নিজস্ব ক্যাম্পাসে না গিয়ে ভাড়া ভবনে চলছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও এ আইন মানছে না বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। অন্যদিকে ইউজিসির চাপে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তুললেও, সেখানে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করছে না। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক কার্যক্রম চলছে বছরের পর বছর।
বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা দেশের শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দক্ষ শিক্ষকদের গুণগত পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থী আকর্ষণে সাফল্য পেয়েছে ব্র্যাক। যদিও আইনে বেঁধে দেয়া সময়ে স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম স্থানান্তরে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বছরের পর বছর ভাড়া করা ভবনে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা।
২০০১ সালে সরকারের অনুমোদন নিয়ে ‘৬৬, মহাখালী’ ঠিকানায় সাময়িকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। আইন অনুযায়ী, সাময়িক অনুমতিপত্রের মেয়াদ অর্থাৎ সাত বছরের মধ্যে নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা। কিন্তু এখনো তা করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। মহাখালীতে বর্তমানে আটটি ভবন ভাড়া নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) বলছে, স্থায়ী ক্যাম্পাসে না গিয়ে এভাবে ভবন ভাড়া করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
এ বিষয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, একটি ভবন ভাড়া করে সেখানে শিক্ষকদের দিয়ে পাঠদান করালেই সেটিকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যাবে না। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ নির্দিষ্ট সময়ে স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়া দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কেই নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে দফায় দফায় চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় অংশই তা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। অনেকটা কোচিং সেন্টারের মতোই ভবন ভাড়া করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা। তাদের উচিত নিজস্ব ক্যাম্পাসে গিয়ে মনোরম পরিবেশে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। আর স্থায়ী ক্যাম্পাসে না গিয়ে কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই ভাড়া ভবন বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তরে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি ব্র্যাক। প্রতিষ্ঠার সময় অনুযায়ী ২০০৮ সালের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা তাদের। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাসে ভবন নির্মাণকাজই শুরু হয়েছে ২০১৮ সালে। অর্থাৎ স্থানান্তরের সময়সীমা পার হওয়ার এক দশক পর ভবন নির্মাণ শুরু করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থী সংকুলান না হওয়ায় ভাড়া ভবন বাড়িয়েই চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। সর্বশেষ চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৮ নম্বর ভবন চালু করেছে ব্র্যাক।
ইউজিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘৯২-এর আইনে শিক্ষা কার্যক্রমের পরিধি বাড়লে অবকাঠামো সম্প্রসারণের সুযোগ ছিল। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ এই ধরনের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘সাময়িক অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পরিধি সুনির্দিষ্ট ও সীমিত থাকবে। এর বাইরে কোনো ক্যাম্পাস বা শাখা স্থাপন কিংবা পরিচালনার সুযোগ নেই।’ সুতরাং এ ঠিকানার বাইরে কোনো ভবন ভাড়া করলে সেটি বৈধ হবে না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ৬ দশমিক ২৯ একর জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে স্থায়ী ক্যাম্পাস। ১৭ লাখ বর্গফুটের এ ভবন হবে দেশের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় ভবন। চীন ও বাংলাদেশের দুটি বিখ্যাত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে ক্যাম্পাস নির্মাণের ভার দেয়া হয়েছে। নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে ন্যূনতম আরো দুই বছর প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি নিউ ক্যাম্পাস প্রজেক্টের পরিচালক এএসএম রশিদুল হাই।


তিনি বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে অনুমোদন নিতেই আমাদের তিন বছর সময় লেগে গেছে। এরপর জমির মাটি নিয়ে বেশ জটিলতায় পড়তে হয় আমাদের। এসব সমস্যাতেই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ শুরু করা যায়নি। চীনা একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করা হচ্ছে। তারা খুবই দ্রুত কাজ করছে। এটি হবে দেশের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় ভবন। আশা করছি, আগামী বছরের শেষ নাগাদ আমাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসের কাজ শেষ হবে।’
এদিকে শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ভবন ভাড়া করেও শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছে না ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। সম্প্রতি মহাখালীর অস্থায়ী ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা হলে তারা বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তাদের কেউই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ নম্বর ভবন থেকে ক্লাস করে বের হচ্ছিলেন বিবিএর এক শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সুনামের কারণেই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। তবে ভর্তি হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। শুরুতেই বলি কোর্সের কথা। ক্যাপাসিটির তুলনায় শিক্ষার্থী বেশি নেয়ার ফলে যেসব কোর্স বেশি শিক্ষার্থী পড়তে চায়, সেগুলো শেষ হয়ে যায়। সকালবেলা ক্লাস আওয়ারে লিফটের সামনে লম্বা লাইন থাকে। অনেক সময় ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ভবনে তিনটি লিফট থাকলেও শিক্ষার্থী সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এ সমস্যা দেখা দেয়। সব মিলিয়ে বলব, সমস্যার শেষ নেই।’
ইংরেজি বিভাগের এক ছাত্রী বলেন, রাস্তার পাশে কয়েকটি ভবনে ক্লাস-পরীক্ষা আর ল্যাব। এটি কোনো ইউনিভার্সিটি হতে পারে না। ক্লাস করে বের হলেই রাস্তা। সারাক্ষণ শিক্ষার্থীদের জটলা। এতটাই ঘিঞ্জি যে শিক্ষার্থীদের পরিচালিত বিভিন্ন ক্লাবকে রুম পর্যন্ত বরাদ্দ দিতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাফেটেরিয়ায় বসে ক্লাবের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।
ল্যাব সমস্যার কথাও উঠে আসে শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে। সিএসই প্রগ্রামের এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, ইউনিভার্সিটি হিসেবে ব্র্যাক ভালো। কিন্তু এখন ব্র্যাক ওভারলোডেড। অনেক সময় ল্যাবে গিয়েও ফাঁকা পাওয়া যায় না।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, শিক্ষার্থীদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. ফয়জুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে ব্র্যাক। আমাদের এখানে পর্যাপ্তসংখ্যক ল্যাব রয়েছে। যে সংখ্যক ল্যাব রয়েছে একই সময় প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর জায়গা সংকুলান হবে। এছাড়া কোর্সের বিষয়ে যে অভিযোগ, সেটি সমাধানযোগ্য। কেননা এক সেমিস্টারে কোনো কোর্স না পেলে সেটি পরের সেমিস্টারে নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে ব্র্যাকে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ৯ হাজার ৮৩৯ জন। এর মধ্যে স্নাতক পর্যায়ে ৮ হাজার ৭৬৪ ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ১ হাজার ৭৫ জন। শিক্ষক রয়েছেন ৫৯৩ জন। এর মধ্যে খণ্ডকালীন শিক্ষক রয়েছেন ১১৬ জন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে প্রগ্রাম রয়েছে ৩১টি।
সূত্র : বণিক বার্তা