শিক্ষা দিবস ও আমাদের অগ্রযাত্রা

কাজী ফারুক আহমেদ
বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, যা ওই বছর ১৭ সেপ্টেম্বর পরিণতি লাভ করে, বর্তমানে তা ছাপ্পান্ন বছরে পদার্পণ করেছে। দুঃখ হয়, শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের অনেক অর্জন সত্ত্বেও বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী দিনটি আজো জাতীয় শিক্ষা দিবসের স্বীকৃতি পায়নি। তার পরও শিক্ষা দিবসে শিক্ষা নিয়ে ভাবনা, প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আমার আজকের এ লেখা।
বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, গণমুখী শিক্ষা প্রসার, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য-বঞ্চনা নিরসন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে। তবে এর আশু বা প্রত্যক্ষ কারণ ছিল ১৯৬২ সালে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পাকিস্তানের পূর্ব অংশের জনগণ শিক্ষা, অর্থনীতি, সামরিক-বেসামরিক চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রে চরম বিমাতাসুলভ, বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসন, রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় নিষেধাজ্ঞা, নজরুলের কবিতার বিকৃতি, যেমন— ‘মহাশ্মশান’-এর পরিবর্তে ‘গোরস্থান’, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি’, এর পরিবর্তে ‘ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি সারাদিন যেন আমি নেক হয়ে চলি’ ইত্যাদি শিক্ষাবিদ সংস্কৃতিসেবীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। এ প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতিসেবী, শিল্পী, সাহিত্যিকদের গণজাগরণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয় বাঙালি অর্থনীতিবিদদের দুই অঞ্চলের জন্য ‘দুই অর্থনীতি তত্ত্ব’। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট। ছাত্রসমাজ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। প্রথমে আন্দোলন শুরু হয় ঢাকা কলেজ থেকে। তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি পাস কোর্স প্রবর্তনের বিরুদ্ধে ডিগ্রি ক্লাসের প্রতিবন্ধী ছাত্র এন. আই. চৌধুরী আন্দোলনের সূচনা করেন। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে অতিরিক্ত ইংরেজিকে বোঝা মনে করে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর পরীক্ষার্থীরাও এতে যুক্ত হয়। প্রথমে স্নাতক শ্রেণীর ছাত্রদের লাগাতার ধর্মঘট এবং উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর ছাত্রদের ইংরেজি ক্লাস বর্জনের মধ্যে আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল। জুলাই ধরে এভাবেই আন্দোলন চলে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ‘ডিগ্রি স্টুডেন্টস ফোরাম’ ‘ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ফোরাম’ নামে রূপান্তরিত হয়ে আন্দোলন পরিচালনা করে। এতে নেতৃত্ব দেন জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি আব্দুল্লাহ ওয়ারেস ইমাম, ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের সহসভাপতি মতিয়া চৌধুরী, কায়েদে আজম কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আরেফিন খান, তোলারাম কলেজের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজ বাগমার, ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক কাজী ফারুক আহমেদ। ‘তবে আন্দোলনের গুণগত পরির্তন ঘটে ১০ আগস্ট (১৯৬২)। এদিন বিকালে ঢাকা কলেজ ক্যান্টিনে স্নাতক ও উচ্চ মাধ্যমিক উভয় শ্রেণীর ছাত্রদের এক সমাবেশে। এতে সভাপতিত্ব করে ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কাজী ফারুক আহমেদ। সে তার বক্তৃতায় উপস্থিত ছাত্রদের এ কথা বোঝাতে সক্ষম হয় যে, শিক্ষার আন্দোলন ও গণতন্ত্রের আন্দোলন একসূত্রে গাঁথা। এ সভার পূর্ব পর্যন্ত ছাত্র সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনের কোনো যোগসূত্র ছিল না। কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করতেন, শুধু শিক্ষাসংক্রান্ত দাবিদাওয়া নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা অসম্ভব।’ (বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস: ড. মোহাম্মদ হাননান)
এখানে আরো কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ এক ঘোষণাবলে পূর্ব পাকিস্তানে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত সংসদগুলোকে বাতিল করে দেয়। বিক্ষুব্ধ ও সচেতন ছাত্রদের ঘাঁটি বলে পরিচিত অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। বিক্ষোভ সৃষ্টির ‘উসকানিদাতা’ বলে পরিচিত অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা করা হয়। ছাত্র সংগঠনগুলোর অফিসকক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে ছাত্র সংগঠনগুলো নতুন কৌশল অবলম্বন করে। সামরিক শাসনে প্রকাশ্যে ছাত্র সংগঠনের নামে রাজনীতি বা আন্দোলন পরিচালনা কিংবা নির্বাচনে অংশ নেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ায় ছাত্র আন্দোলন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
শিক্ষানীতি ১৯৭৪ থেকে ২০১০
বাষট্টিতে পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচক কার্যক্রমে রূপান্তরের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ‘শিক্ষার নানাবিধ অভাব ও ত্রুটি-বিচ্যুতি দূরীকরণ, শিক্ষার মাধ্যমে সুষ্ঠু জাতি গঠনের নির্দেশ দান এবং দেশকে আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান করার পথনির্দেশের উদ্দেশ্যে’ ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর কমিশনের উদ্বোধন করেন। ১৯৭৩ সালের ৮ জুন কমিশন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কাছে অন্তর্র্বতীকালীন রিপোর্ট পেশ করে। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ৩০ মে ১৯৭৪। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরাত-এ-খুদাকে সভাপতি করে গঠিত বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশনের ওই রিপোর্ট এখন পর্যন্ত শিক্ষাসংক্রান্ত সবচেয়ে বিশদ, পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য প্রতিবেদন। কিন্তু পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার নিষ্ঠুরভাবে হত্যার পর ক্ষমতাসীনরা ওই নীতি বাস্তবায়নের ধারেকাছে না গিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা সংস্কারের নামে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন প্রস্তাব ও কার্যক্রম গ্রহণে লিপ্ত হয়। সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে সামগ্রিকভাবে সমাধানে ব্রতী হওয়ার চেয়ে জোড়াতালি দেয়ার মানসিকতাই ছিল সেখানে প্রধান। এ সত্ত্বেও পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রতিটি শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবে কোনো না কোনোভাবে ড. কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের রিপোর্টের শব্দ, শব্দমালা, বাক্যাংশ যুক্ত হয়েছে। কারণ তা না করে উপায় ছিল না। তবে উদ্দেশ্য সাধু না হওয়ায় ওইসব উদ্যোগ শিক্ষা ক্ষেত্রে মৌলিক কোনো অবদান রাখতে পারেনি।
কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে গত পাঁচ দশকে, বিশেষ করে গত অর্ধদশকে শিক্ষা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অর্জন সম্ভব হয়েছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। ওই বছরের ৬ এপ্রিল জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদকে কো-চেয়ারম্যান করে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি করা হয় এবং এ কমিটি চার মাসের মধ্যে একটি খসড়া শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। এ দেশে এই প্রথম কোনো শিক্ষানীতি ঘোষণার পর তার বিরুদ্ধে কোনো মিছিল, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ হয়নি। এমনকি প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী, দুজন তাত্ত্বিক শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, শিক্ষানুরাগী বিভিন্ন স্তরের মানুষ অনুমোদিত শিক্ষানীতিকে স্বাগত জানান। তারা বলেন, শিক্ষানীতি মোটামুটি যুগোপযোগী ও আধুনিক। তবে এর বাস্তবায়ন কঠিন হবে। আমাদের দেশে এ ধরনের ঐকমত্যের উদাহরণ বিরল। প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি নবম জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনে আলোচিত হয়ে ২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন অর্জনের মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, ১৭ বছর আগে প্রণীত কারিকুলাম সংস্কার, সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি প্রবর্তন, শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে ক্লাস শুরু, পরীক্ষার ফল প্রকাশে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন, কারিগরি শিক্ষা সংস্কার, কোচিং বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ, অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অনুকূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষায় পশ্চাত্পদ অঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ইত্যাদি। সেই সঙ্গে ছাত্রী উপবৃত্তির পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে দরিদ্র ছাত্রদের জন্য উপবৃত্তি চালু, যুবশক্তিকে অধিক হারে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কোর্স চালু, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরের অনুরূপ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রেও জেন্ডারবৈষম্য হ্রাসের পদক্ষেপ গ্রহণ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তবে সৃজনশীল পদ্ধতি ব্যবহার, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে প্রকৃত অগ্রগতি নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অর্জন ও চ্যালেঞ্জ
শিক্ষা ও শিক্ষকদের ক্ষেত্রে অর্জনের বিভিন্নমুখীনতা মেনে নিয়েও বিরাজিত চ্যালেঞ্জগুলো বলা চলে মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে। যেমন— ১. শিক্ষায় প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প বরাদ্দ; ২. শিক্ষকতা পেশার প্রতি মেধাবীদের আকর্ষণহীনতা; ৩. মেধার অপচয় ও পাচার; ৪. আশঙ্কাজনক হারে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস; ৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় নানা অসঙ্গতি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি; ৬. শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে ফলপ্রসূ তদারকির অনুপস্থিতি, সমন্বয়হীনতা ও দুর্নীতি; ৭. অনুল্লেখযোগ্য অথবা নামমাত্র শিক্ষক প্রশিক্ষণ; ৮. পাঠদানে শিক্ষকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের অদক্ষতা; ৯. শিক্ষকদের একাংশের হাতে শিক্ষার্থীর শারীরিক শাস্তি, মানসিক নির্যাতন; ১০. শিক্ষকদের একাংশের নৈতিক অবক্ষয়; ১১. শিক্ষা আইন ২০১০ বাস্তবায়নে ধীরগতি; ১২. শিক্ষাক্রম/পাঠ্যসূচির সঙ্গে কর্মসংস্থান/শ্রমবাজারের সংস্রবহীনতা; ১৩. শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য পরিসংখ্যানে অসঙ্গতি; ১৪. শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক-প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সংযোগহীনতা; ১৫. শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার সর্বত্র স্বজনপ্রীতি ও দলীয়/কোটারি স্বার্থ রক্ষার প্রবণতা।
আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের সমান অথবা কিছুটা বেশি। এসডিজি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা সাধারণ শিক্ষার মতো কারিগরি শিক্ষায়ও ছেলেমেয়ে সমতার কথা বলেন। কিন্তু পরিসংখ্যনে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ কমেছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ শিক্ষাশুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল ২৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে এসে তা কমে দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ৯৫ শতাংশে। কর্মমুখী শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণের হার কমে যাওয়া টেকসই উন্নয়নের জন্য সহায়ক নয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে সৃজনশীল লেখাপড়া করানোর উদ্যোগ সত্ত্বেও শিক্ষকদের আগ্রহের অভাবে মূলত ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদান কার্যক্রম গতি পাচ্ছে না। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে যেসব সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— কনটেন্ট তৈরিতে ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে শিক্ষকদের পাঠদানে আগ্রহের অভাব, আইসিটি উপকরণাদি পরিচালনায় অদক্ষতা। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বলেছে, ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের সংখ্যা অপ্রতুল। আইসিটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। উপজেলা পর্যায়ে ইন্টারনেট সমস্যা, বিশেষ করে এর ধীরগতি, ভৌত অবকাঠামোগত ও ক্লাসরুম সংকটের কথাও উঠে এসেছে। আবার কারো কারো মতে, কনটেন্ট তৈরি ও মাল্টিমিডিয়ার ওপর দেয়া প্রশিক্ষণের মেয়াদ ছিল অপর্যাপ্ত। বহুল আলোচিত কোচিং বাণিজ্য নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সর্বশেষ খবরে জানা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর— মাউশির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা কোচিংবাজ শিক্ষকদের প্রশ্রয়দাতার ভূমিকা পালন করেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি স্কুলসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধান, প্রভাবশালী শিক্ষক, পরিচালনা কমিটির একশ্রেণীর সদস্যও কোচিংবাজ শিক্ষকদের সহায়তা করেন। বিশ্বখ্যাত পত্রিকা দি ইকোনমিস্টের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষায় পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এখানকার নীতিনির্ধারকরা জানেন না, শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোন খাতে কত শিক্ষার্থী প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকারের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা অনুসারে, এখানকার প্রধান গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো হলো— তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিজাত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাত, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ এবং তৈরি পোশাক খাত, পর্যটন ও পর্যটন সেবা, হালকা কারিগরি নির্মাণ খাত। কিন্তু এসব খাতের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত যথাযথ কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন (বিশেষায়িত ও সাধারণ) কর্মীর অভাব রয়েছে। এজন্য কী ধরনের দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষাক্রম তৈরি করা জরুরি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের পোশাক খাত বড় কিন্তু উচ্চশিক্ষায় এ খাতের কোনো গুরুত্ব নেই। একই কথা চামড়া খাত নিয়েও। পোশাক খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দেয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউজে বিদেশী কর্মীর সংখ্যা কয়েক হাজার, যারা প্রত্যেকে মোটা অংকের বেতন পান। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় পোশাক খাতের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরির বিষয়টি তেমনভাবে গুরুত্ব পায়নি কখনই।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে চারটি মোটাদাগের ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে তা হলো— বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের সাধারণ নির্বাচন। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কারণে দিনটি আমাকে ছাপ্পান্ন বছর আগের ঘটনাবহুল দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন পরাধীন দেশে আমরা একটি গণমুখী শিক্ষানীতির দাবিতে আন্দোলন করেছিলাম। এ কথা সত্য, মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক বাধা পার হয়ে আমরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষানীতি পেয়েছি। শিক্ষায় আমাদের অর্জনও কম নয়। এমডিজিতে সাফল্য উল্লেখযোগ্য। এসডিজি-৪ অর্জনে কাজ শুরু হলেও শিক্ষক, অভিভাবকদের অংশগ্রহণ এখনো সেভাবে উল্লেখ করার মতো নয়। শিক্ষায় অনেক অর্জনের পরও চ্যালেঞ্জের তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। সেজন্য শিক্ষাকে ভিত্তি করে সামনে এগিয়ে চলার অপরিহার্যতায় শিক্ষা দিবসের চেতনা, প্রেরণা ও নির্দেশনা দীর্ঘদিন আমাদের পথচলায় আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।
লেখক : অধ্যক্ষ : বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য