অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের পর পুঁজিবাজার নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য একটি গ্রুপকে দায়িত্ব দিতে চান বলেও জানান তিনি। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অর্থসংস্থান’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। তিনটি সেশনে বৈশ্বিক ও বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বাজার সম্প্রসারণ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উৎসাহিতকরণ, করপোরেট বন্ড, ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড ও হাউজিং বন্ড নিয়ে মোট চারটি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, পাকিস্তান আমলে পঞ্চাশের দশক থেকেই আমাদের পুঁজিবাজারের গোড়াপত্তন হলেও দীর্ঘদির এর কোনো উন্নয়ন হয়নি। কারণ আমরা তখন স্বাধীন ছিলাম না। ১৯৮৮ সালের পর পুঁজিবাজারের উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গত সাত বছরে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে অনেক কাজ করেছে। সামনে বাজারকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে পুঁজিবাজারের গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের এখানে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক। কিন্তু এটি তাদের কাজ না। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বেড়ে গেছে। তাই পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়নের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আগামী বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উৎস হিসেবে একটি গতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হবে। এজন্য বাজেটে নীতিসহায়তাও রাখা হবে।
পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেটের পরে একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে। এজন্য পুঁজিবাজারের একটি গ্রুপের সঙ্গে বসে বাজার ঠিক রাখার দায়িত্ব দেয়া হবে।
স্বাগত বক্তব্যে বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, আমাদের পুঁজিবাজারের মূল সমস্যা হচ্ছে এটি এখনো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর বাজার। তারা এখনো গুজবের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে লোকসানের মুখে পড়ছে। এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীদের শিক্ষিত করে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে পুঁজিবাজারের গুরুত্ব তুলে ধরে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, জিডিপিতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অবদান মাত্র ২০ শতাংশ। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এটি অনেক বেশি। অর্থনীতির উন্নয়নে এ অবদান আরো বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে এক্ষেত্রে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গতিশীল বন্ড মার্কেটের জন্য প্রণোদনা দেয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি চিমিয়াও ফান বলেন, বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করছে। তবে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে না পারাটা দুঃখজনক। ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে বাংলাদেশকে এফডিআই (প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ) ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রক্রিয়া সহজ করার পরামর্শ দেন তিনি।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. ইউনূসুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশের আর্থিক খাতে ব্যাংকের একক প্রাধান্য রয়েছে। ব্যাংকের ৯০ শতাংশ আমানতই হচ্ছে স্বল্পমেয়াদি। এ কারণে ব্যাংকগুলো পাঁচ-ছয় বছরের বেশি মেয়াদে অর্থায়ন করতে পারে না। তাই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগাতে হবে। বিএসইসি বিভিন্ন আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি বর্তমানে বাজারের গভীরতা বাড়াতে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূইয়া বলেন, ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। আর কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পায়ন করা প্রয়োজন। বন্ডের মতো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উেসর বিষয়ে অনেক আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই করা হয়নি। অতীতে বিচ্ছিন্নভাবে রেগুলেটরি সংস্কারের মাধ্যমে সুফল পাওয়া যায়নি। তাই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য রেগুলেটরি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় ধরনের সংস্কার করা আবশ্যক। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের জন্য কর প্রণোদনার পাশাপাশি সমন্বিতভাবে আর্থিক ও মুদ্রানীতির পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীর বলেন, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশ বিদ্যমান অনেক সুবিধা পাবে না। এজন্য সামনের সময়গুলো যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হবে। পুঁজিবাজারে প্রাইভেট ইকুইটি, ডেট ইকুইটি ও ডেরিভেটিভস প্রচলনে আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে। বন্ডের মাধ্যমে অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়নে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এজন্য বন্ড মার্কেটের উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত আছে বলেও জানান তিনি।
আইএফসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার ওয়েন্ডি জো ওয়ের্নার বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বাজার তৈরি করা প্রয়োজন। আমরা বাংলাদেশে আইএফসির সব ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে আগ্রহী। সম্প্রতি কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে ডিএসইর সঙ্গে চীনা কনসোর্টিয়ামের চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা লিয়ান্দ্রো পুচ্চিনি সেকুনহো, রিভারস্টোন ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশরাফ আহমেদ, বিশ্বব্যাংকের প্রধান আর্থিক বিশেষজ্ঞ ফিওনা এলিজাবেথ স্টুয়ার্ট ও আইএফসির আর্থিক কর্মকর্তা শ্রেয় কোহলি। সেশন চেয়ার হিসেবে ছিলেন আইডিএলসির এমডি আরিফ খান ও পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। আর আলোচক ছিলেন বিএসইসির কমিশনার ড. স্বপন কুমার বালা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের এমডি মোহাম্মদ এনামুল হক, ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের এমডি ওয়াকার এ চৌধুরী, বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ আহমেদ, এশিয়ার টাইগার ক্যাপিটাল পার্টনার্সের চেয়ারম্যান মো. মিনহাজ জিয়া, মেঘনা ব্যাংকের এমডি আদিল ইসলাম ও আইএফসির সিনিয়র ইনভেস্টমেন্ট অফিসার এহসানুল আজিম।










