এই সেই আমি, যার সাথে তার অনেক সময় কেটেগেল। কিন্তু ব্যাপারটা অনেকদুর গড়িয়ে যাওয়ার আগেই আমি একটা স্লিপ-পেডে আমার লিখা একটা কবিতার প্রথম স্তবক লিখে ভাঁজকরে পরে দেখতে বলে তার হাতে দিয়ে আমার চাকাওয়ালা লাল লাগেজটা নিয়ে নেমে ষ্টেশনের গেটের দিকে হাটতে শুরু করি। হুইসেল দিয়ে ট্রেনটাও আস্তে আস্তে সামনের দিকে আগাতে শুরু করে। এরই মাঝে আমার স্লিপে লেখাটা পড়ে নিয়ে নিজেকে নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে ট্রেনের জানালায় তাক করে থেকে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বিদায় জানায়…। আমিও মৃদু পায়ে তার দিকে এক দুবার তাক করে ষ্টেশনের গেট পেরিয়ে গন্তব্যের দিকে চলি, আর ভাবতে থাকি মনেহয় যেন আমার কন্ঠ আর তার কন্ঠে যেন একসাথে ধ্বনিত হতে থাকে…..
হেরিলে যাহারে তুমি, রাখিও স্মরণে তব হায়,
রাত কেটেও যদি ভোর হয়ে যায়।
আমার সাথে আবার কখনো যদি দেখা হয়,
উজানে না হয় ভাটির টানে হলে ও…
সূর্যোদয়ে… ভোরের শিশির ভেজা পায়…।

লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন, কবি ও সাহিত্যিক।

www.arthoniter30dinbd.com