ভারত বিভাগের প্রেক্ষাপট

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :

Zillur Rahaman
Zillur Rahaman

এশিয়া মহাদেশের একটা বিরাট অংশ নিয়ে গঠিত ও নির্ধারিত হয় ভারতবর্ষের সীমানা। সব রকমের প্রাকৃতিক অব¯’ান নিয়েই এই ভারতবর্ষ গঠিত। বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বৃটিশদের আদিপত্য অনেক সময় বিভিন্ন ভু-খন্ডের মানুষদের ব্যাক্তি স্বাধীনতা থেকে শুরুকরে রাষ্ট্রিয় সুযোগ সুবিদার উপর প্রভাব বিস্তার করার কারনে মানুষের ভিতর ক্রমান্ময়ে ব্যাক্তি স্বাধীনতা থেকে শুরুকরে রাষ্ট্রিয় স্বাধীনতার অনুভুতি তৈরি হতে থাকে যা পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিণত হয়। ভারত বিভাগের প্রেক্ষাপট বা ভারতবর্ষের দেশ বিভাগের মুলে হল ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক বিভাজন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ভারত ভেঙে হয় পাকিস্তান অধিরাজ্য ও ভারত অধিরাজ্য নামে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করা। পরবর্তীকালে পাকিস্তান আবার দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ভারত অধিরাজ্য পরবর্তীকালে ভারতীয় প্রজাতন্ত্র বা ভারত গণরাজ্য নামে পরিচিত হয়। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের ফলে ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ও পাঞ্জাব প্রদেশও দ্বিখণ্ডিত হয়। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভেঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য (ভারত) ও পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ (পাকিস্তান) গঠিত হয়। পাঞ্জাব প্রদেশ ভেঙে পাঞ্জাব প্রদেশ (পাকিস্তান) ও পাঞ্জাব রাজ্য (ভারত) গঠিত হয়। ভারত বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী, ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস ও অন্যান্য প্রশাসনিক কত্যৃক এবং রেলপথ ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় সম্পদ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্ত করে দেওয়া হয়।
এখানেই সবশেষ নয়, ভারত বিভাজনের অব্যবহিত পূর্বে পাঞ্জাব অঞ্চলে যে ধর্মীয় দাঙ্গা বেধেছিল, তাতে উভয় ধর্মের ২০০,০০০ থেকে ৫০০,০০০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। ইউএনএইচসিআর-এর হিসেব অনুসারে, ১ কোটি ৪০ লক্ষ হিন্দু, শিখ ও মুসলমান ভারত বিভাজনের ফলে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন এবং এর ফলে মানব ইতিহাসের সর্ববৃহত্তম দেশত্যাগের ঘটনাটি ঘটেছিল।
সিকিম,ভুটান, নেপাল ও মালদ্বীপ এই চারটি আধুনিক ভু-খন্ড দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রে ভারত বিভাজনের কোনো প্রভাব পড়েনি। নেপাল ও ভুটান ব্রিটিশদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রে’র মর্যাদা অর্জন করেছিল এবং তারা কখনই ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাই এই দুই রাষ্ট্রের নির্ধারিত সীমানা ভারত বিভাগের সময় স¤পূর্ণ অপরিবর্তিত থেকে যায় এবং মালদ্বীপ ১৮৮৭সালে ব্রিটিশ ক্রাউনের প্রোটেক্টোরেট মর্যাদা পায় এবং ১৯৬৫ সালে স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার পর এই রাষ্ট্রের পুর্ব নির্ধারিত সীমাও ভারত বিভাজনের সময় অপরিবর্তিত ছিল।
সিলোন (আধুনিক শ্রীলঙ্কা) ১৭৯৫ থেকে ১৭৯৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারপর এটি ভারত থেকে পৃথক হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি পৃথক ক্রাউন কলোনি ঘোষিত হয়। ১৮২৬-৮৬ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা ধীরে ধীরে বার্মা বা ব্রহ্মদেশকে (আধুনিক মায়ানমার) ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত ব্রহ্মদেশ ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় প্রশাসনের দ্বারা শাসিত অঞ্চল। তারপর থেকে ব্রহ্মদেশ (বার্মা) পৃথকভাবে শাসিত হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রহ্মদেশ এবং ওই বছরই ৪ ফেব্রুয়ারি সিলোন স্বাধীনতা পায়। পরবর্তিতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পাকিস্তান দ্বিধাবিভক্ত হয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। ভারত থেকে সিলোন ও ব্রহ্মদেশের বিভাগ বা পাকিস্তানের বিভাগ ভারত বিভাগের অন্তর্গত ছিলনা।
লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের কার্যকালে তৎকালীন ভাইসরয় ব্রিটিশ ভারতের বৃহত্তম প্রশাসনিক বিভাগ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে রাজনৈতিক ভাবে দ্বিখণ্ডিত করেন। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক এই বিভাজনের ফলে গঠিত হয় মুসলমান প্রধান পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ (আধুনিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র, ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ি বিভাগ) এবং হিন্দু-প্রধান বঙ্গপ্রদেশ (আধুনিক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রেসিডেন্সি ও বর্ধমান বিভাগ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা রাজ্য)। অনেকে মনে করেন কার্জনের বঙ্গভঙ্গ প্রশাসনিক দিক থেকে খুবই ফলপ্রসূ হলেও লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের সময় থেকে এই ধরনের প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বহুবার ভাবা হয়েছিল কিš‘ তা বাস্তবায়িত করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে এই ঘটনার যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যা অতীতে কখনো ঘটেনি। বাঙালি হিন্দু উ”চবিত্ত গোষ্ঠী বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করেন। বিরুধিতাকারী অনেকেই পূর্ববঙ্গের জমিদার ছিল এবং সেই জমিদারির প্রজারা ছিলেন মুসলমান কৃষক। সেসময় বাঙ্গালি হিন্দু মধ্যবিত্ত বা ভদ্রলোক সমাজও নবগঠিত বঙ্গপ্রদেশে বিহারি ও ওড়িষ্যাদের দিয়ে বাঙালিদের সংখ্যালঘু করে দেওয়ার জন্য বঙ্গভঙ্গের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁদের মতে রাজনৈতিক সক্রিয়তার জন্যই লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিলেও দুই-বারের কংগ্রেস সভাপতি সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্তে কার্জনের সিদ্ধান্তের বির“দ্ধে স্বদেশি আন্দোলন শুর“ হয়। ব্রিটিশ দ্রব্য বয়কট করার উদ্দেশ্য থাকলেও আন্দোলনকারীরা কখনও কখনও রাজনৈতিক সহিংসতার আশ্রয় নিতেন ফলে সাধারণ নাগরিকরা আক্রান্ত হতেন। সঠিক রাজনৈতিক কৌশল ও অদুরধর্ষীতার সহিংস আন্দোলন কার্যকরী হয়নি, ব্রিটিশরা সেগুলি প্রতিহত করেছিল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেগুলি ব্যর্থ হয়েছিল। সব ধরনের আন্দোলনের প্রধান শ্লোগান ছিল ‘বন্দেমাতরম’ এটি ছিল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি গানের শিরোনাম। কলকাতার ইংরেজি-শিক্ষিত ছাত্ররা যখন কলকাতা থেকে তাদের গ্রাম বা মফঃস্বলে যান, তখন আন্দোলন বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ‘বন্দেমাতরম্’ শ্লোগানটির ব¯‘ত ধর্মীয় উন্মাদনা ও বঙ্গভঙ্গের বির“দ্ধে রাজনৈতিক প্রতিবাদসহ দলের অধীনে যুবকদের একত্রিত করতে স্বক্ষম হয়। এঁরা সরকারি ভবনে বোমা বিস্ফোরণ, সশস্ত্র ডাকাতি, ও ব্রিটিশ অধিকারিকদের হত্যা করতে শুর“ করে। কলকাতা সাম্রাজ্যের রাজধানী হওয়ার কারনে এই রাজনৈতিক আন্দোলন ও ‘বন্দেমাতরম্’ শ্লোগানটি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত ও স্বীকৃত হয়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বিভিন্ন প্রশাসনিক মতপ্রার্থক্যের কারনে ব্রিটিশ ও মুসলমানদের অব¯’ানের ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। যার ফলে ১৮৭১ সালের জনগণনার পর থেকে পূর্ববঙ্গের মুসলমানেদের অব¯’ান ব্রিটিশদের কাছে আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছিল। তাছাড়া সিপাহি বিদ্রোহ ও দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ-মুসলমান বিরোধ তাঁর বিশেষ চিন্তার কারণ হয়েছিল। ১৮৭১ সালের জনগণনার পর থেকে উত্তর ভারতের মুসলমান নেতৃবর্গ নবগঠিত হিন্দু রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলির গণপ্রতিরোধের সম্মুখীন হওয়াসহ আর্যসমাজ শুধুমাত্র গোরক্ষাকারী গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থনই করেনি, বরং মুসলমানেদের হিন্দুধর্মে পুনরায় ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্যও আহ্বান জানিয়েছিল। ১৯০০ শতাব্দীর শেষভাগে যুক্তপ্রদেশে (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) রাজনৈতিক প্রতিনিধি সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে হিন্দুরা অধিক ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। সেই সময় হিন্দি-উর্দু বিতর্ক রাজনৈতিক মোড় নেয় যার কারনে ১৮৯৩ সালে গোহত্যা-বিরোধী দাঙ্গা বাধে। এবং মুসলমানেরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। ১৯০৫ সালে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক ও লালা লাজপত রাই কংগ্রেসে নেতা হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন এবং কংগ্রেসও কালীর প্রতীক তত্ত্বকে আন্দোলনের মুল বিষয় হিসাবে সামনে নিয়ে আসে, ফলে মুসলমানেদের ভিতরে ভয়ের সঞ্চার হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ‘বন্দেমাতরম্’ শ্লোগানটি বঙ্কিমচন্দ্রের যে আনন্দমঠ উপন্যাস থেকে গৃহীত হয়েছিল, সেই উপন্যাসের উপজীব্য ছিল পূর্বতন মুসলমান শাসনে শাসক কর্তৃক হিন্দু বিদ্রোহ ও হিন্দুদের অবদমন ।
বঙ্গভঙ্গের বির“দ্ধে হিন্দুদের সর্বব্যাপী প্রতিবাদ আন্দোলন এবং তার ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মধ্যে সংস্কারের ভয়ে ভারতের মুসলমান উ”চবিত্ত সম্প্রদায় ১৯০৬ সালে নতুন ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুসলমানেদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যব¯’ার দাবি জানায়। প্রাক্তন শাসক এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে তাদের সহযোগিতার নথি তুলে ধরে মুসলমান উ”চবিত্তেরা আইনসভায় তাঁদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানান। এরপরই ১৯০৬ সালের ৩০ডিসেম্বরে ঢাকায় অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ ¯’াপিত হয়। লর্ড কার্জন সেই সময় তাঁর সামরিক প্রধান লর্ড কিচেনারের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে প্রশাসন থেকে ইস্তফা দিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়েছিলেন। কিš‘ মুসলিম লীগ তাঁর বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনার সমর্থক ছিল। মুল বিষয় হল ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ ভারতের জনগণনায় সর্বপ্রথম ভারতের মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির কথা জানা গিয়েছিল, যার কারনে এরপর তিন দশক ধরে মুসলমান উ”চবিত্ত সম্প্রদায়ের যে অব¯’ান নির্ধারিত হয়েছিল সেই অব¯’ানই ছিল মুসলিম লিগের অব¯’ান (কার্জন পূর্ববঙ্গের মুসলমানেদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ¯’াপন করতে চেয়েছিলেন কিš‘ সে কৌশল কাজে লাগেনি)। মুসলমান উ”চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ শাহবাগে নিজের বাড়িতে মুসলিম লিগের প্রথম অধিবেশন ডেকেছিলেন। তিনি জানতেন, নবগঠিত প্রদেশে মুসলমানেরা সংখ্যাগুর“ এবং এতে মুসলমানেদের রাজনৈতিক ক্ষমতালাভের সুবিধাই হবে।
সর্বপরি বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের আলোচনা-সমালোচনা ও তথ্যের ভিত্ত্বিতে প্রমানিত হয় যে ক্ষমতার একক ব্যাবহার, ব্যাক্তি বা গোষ্টির মতামতের গুরুত্ব না দেয়া, রাজনৈতিক বিভেদ তৈরি করা, প্রশাসনিক অযোগ্যতা, সুবিদাবাদি গুষ্টির সাথে সমোজোতা করা, অদুরদর্ষী রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসহ উপরোক্ত কারণগুলি ভারত বিভাগে প্রেক্ষাপট অনেকটা সুগম করে দেয় যা বাস্তবে রূপ নেয়।
লেখক ঃ সম্পাদক প্রকাশক, অর্তনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।