বিডিং প্রাইসেই শেয়ার নিতে হবে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের

অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
দেশের পুঁজিবাজারে ছোট মূলধনি কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের জন্য একটি স্বতন্ত্র প্লাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এজন্য সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফার বাই স্মল ক্যাপিটাল কোম্পানিজ) রুলস ২০১৮ এর গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এ বাজার থেকে মূলধন উত্তোলনে অভিহিত মূল্যের জন্য ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতির অফার আর প্রিমিয়ামের জন্য বুক বিল্ডিং পদ্ধতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মূল বাজারে বিদ্যমান পদ্ধতির সঙ্গে উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো এখানে ক্রেতার ভূমিকায় শুধু যোগ্য বিনিয়োগকারীরা (কিউআই) থাকবেন। ফিক্সড প্রাইসের অফারে ইস্যু সাইজের চেয়ে বেশি টাকার আবেদন জমা পড়লে আবেদনের সমানুপাতে শেয়ার বরাদ্দ করা হবে। আর বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কিউআইরা যে দরে যে পরিমাণ শেয়ার কেনার জন্য বিড করবেন তাকে সে দরেই এ পরিমাণ শেয়ার কিনতে হবে।
বিএসইসির ও ডিএসইর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিউআইদের তারল্য ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে সেকেন্ডারি মার্কেটে এ প্লাটফর্মে থাকা কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণেরও সুযোগ দেয়া হবে। তবে এক্ষেত্রে ন্যূনতম লেনদেন সীমা ২ থেকে ৩ লাখ টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। অর্থাৎ সেকেন্ডারি মার্কেটে একজন বিনিয়োগকারীকে ন্যূনতম ২ থেকে ৩ লাখ টাকার শেয়ার কিনতে হবে।
রুলসে কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর বা কিউআই হিসেবে পাবলিক ইস্যু রুলস ২০১৫-এর ২(১)(ই) ধারায় এলিজিবল ইনভেস্টর বা ইআই হিসেবে যাদের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তাদের বোঝানো হয়েছে। তাছাড়া মার্কেট মেকার, যেকোনো তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের ইস্যুয়ার, নিবাসী ও অনিবাসী বাংলাদেশী ব্যক্তি, যাদের ন্যূনতম ১ কোটি টাকার নিট সম্পদ রয়েছে এবং কমিশন অনুমোদিত যেকোনো শ্রেণীর ব্যক্তিও কিউআই হিসেবে বিবেচিত হবেন।
ছোট মূলধনি কোম্পানি বলতে বোঝানো হয়েছে এমন ধরনের পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, যাদের পরিশোধিত মূলধন কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে মূলধন বাড়ানোর পর ৫ কোটি টাকার বেশি ও ৩০ কোটি টাকার কম হবে।
মূল মার্কেটের মতোই ফিক্সড প্রাইস ও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ছোট মূলধনি কোম্পানির তালিকাভুক্তি করা হবে। এক্ষেত্রে দুই পদ্ধতিতেই তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানিকে হিসাবমান অনুসরণ করে আর্থিক বিবরণী তৈরি করতে হবে। পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্টের মাধ্যমে কস্ট অডিট করতে হবে। বিএসইসির প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষকদের মাধ্যমে নিরীক্ষা করাতে হবে। ওই আইনের সব বিধিবিধান পরিপালন করতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পদ ভ্যালুয়েশনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে। কোম্পানি ও এর কোনো পরিচালক ঋণখেলাপি হতে পারবে না। নিয়মিত এজিএম করতে হবে। প্রিমিয়ামসহ তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ধারাবাহিক দুই বছর নিট মুনাফায় থাকতে হবে।
ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানির মূলধন বাড়ানোর পর ন্যূনতম ৫ কোটি টাকা হতে হবে। এ পদ্ধতিতে ন্যূনতম ৫০ শতাংশ শেয়ার আন্ডাররাইটিং করা থাকতে হবে। ফিক্সড প্রাইসে সাবস্ক্রিপশন প্রক্রিয়া এক্সচেঞ্জের সমন্বিত অটোমেটেড সিস্টেমের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। ঘড়ির কাঁটা অনুসারে টানা ১২০ ঘণ্টা সাবস্ক্রিপশন চলবে। একজন কিউআই মোট ইস্যুকৃত সিকিউরিটিজের ১০ শতাংশের বেশি কেনার আবেদন করতে পারবে না। সাবস্ক্রিপশন শেষে, একেকজন কিউআই যে পরিমাণ শেয়ার কেনার জন্য আবেদন করেছেন তাদের আনুপাতিক হারে শেয়ার বরাদ্দ দেয়া হবে।
মূল মার্কেটে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যেমন প্রথমে রোড শো করতে হয়, একইভাবে ছোট মূলধনি কোম্পানির ক্ষেত্রেও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে রোড শোর আদলে ওয়েব শো করতে হবে। ওয়েব শো হচ্ছে অনলাইনে ইলেকট্রনিক প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে ইস্যুয়ার ও ইস্যু ম্যানেজার কর্তৃক কোম্পানিটির সার্বিক অবস্থা কিউআইদের কাছে তুলে ধরার পদ্ধতি। এতে অনলাইনে ইস্যু সম্পর্কে আলোচনা, মন্তব্য ও প্রশ্ন করার সুযোগ থাকবে।
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানির ন্যূনতম ১০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন থাকতে হবে। বিএসইসির নিবন্ধিত ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোম্পানির ক্রেডিট রেটিং করতে হবে। এক্ষেত্রে ইস্যুর ৫০ শতাংশ আন্ডাররাইটিং করতে হবে। ওয়েব শো শেষ হওয়ার পর কিউআইদের মন্তব্য ও পর্যবেক্ষণ ও শেয়ারের ভ্যালুয়েশনসহ কোম্পানিকে রেড হেরিং প্রসপেক্টাস চূড়ান্ত করতে হবে। এ পদ্ধতিতেও এক্সচেঞ্জের সমন্বিত অটোমেটেড সিস্টেমের মাধ্যমে ঘড়ির কাঁটা অনুসারে টানা ১২০ ঘণ্টা সাবস্ক্রিপশন চলবে। ফিক্সড প্রাইসের মতোই এক্ষেত্রে একজন কিউআই মোট ইস্যুকৃত সিকিউরিটিজের ১০ শতাংশের বেশি কেনার জন্য আবেদন করতে পারবেন না। ইস্যুয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন কোনো ব্যক্তি বিডিংয়ে অংশ নিতে পারবেন না। বিডিং চলাকালে বিডার একটি মাত্র বিডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ার কেনার আবেদন করতে পারবে। তবে ২০ শতাংশ ব্যবধানে একবার দর সমন্বয় করার সুযোগ থাকবে। বিডিং শেষ হওয়ার পর যদি দেখা যায় যে আন্ডার সাবস্ক্রিপশন হয়েছে তাহলে সর্বনিম্ন বিডিং প্রাইসের নিকটবর্তী পূর্ণ সংখ্যাকে কাট অফ প্রাইস (প্রান্তসীমা) নির্ধারণ করা হবে।
এক্ষেত্রে যদি কিউআইও প্রক্রিয়ায় কোনো ইস্যুর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আন্ডার সাবস্ক্রিপশন হয় তাহলে আন-সাবস্ক্রাইব থাকা অংশ কাট অফ প্রাইসে আন্ডাররাইটারকে কিনে নিতে হবে। এক্ষেত্রে সাবস্ক্রিপশন শেষ হওয়ার ১০ দিনের মধ্যে ইস্যুয়ার আন্ডাররাইটারকে শেয়ার কেনার জন্য নোটিস দেবে। আর এ নোটিস দেয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই আন্ডাররাইটারকে তা কিনে নিতে হবে। অন্যদিকে যদি ৫০ শতাংশের বেশি আন্ডার সাবস্ক্রিপশন হয় তাহলে ইস্যুটির ইনিশিয়াল কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফার বাতিল হয়ে যাবে।
যেসব কিউআই শেয়ার কেনার জন্য আবেদন করেছেন তাদের নিজেদের বিড করা দরে যে পরিমাণ শেয়ার কেনার আবেদন করা হয়েছে সে দরে সেই পরিমাণ শেয়ার নিতে হবে। বিডিং প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ শেয়ার ইস্যু করা হবে, সেটি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দর হাঁকানো বিডারদের মধ্যে ক্রমান্বয়ে শেয়ার ইস্যু করা হবে। বাকিরা কোনো শেয়ার পাবেন না।
ইস্যু ম্যানেজমেন্ট ফি ফিক্সড প্রাইসের জন্য সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা ও বুক বিল্ডিংয়ের জন্য ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া যে পরিমাণ আন্ডাররাইটিং করা হয়েছে এর শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ আন্ডাররাইটিং ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশনে আবেদন ফি ৫ হাজার টাকা (অ-ফেরতযোগ্য), কনসেন্ট ফি ১০ হাজার টাকা, লিস্টিং ফি ও অন্যান্য ফি (স্মল ক্যাপিটাল কোম্পানির লিস্টিং রেগুলেশনস অনুযায়ী) নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইস্যুয়ারের সব সাধারণ শেয়ার কনসেন্ট পাওয়ার সময় থেকে এক বছরের জন্য লক-ইন থাকবে। অন্যান্য ধরনের শেয়ারকে সাধারণ শেয়ারে রূপান্তর করা হলে সেক্ষেত্রেও এক বছর লক-ইন থাকবে।
ছোট মূলধনি কোম্পানির প্লাটফর্মে থাকা কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন যদি ৩০ কোটি কিংবা তার বেশি হয়ে যায় তাহলে তাকে অতিসত্বর এ বিষয়ে কমিশন ও এক্সচেঞ্জকে জানাতে হবে। আর দুই বছরের মধ্যে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে মূল মার্কেটে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে হবে।
যদি ইস্যুয়ার কিংবা অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এ আইনের কোনো বিধান ভঙ্গ করে কিংবা মিথ্যা, অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রদান করে কিংবা তথ্য গোপন করে তাহলে কমিশন তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। এ আইনের কোনো বিষয়ে যেকোনো ধরনের দ্বিধা কিংবা মতদ্বৈধতা দেখা দিলে এক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।