শিক্ষা খরচে দিশেহারা দেশের সীমিত আয়ের লোকজন

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
জীবন বাঁচাতে ঔষধ, জীবন সাজাতে প্রসাধনি আর জীবনমান ঊন্নত করতে শিক্ষা এটা চিরন্তন, যার কোন বিকল্প নেই। কারণ মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে শিক্ষা। সৃষ্টির ইতিহাস থেকেই মানুষ সভ্যতার দিকে ক্রমান্ময়ে এগিয়ে যাচ্ছে, এটা একটা চলমান ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষার কারনেই এটা সম্ভব। কথায় আছে, একজন শিক্ষিত নারী মানে একটা শিক্ষিত পরিবার এবং একজন শিক্ষিত পুরুষ মানে একটা সংস্কারকের পথ প্রদর্শক। যে দেশের জনগন বা যে জাতি যত শিক্ষিত সেই দেশ তথা সেই জাতি তত উন্নত। শিক্ষা মানুষের নৈতিক অধীকার, এই নৈতিক অধীকারকে মাথায় রেখে জাতিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, এবং সহজিকরন করা অত্যদিক জরুরি।
সন্তানদের শিক্ষায় ব্যয় করা বর্তমানে অনেকেই সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছেন। স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন, পরবর্তীতে নামকরা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চান্স পাওয়া, ভালো ক্যারিয়ারের অধিকারী হওয়ার সাথে এখন নিবিড়ভাবে জড়িত সন্তানের লেখাপড়ার পেছনে কে কতটা অর্থ ব্যয় করতে পারছে তার ওপর। বিশেষ করে রাজধানীতে এ বাস্তবতার অনেক নজির রয়েছে। সে কারণে শিক্ষায় ব্যয় নিয়ে অনেকের মধ্যে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। যাদের অর্থের অভাব নেই তারা সন্তানের লেখাপড়ার জন্য দু’হাতে টাকা খরচ করছেন। ছেলেমেয়ের লেখাপড়া নিয়ে সবচেয়ে বেশী ঝামেলায় পড়ছেন নির্দিষ্ট আয়ের লোকজন বা যাদের অর্থের প্রচুর্য্যতা নেই, তারাই।
সারাদেশে বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি সরকারি স্কুল ও কলেজ। যার কারণে প্রাইমারি থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকসহ সকল উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা মূলত পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি খাতে। যার জন্য সারা দেশের উপজেলা এবং জেলা শহরগুলি থেকে শুরু করে রাজধানীবাসীর সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য গুনতে হচ্ছে বিপুল অর্থ। স্বল্প আয়ের লোকজন তো আছেই মধ্যম আয়ের অনেক লোকজনও তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে রাখতে পারছেন না। বিশেষ করে যাদের একাধিক সন্তান লেখাপড়ায় আছে তাদের অবস্থা শোচনীয়। বাড়িভাড়ার পাশাপাশি তাদের আয়ের একটি বিশেষ অংশ চলে যাচ্ছে সন্তানদের লেখাপড়ার পেছনে। ফলে সংসারের অনেক প্রয়োজনীয় এমনকি চিকিৎসা সহ জরুরি খাতে তারা অর্থ ব্যয় করতে পারছেন না।
স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন, নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চান্স পাওয়া, ভালো ক্যারিয়ার তৈরী করার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত সন্তানের লেখাপড়ার জন্য কে কতটা অর্থ ব্যয় করতে পারেন তার উপর। বিশেষ করে রাজধানী সহ বিভাগীয় শহর গুলিতে এ বাস্তবতার অনেক উদাহরন আছে। যার কারণে শিক্ষায় ব্যয় করা নিয়ে অনেকের মধ্যে চলছে চরম প্রতিযোগিতা। যাদের অর্থের প্রাচুর্য্যতা বেশী তারা সন্তানের লেখাপড়ার জন্য দু’হাতে খরচ করছেন। প্রত্যেক বিষয়ে কোচিং ও প্রাইভেটসহ নানা খাতে খরচ করতে তারা সঙ্কোচ বোধ করেন না, বর্তমানে ভালো বিনিয়োগ হিসেবে মনে করেন অনেকেই। বাংলা মাধ্যমে এসএসসি পড়ুয়া এক সন্তানের কোচিং প্রাইভেটের পেছনে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা খরচ করছেন এমন অভিভাবকেরও অভাব নেই। তারা বাংলা এবং ধর্ম বিষয়েও কোচিং করাসহ অনেকে একাধিক কোচিংয়ে পড়াচ্ছেন, একাধিক প্রাইভেট টিউটর রাখছেন এমন নজিরও রয়েছে। সারা বছর কোচিং ও প্রাইভেটের সাথে যুক্ত থাকার কারণে অনেক ছেলে মেয়েও ভালো রেজাল্ট করছে।শিক্ষা খরচের এমন তীব্র প্রতিযোগিতায় সীমিত আয়ের লোকেদের করুন অবস্তা,। পর্যাপ্ত ব্যয় করতে না পারার কারনে স্বল্প এবং মধ্যম আয়ের পরিবারের মেধাবী ছেলেমেয়েরা আশানুরূপ ফলাফল করতে না পেরে পিছিয়ে পড়ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে হতাশা, কলহ থেকে শুরু করে,কোন কোন ক্ষেত্রে সন্তানদের হত্যা সহ পারিবারিক বিচ্ছেদের মত ঘটনাও ঘটছে।
কুমিল্লা এক সরকারি প্রতিষ্টানে চাকুরি করেন রহিম সাহেব (ছদ্ব নাম ব্যবহার করা হয়েছে) তিন সন্তানের জনক। একজন ৯বম শ্রেণীতে একজন ৭প্তম শ্রেণীতে ও ছোটজন দ্বিতীয় শ্রেণীতে। নভেম্বর মাস এলেই তার করুন অবস্তার শুরু হয় যা জানুয়ারির প্রায় ২০/২২ তারিখ পর্যন্ত থাকে কারণ নভেম্বর মাসে সকলের পরীক্ষার ফি এবং অন্যান্য খরচসহ ডিসেম্বর এর বেতন মিলিয়ে প্রতি জনের প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা করে এক সাথে জমা দিতে হয়, তাতেই শেষ নয় আবার ডিসেম্বরের শেষ অথবা জানুয়ারির প্রথমার্ধে প্রত্যেক ক্লাসে ভর্তি এবং সেশনচার্জ ও জানুয়ারির বেতন সহ প্রত্যেকের জন্য প্রায় সাড়ে নয় থেকে দশ হাজার টাকা করে পরিশোধ করতে গিয়ে রহিম সাহেবকে পারিবারিক চিকিৎসা ও খাওয়া-দাওয়া খরচ কমিয়ে অনেক টাকা ধারদেনা করতে হয়।। দেশের গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে জেলা শহর বিভাগিয় শহর সহ খোদ রাজধানীতে লক্ষ লক্ষ পরিবারের এমন বেহাল অবস্থা পরিলক্ষিত হয়।
আমাদের সময়ে আমরা প্রাইমারিতে একবার ভর্তি হয়েছি ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাইমারি লেভেল শেষ করেছি আবার ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছি এস এস সি পর্যন্ত শেষ করেছি তারপর কলেজে গিয়ে ভর্তিহয়ে ১ম বর্ষ থেকে পাশ করে ২য় বর্ষে যেতে সেশন চার্জ দিয়েছি কিন্তু বর্তমানে ১ম শ্রেনীতে ভর্তি হয়ে পাশ করার পর একই স্কুল হলেও আবার ২য় শ্রেণীতে ভর্তি হতে ভর্তি ফি ও সেশন চার্জ দিতে হয় এভাবে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি ক্লাসে ভর্তি ও সেশন চার্জ এবং প্রতি মাসে ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত বেতন দিতে দিতে অবিভাবকদের নাভিস্বাশ। স্কুল পরিবর্তন না করেও প্রতি বছর প্রতি ক্লসে ভর্তি ও সেশনচার্জ পরিশোধের এ আজব নীতিতে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধের উপক্রম এবং সেইসাথে পারিবারিক জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। তার উপর বছরের প্রথম দিকে বই খাতা পেন্সিল স্কুলব্যাগ ড্রেস জুতো-মোজা টিফিন ও যাতায়ত খরচ সহ একটা বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয় যা ক্রমান্ময়ে বেড়েই চলেছে, এটাকে সামাল দেওয়ার কোন উপায় নাই। শীক্ষা খাতের এসব রীতিনীতি ও বেহাল অবস্তাকে সূশীল সমাজের অনেকেই সরকারের উদসিনতা, দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতা দুর্নীতি এবং জবাব দিহীতার অভাব সহ শিক্ষা অবকাঠামো কে ভেঙ্গে দিয়ে জাতিকে ধ্বংশ করার পায়তারা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অবক্ষয় সেই সাথে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা দুর্নীতিবাজ ও অতি মুনাফালোভী শিক্ষকদের ক্লাসে না পড়িয়ে ফলাফল আটকে রেখে প্রাইভেট পড়তে বাধ্যকরাকে দায়ি বলে মনে করেন।
এদিকে দেশে করনা আক্রান্তের কারনে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধকরে দেওয়া হয়, যা দেশের চলমান শিক্ষার অগ্রগতির উপর আরেক বাধা হিসাবে প্রতিয়মান হয়। বহু উদ্যেগ উৎকণ্ঠার পর স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অনলাইন ক্লাসের দিকে ঝুকে পড়ে স্বল্প পরিসরে হলেও কোন রকমে শিক্ষা অবকাঠামোকে যাতে ঠিক রাখা যায়। কিন্তু শিক্ষা অবকাঠামো ঠিক রাখতে গিয়ে অনলাইন, ডিজিটাল বা ভার্সুয়্যাল যাই বলি না কেন, একেতো এসব পদ্ধতিতে আমরা পারদর্ষী নই তদপুরি আমাদের সকল শিক্ষার্থির এবং অবিভাবকগনের নিকট সকল ব্যায়ভার পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। যেখানে করনার বিস্তার রোধে লকডাউনে দেশের খেটে খাওয়া লোকের আয় উপার্জন প্রকার ভেধে শূন্য থেকে অর্ধেকে নেমে এসেছে এতাবস্থায় ভরন পোষন ও ঔষধপত্রের জোগান দেয়াই মুশকিল হয়ে দাড়িয়েছে, তার উপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলিতে সরাসরি ক্লাস না করিয়েও ভার্সূয়্যালি ক্লাস দেখিয়ে অবিভাবকদের নিকট চাপ প্রয়োগ করে বেতন আদায় করে নেয়া যেন মরার উপর খাঁড়ার গাঁ বলেও অনেকে মন্তব্য করেন
সময়ের গতিতে বিশ্বের বেশীরভাগ দেশ শিক্ষা সাংস্কৃতিতে এগিয়ে গেলেও বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। তারা আমাদের দেশীয় শিক্ষার মান কম এবং খরছ অনেক বেশী বলে মনে করেন। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা একজন শিক্ষা বান্ধব প্রধান মন্ত্রী হিসাবে বছরের প্রথমে সারা দেশের ১ম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বই উৎসব করে সকল ছাত্র ছাত্রিদের মধ্যে বিনামুল্যে বই বিতরন করেন যা একজন সন্তানের ভর্তি ও সেশন চার্জ সহ মোট খরচের তুলনায় খুবই নগন্য বলে অনেকের ধারণা। মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর ঘোষিত জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমকে মাথায় রেখে নীতিমালার মাধ্যমে মাসিক বেতন তিন থেকে পাঁচ শত টাকা এবং ভর্তি ফি ও সেশন চার্জ মিলিয়ে এক হাজার থেকে পনের শত টাকার মধ্যে ধার্য করে ভর্তুকির মাধ্যমে শিক্ষা সামগ্রির দাম ক্রয়সীমার মধ্যে রেখে ‘শিক্ষা সকল নাগরিকের নৈতিক অধীকার’কে সফল করার জন্য একটি উন্নত ও গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্তা চালু করবেন বলে দেশের সর্বস্তরের সকল নাগরিকের প্রত্যাশা।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।