অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
জনগণের অর্থে পরিচালিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যয়িত সমুদয় অর্থ সরকারই বহন করবে— এটাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চরিত্র। তবে কয়েক বছর ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণ থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে সরকার। এজন্য প্রতি বছরই নিজস্ব উৎস থেকে আয় বাড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি চাপ অব্যাহত রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব আয় বাবদ বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে ইউজিসি।
বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগের তুলনায় এবারের বাজেটে নিজস্ব খাত থেকে অনেক বেশি অর্থ আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেটি পূরণ করতে গেলে শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি বাড়াতে হবে, যা মোটেও সহজ নয়। একদিকে নিজস্ব খাত থেকে বেশি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেখিয়ে কম বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার, অন্যদিকে বেতন-ফি বাড়াতে গেলে আন্দোলনে নামতে পারেন শিক্ষার্থীরা— এ অবস্থায় নিজস্ব আয় বাড়ানো নিয়ে বেশ চাপে রয়েছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কয়েক বছর ধরেই নিজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চাপ দেয়া হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বনির্ভর হতে হবে। আমার কথা হচ্ছে, সরকারের আয়ের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তো কখনো আয়ের প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দরিদ্র, হতদরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের যেসব ছেলে-মেয়ে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে, বেতন-ফি বাড়ালে সেটি তাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কারো কারো ক্ষেত্রে পড়াশোনা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
দেশের সবচেয়ে প্রাচীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব আয় ধরা হয়েছিল ৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নিজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৭১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক অর্থবছরের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব আয় বাবদ লক্ষ্য ২৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেট বইয়ে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ছাত্রদের কাছ থেকে বেতন, ভর্তি ও সেশন ফি, হল বা হোস্টেল, ইনস্টিটিউট ও বিভাগ, পরিবহন খাত, ভর্তির ফরম বিক্রি ও অধিভুক্ত সাত কলেজ থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছাত্রদের কাছ থেকে বেতন, ভর্তি ও সেশন ফি বাবদ আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা আগামী অর্থবছরে বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে হল বা হোস্টেল থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ লাখ টাকা। আগামী অর্থবছরে এ খাত থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছর ইনস্টিটিউট ও বিভাগ থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৬ লাখ টাকা, যা আগামী অর্থবছরে ধরা হয়েছে ৯৫ লাখ টাকা। এছাড়া পরিবহন খাত থেকে নিজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ১০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছর ভর্তির ফরম বিক্রি থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ কোটি টাকা, যা আগামী অর্থবছরে ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর বাইরে চলতি অর্থবছরে সাত কলেজ থেকে আয় বাবদ ১৫ কোটি টাকা ধরা হলেও আগামী অর্থবছরে এ খাত থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২২ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা বলেন, নিজস্ব আয় বাবদ যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি অর্জন সম্ভব নয়। বাজেট-বিষয়ক সভায় আমরা ইউজিসিকে বারবার বলেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়, নিজস্ব উৎস থেকে এত টাকা আয় অসম্ভব। এর পরও তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর এত টাকা চাপিয়ে দিয়েছে। তারা বেতন-ফি বাড়ানোর কথা বলেছে। বেতন-ফি বাড়ালে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে তার দায়ভার কে নেবে?
একই কথা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানও। তার ভাষায়, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কোনো দোকান কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়; এখান থেকে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আয় করার কোনো বিষয় নেই। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও সংবিধির মাধ্যমে কয়েকটি খাত থেকে কিছু অর্থ আয় হয়। এর বাইরে অতিরিক্ত আয় করার কোনো সুযোগ নেই। এখানে সরকারের বিনিয়োগ আরো বাড়ানো উচিত।’
নিজস্ব আয় বৃদ্ধির চাপে রয়েছে অপেক্ষাকৃত নতুন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ও। নিজস্ব আয় বাবদ বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রকৃত আয়ের পরিমাণ ৫ কোটি ১ লাখ টাকা। যদিও আগামী অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব আয় বাবদ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত আয়ের মধ্যে বড় তফাতের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য ইউজিসিকে চিঠিও দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
এ প্রসঙ্গে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, আমাদের প্রকৃত আয়ের চেয়ে অনেক বেশি লক্ষ্য ধরে বাজেট দেয়া হয়েছে। এত টাকা আয় করা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অসম্ভব। তাই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আমরা ইউজিসিকে চিঠি দিয়েছি।
নিজস্ব আয় বাড়ানোর চাপে থাকা আরেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব আয় বাবদ ১০ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। আগামী অর্থবছরে সেটি নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক অর্থবছরের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজস্ব উৎস থেকে অতিরিক্ত আড়াই কোটি টাকা আয়ের চাপে পড়েছে।
এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব শাখার পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আকাম উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, এ বছর ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আয় নির্ধারণ করে দিয়েছে সাড়ে ১২ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় বেশি। অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন খাতে ফি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা থেকে আয়ের ৪০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ আয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যা আগে ছিল ২৪ শতাংশ।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসাইন বলেন, বাজেটে নিজস্ব আয়ে বেশি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সেটি অর্জন করতেই হবে, বিষয়টি সে রকম নয়। যদি সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে সংশোধিত বাজেটে সেটি কমিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে।












