
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘তুমি আমাকে একটা ভালো মা দাও, আমি তোমাকে একটা ভালো সন্তান উপহার দেবো।’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার ভাষায়Ñ ‘সৃষ্টির যা কিছু চির সুন্দর-কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছেন নারী আর অর্ধেক তার নর, কোনো কালে একা হয়নিকো জয় পুরুষের তরবারি, শক্তি দিয়েছে-প্রেরণা দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী। নারী সৃষ্টির ইতিহাসেরও একটা অংশ, ইসলামেও নারীর যথেষ্ট মর্জাদা দেয়া হয়েছে। প্রবাদে আছেÑ সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, গুণবান পতি যদি মিলে তার সনে। কথাগুলো খুবই মূল্যবান। নারী মাতা, নারী সুখ, নারী ভালোবাসা, নারীকে নিয়ে এমন অনেক সুন্দর সুন্দর গল্পগাথা, স্বপ্ন বাস্তবতা আছে, আর এই নারীই যখন সহিংসতার স্বীকার হয় বা নারী ও শিশুরা নিরাপত্তাহীনতার স্বীকার হয়, তার উত্তর কি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজের সচেতন ব্যক্তি পর্যন্ত কেউ দিতে পারবে? যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধানবিরোধী দলসহ দুই বিরোধীদলীয় নেতাও নারী, সে দেশের নারীর প্রতি এত অবহেলা, এত সহিংসতা, এত অমর্যাদা কেনÑ ভেবে দেখার বিষয়।
২০১৭ সালে বাংলাদেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা আশঙ্কাজনক হারে বিঘিœত হয়। অনেকের মতে, ২০১৭ সাল ছিল শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতার বছর। কারণ, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এ বছর যৌন হয়রানি, শিশু খুন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু নিরাপত্তাহীনতার অবস্থা ছিল একেবারেই নাজুক। শিশু ধর্ষণ, পিটিয়ে খুনের বেশ কিছু ঘটনা এ বছর আলোচনার জন্ম দেয়।
অতীতের যেকোনো বছরের চেয়ে এ বছর ধর্ষণের ঘটনা প্রচুর বেড়ে যায়। বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার জরিপে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৩৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। যেখানে ২০১৬ সালের ১২ মাসে এ সংখ্যা ছিল ১৪১ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২৮ জনকে। এর গণধর্ষণের শিকার হয় ১০১৭ জন। এটা নারী ও শিশুদের একা পথচলার জন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় হুমকিস্বরূপ।
আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে অভিজাত এলাকা বনানীর রেইনট্রি হোটেলে একটি জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনা, টাঙ্গাইলের মধুপুরে একটি চলন্ত বাসে বহুজাতিক কোম্পানির বিপণনকারীর এক তরুণীকে গণধর্ষণ ও পরে হত্যার ঘটনা ছিল মুখে মুখে। সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এসব অবস্থাকে নৈতিক অবক্ষয়ের পরিণতি বলে মনে করেন। অনেকে মনে করেন, সরকার যখন জবাবদিহিতার বাইরে এসে নিজের গদি রক্ষায় সচেষ্টা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিজেদের দায়িত্বের কথা ভুলে সরকারে অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত, তখনই সমাজে এমন অবক্ষয় ও বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
শিশুদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে চুরির অভিযোগে সাগর নামে এক শিশুকে গাছের সাথে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া অক্টোবরে নরসিংদীর শিবপুরে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে আজিজা নামে আরেক কিশোরীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মতে, শিশু কিশোরীদের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে বা অবমূল্যায়নের জায়গা থেকে নিজেদের বের করে না আনতে পারলে এবং পরিস্থিতি যদি আমাদের গ্রাস করে তাহলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
যেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শিশুর শিক্ষা ও নারীর মর্যাদার প্রতি অত্যধিক যতœবান, তার এই আদর্শ ও নারী উন্নয়নের কথা মনে রেখে দেশের প্রত্যেক নাগরিক নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ রেখে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নারী-পুরুষের মর্যাদার আসনকে মূল্যায়িত করবে, তবেই শিশু ও নারী সহিংসতা থাকবে না, সাথে সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সোচ্চার থাকবে এসব অপকর্ম ও অনিয়মের প্রতি, এটাই দেশপ্রেমিক প্রত্যেকটি মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক : উন্নয়নকর্মী











