
বায়েজীদ মুজতবা সিদ্দিকী
নন-লাইফ বীমা সেক্টরে চলমান অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধের লক্ষ্যে এবং এই সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ আইডিআরএ- এর জারীকৃত সার্কুলার- নন-লাইফ- ৬১ থেকে ৬৪/২০১৯ এবং ৬৫/২০১৯ এর বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে বিআইএও বিআইএফ এর গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হয়েছে। জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত বিআইএ প্রেসিডেন্ট এর বিজ্ঞপ্তি বীমা সেক্টরে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আগামী ১৮ই জুলাই ’১৯ আইডিআরএ এর চেয়ারম্যান মহোদয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্টিত হবে সকল নন-লাইফের চেয়ারম্যান ও মূখ্য নির্বাহীদের সাথে অতি গুরুত্বপূর্ণ সভা। বাস্তব সম্মত সকল উদ্দোগের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
আমাদের বিশ^াস কর্তৃপক্ষ যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন যা নন-লাইফ বীমা সেক্টরে চলমান অনিয়মের ৮০% পথ এমনিতেই বন্ধ হবে। তবে যে ২০% বাকী থাকবে সেটা হলো নন লাইফের জন্য কেন্সার। সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রন করলে কেন্সার সেল বাড়তে পাড়বেনা। বর্তমানে নন-লাইফের কেন্সার সেলের নাম হলো বীমা এজেন্ট। নন -লাইফের এজেন্টদের আইডিআরএ ইস্যুকৃত লাইসেন্সটাই শুধু বৈধ, এর আগের এবং পরের অনেক কিছুই নিবির পর্যবেক্ষনের প্রয়োজন রয়েছে।
১. যতটুকু জেনেছি বর্তমানে নন-লাইফে কোন পেশাদার এজেন্ট নাই। এবিষয়ে আইডিআরএ কর্তৃক বীমা এজেন্ট নিয়োগ ও নিবন্ধন প্রবিধানমালা-২০১৮ খসরায় যে শর্তাবলী রয়েছে যার মাধ্যমে নন-লাইফে পেশাদার এজেন্ট সৃষ্টি হবে আশা করা যায়। নন লাইফ বীমা পেশাকে জনপ্রিয় করতে হলে পেশাদার এজেন্ট সৃষ্টি করতে হবে। আসলে নন লাইফের এজেন্ট কারা? প্রতিটি এজেন্ট হলেন বীমা কর্মীদের নিজস্ব লোক। কারো স্ত্রী, কারো স্বামী, কারো মেয়ে, কারো ছেলে, কারো খালা, কারো শালা বা অন্য কোনো বিশ^স্ত ব্যক্তি – তারা কোন বীমাকর্মী নহেন। তাদের নামে লক্ষ লক্ষ টাকার কমিশন বিল হয়। বাস্তবতা হলো নন-লাইফের কোন এজেন্টকে কোম্পানীর অফিসে আসতে হয়না, কোন গ্রাহকের কাছে যেতে হয় না। নন-লাইফের এজেন্ট হিসেবে আইডিআরএ -এর খাতায় এবং বীমা কোম্পানীর বালামে শুধু তাদের নাম রয়েছে মাত্র। তাদের নামে কোম্পানীর কোটি কোটি টাকার ব্যবসার বিপরীতে কমিশন বিল হয়। এজেন্ট এর নামে বিল করে চেকের মাধ্যমে এজেন্টের একাউন্টে জমা হয়ে আবার সেই টাকা কোম্পানীতে নিয়ে আসা হয়। এজেন্ট এর নামে ব্যাংক একাউন্ট খোলার দিনেই চেকের প্রতিটা পাতায় এজেন্টের স্বাক্ষর নিয়ে রাখা হয়। আবার সেই টাকা নিয়ে ব্যবসায়ী কিংবা ব্যাংক কর্মকর্তা অথবা অন্য কোন মধ্যস্বত্বভোগীকে প্রদান করা হয়। যাহাকে পরিস্কার মানিলন্ডারিং বলা যায়।

২. বীমা পেশায় সংশ্লিষ্ঠ অনেকের মতে আইডিআরএ ইস্যুকৃত লাইসেন্সটাই শুধু বৈধ, এর আগের এবং পরের অনেক কিছুই সন্দেহজনক । যেমন এই লাইসেন্স নেয়ার জন্য সর্ব প্রথম যে প্রশিক্ষন সনদ নেয়া হয় সেখানে সততার অভাব রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রশিক্ষনে অংশগ্রহন ব্যাতিরেকে প্রশিক্ষন সনদ পাওয়া যায় যেটা সম্পূর্ণ অনৈতিক।
৩. প্রকৃত অর্থে কমিশন অর্থ হলো ইন্স্যুরেন্স এজেন্ট এর পাওনা। ইনস্যুরেন্স এজেন্ট হচ্ছে একজন বীমাকর্মী। কিনÍু বীমা কর্মীর টাকা আইনের মারপেচে প্রকৃত প্রাপককে বঞ্চিত করে বীমা গ্রাহকে দেয়া হয় অর্থাৎ বৈধ পথে অবৈধ আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। আইডিআরএ -এর লাইসেন্স দিয়েই নন-লাইফে মানি লন্ডারিং এর মতো অন্যায় কাজ চলছে ।
৪. নন লাইফে ১৫% এজেন্ট কমিশনই সকল অন্যায়ের উৎস। যেহেতু নন-লাইফের প্রকৃত এজেন্ট অনুপস্থিত তাই নন-লাইফের কেন্সার এজেন্ট কমিশন সম্পূর্ণ বন্ধ করা অপরিহার্য্য এবং সময়ের দাবী। বিজ্ঞজনরা বলে থাকেন এটা মহান সংসদে পাশ হয়েছে এটা বন্ধ করা যাবে না । বিষয়টি সত্য বটে কিন্তু বীমা এজেন্টদের লাইসেন্স ইস্যু করেছেন আইডিআরএ, কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে যে কোন সময় এজেন্ট লাইসেন্স বাতিল বা সাময়িক স্থগিত করতে পারেন। নন-লাইফের এজেন্টদের নিয়ে চলমান অনিয়ম বন্ধ করতে আইডিআরএ যদি নন-লাইফের সকল এজেন্ট লাইসেন্স কিছু দিনের জন্য স্থগিত করেন এক্ষেত্রে মহান সংসদের আপত্তি থাকার কথা নয়।এই এজেন্ট লাইসেন্স বাতিল বা সাময়িক স্থগিত করার মাধ্যমে বীমা শিল্পে ১০০% শৃংখলা ফিরে আসবে।
৫. যদি ১৫% এজেন্ট কমিশন চালু থাকে তাহলে বীমা সেক্টরে অশুভ শক্তির থাবা সর্বত্র বিরাজ করার সুযোগ থাকবে। ১৫% এজেন্ট কমিশন নিয়ে সবচেয়ে সুবিধা জনক অবস্থায় থাকবেন আর্থিক ভাবে শক্তিশালী কোম্পানী সমূহ। অর্থাৎ ২৫% কোম্পানী সুবিধা জনক অবস্থানে রয়েছে আর ৭৫% কোম্পানীর এই সুযোগ ও সক্ষমতা থেকে বঞ্চিত, বাজার নিয়ন্ত্রনে তাদের রয়েছে প্রভাব বলয়। অবশ্য মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ছাড় দেয়ার মানসিকতা কারো থাকেনা।
৬. যেসব কোম্পানীর আর্থিক ভিত মজবুত তারা ব্যবসা করেন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর সাথে, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী সমূহ কোন কমিশন গ্রহন করেন না। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর অফিসে কমিশনের টাকা লেনদেনের কোন সুযোগ নাই। যে বীমা কোম্পানী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর সাথে ব্যবসা করেন তারা ১৫% এজেন্ট কমিশন নিয়ে একটি ”সারপ্লাস ফান্ড” সৃষ্টি করেন, যেটা দিয়ে ইচ্ছা করলে যে কোন ক্লায়েন্ট’কে আর্থিক সুবিধা দিতে পারেন।

৭. যেসব কোম্পানীর আর্থিক ভিত মজবুত তারা মেগা প্রজেক্টের ব্যবসা করেন, তারা বিদেশ থেকে নেট রেট আনেন যা আমাদের টেরিফ রেটের চেয়ে অনেক কম। তারা ব্যবসা করেন উরোজাহাজের,কুটনৈতিক মিশনের এবং বিদেশী দাতা সংস্থার। এই সমস্থ ব্যবসায় ক্লাইন্টকে কোন প্রকার কমিশন দিতে হয় না। ঐ সমস্ত ব্যবসার উপর এজেন্টের নামে ১৫% কমিশন বিল করে আলাদা ফান্ড করতে পারেন যা দিয়ে যে কোন ক্লাইন্টকে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দিতে পারেন।
৮. বীমা পেশায় সংশ্লিষ্ঠ অনেকের মতে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর ব্যবসা ও নেট রেট এর ব্যবসা, ঊরো জাহাজের ব্যবসা, বিদেশী দাতা সংস্থার সমূহের ব্যবসার বিপরীতে ১৫% বীমা এজেন্টের কমিশন বাজারে সুষ্ট প্রতিযোগীতার ভারসাম্য নষ্ট করবে। তাই যতপ্রকার ছিদ্র আছে সব ছিদ্র বন্ধ করার উপযুক্ত সময় এখনই। এজেন্টের নামে ১৫% উত্তোলন করে ক্লাইন্টদের কাউকে কম, কাউকে বেশী আর্থিক সুবিধা প্রদান করার প্রক্রিয়া তথা মানিরন্ডারিং বন্ধ করা আমদের নৈতিক দয়িত্ব বটে। যদি পেশাদার বীমা এজেন্ট প্রথা থাকতো তাহলে বাজারে কমিশনের অনৈতিক লেনদেন থাকতোনা।
৯. সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে বিনীত জিজ্ঞাসা কোম্পানীর কোটি কোটি টাকার ব্যবসার বিপরীতে এজেন্ট এর নামে ১৫% কমিশন বিল করে এজেন্টের একাউন্ট থেকে সেই টাকা কোম্পানীতে এনে ব্যবসা সংগ্রহের জন্য ব্যবসায়ী কিংবা ব্যাংক কর্মকর্তা অথবা অন্য কোন মধ্যস্বত্বভোগীকে প্রদান করা আইনত বৈধ কিনা? যদি ব্যবসা সংগ্রহের জন্য বীমা গ্রাহককে ১৫%কমিশন প্রদান করা বৈধ হয় তাহলে একজন বীমাকর্মীর জীবন জীবিকার স্বার্থে তাঁর বেতনের একটি অংশ ব্যবসা সংগ্রহের জন্য বীমা গ্রাহককে প্রদান করা কি অবৈধ হবে? আসলে দুইটি পদ্দতিই বীমা সেক্টরে অন্যায় ও অনিয়মের জন্য দায়ী। এই অবস্থা যদি আবারো চলতে থাকে নন-লইফ বীমা সেক্টরে সুশাসন ও শৃংখলা কখনো ফিরে আসবেনা। এই সেকটর দিনদিন অন্ধকার গহ্বরের নিমজ্জিত হবে। কিন্তু তা হতে দেয়া যাবে না, নন-লইফ বীমা সেক্টরে সুশাসন ও শৃংখলা ফিরে আনতেই হবে।
পরিশেষে উল্লেখ করতে চাই ২০০২ সাল, ২০১২ সাল এবং ২০১৯ সাল নন-লইফ বীমা সেক্টরের জন্য বহুল আলোচিত সমালোচিত অধ্যায়। এবার আমাদের জিততেই হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশে জিডিপিতে ৪% অবদান রাখতে একজন বীমাকর্মী হিসেবে আমাদের ইজ্জতের স্বার্থে সার্কুলার নং নন লাইফ- ৬৪/২০১৯ এর শতভাগ বাস্তবায়নের জন্য সবইকে আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে। বীমা সেক্টরে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে আইডিআরএ’র সকল পদক্ষেপের প্রতি সহমত প্রকাশ করে বর্ণীত বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সহ সকল নন-লাইফের বীমা কর্মীদের নিকট আরজি পেষ করা গেল।
লেখক : মুখ্যনির্বাহী কর্মকর্তা, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স।











