”দ্রব্য মুল্যের জাঁতাকলে এবং অর্থনীতির প্রেশনে দেশের আশিভাগ লোক”


খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
দ্রব্যমুল্যের লাগামহীন উর্ধগতিতে সিমাহীন ভাবে বাড়ছে দারিদ্রতার হার, সেইসাথে পাল্লা দিয়ে অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছে। বেশিরভাগই প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে দিন দিন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমান্ময়ে হ্রাস পাচ্ছে। এতে তাদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে শিল্প উৎপাদনে পড়ছে নেতীবাচক প্রভাব। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা তো দূরের কথা পুরোনোরাই টিকে থাকতে পারছে না। বর্তমানে যেসব ব্যবসায়ীর ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা আছে, তাদের কারো কারো অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও অধিকাংশ ব্যবসায়ীর অবস্থা খুবই খারাপ। আগামীতে কর্মসংস্থানের উপরও এর বিরুপ প্রভাব পড়বে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মোটা দাগে তিন কারণে এই সংকট। প্রথমত, দীর্ঘদিন থেকে রাষ্ট্রের খাতের সংস্কারের অভাব, করোনার আঘাত এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব এর মুল কারন। বর্তমানে পরিস্থিতি যে জায়গায় গেছে, তাতে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ হলেও ২০২৪ সালের আগে এ সংকট কাটবে না। এ অবস্থার উত্তরণে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন জরুরি। এক্ষেত্রে সবার আগে সমস্যার কথা স্বীকার করতে হবে। এরপর সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। কারও জন্য তা আতঙ্কের। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থাকলে অর্থনীতির দুর্বলতা আরও ঘনীভূত হবে।
তার বিবেচনায় অর্থনীতিতে চার ধরনের বিচ্যুতি রয়েছে। এগুলো হলো-ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ না হওয়া, কর আহরণে দুর্বলতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বৈষম্য। ড. দেবপ্রিয় বলেন, অর্থনীতির নীতি বাস্তবায়ন অনেকটাই আস্থা ও যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। তাই আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনাই অর্থনীতির স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
বর্তমানে আমরা একটা দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। অনেকে মনে করেন, বৈদেশিক চাপের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি এটি সামান্যতম সত্য। বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতি আমাদের যে পরিমানে চাপে ফেলেছে। এটা কোন দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা থাকলে এ চাপ মোকাবিলা করাটা বড় ব্যাপার হয়ে দাড়াতনা। যেমন বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬/৭ শতাংশের মতো,। এই জিডিপি যদি ১৪-১৫ শতাংশ হতো, তাহলে সরকারের আর্থীক সক্ষতা ও বর্তমান সাময়ীক পরিস্থিতি খুব সুন্দভাবে মোকাবেলা করতে পারত।
একটা উন্নয়নশীল দেশের নুন্যতম ২ থেকে ৩ বছর মেয়াদি ‘অভ্যন্তরীন স্বক্ষমতা বজায় রাখা খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দিতে হবে। এগুলো হলো-সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে সমর্থন দেওয়া, বিপন্ন মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। আর এই নীতি সমঝোতা প্রণয়ন ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। এজন্য সরকারকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে হবে। যেমন মন্ত্রিপরিষদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত
সংসদীয় কমিটি উল্যেখযোগ্য। আলোচনা হতে পারে গনতন্ত্র ভোটাধিকার জবাবদিহিতা ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সরকারের অভ্যন্তরিন ও আপদকালিন সঙ্কট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেতো বটেই, এমনকি সংশ্লিষ্ট শ্রেণি-পেশারসহ সুশিল সমাজের সঙ্গেও এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা দরকার। এ ধরনের আলাপ আলোচনায় রাষ্ট্রের গনতন্ত্র, উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াতে অত্যদিক সহায়তা করে। এর ফলে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থার কাছে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে দরকষাকষি সহজ হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক উত্তাপপূর্ণ সময়ে অংশগ্রহণমূলক নীতি সমঝোতা ও অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেবে।
বর্তমানে আমাদের সরকারের বড় সমস্যা হল, বেপাস কথাবার্তা, নিজেদের অবমুল্যায়ন, দুনীতি, স্বজনপ্রিতি, ন্যায় বিচারের অভাব,অর্থ পাচার, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব, অরাজনৈতিক অযোগ্য লোভী ও ব্যবসায়ীক মানসিকতা সম্পন্ন
লোকেদের হাতে ক্ষমতা প্রদান, রাষ্ট্র পরিচালনার মুলনীতি থেকে সরে আসা, পররাষ্ট্রনীতির অপব্যবহার,এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার চরম অবমুল্যায়নসহ নানা কারণে অসহনীয় হয়ে উঠছে জিনিসপত্রের দাম। এরপর দেশে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সর্বক্ষেত্রে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও বেসামাল হয়ে উঠবে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানুষের আয় বাড়ানো এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখামুখি জাতিকে দাঁড় করেছে এবং সরকার নিজেও দাঁড়িয়েছে।
চলতি সময়ে বাংলাদেশের ৪টি জাতীয় খাতের প্রায় সবকটিই নেতিবাচক হুমকিতে আছে। যেমন সেবা খাত, কৃষি, শিল্প এবং রেমিট্যান্স, বর্তমানে তিনটি খাতের অবস্থাই নাজুক। এরই মধ্যে কৃষিজমি কমে যাওয়ার কারনে আগামীতে কৃষি উৎপাদনও কমতে পারে। সংশ্লিষ্টরা মতে, গত ১৩-১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে চাপে রয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। রাজস্ব আয়ে ঘাটতির পাশাপাশি নতুন করে যোগ হয়েছে বিশ্ব সংকট। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স আয়ে ঘাটতির কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বৈশ্বয়ীক দুর্যোগ করোনা উত্তরণের কথা বলা হলেও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকগুলো এখনো পুর্বাবস্থায় ফেরেনি। রপ্তানি ছাড়া অর্থনীতির আর কোনো সূচকই ভালো নেই। মূল্যস্ফীতি গত ১১/১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। রপ্তানি সামান্নতম বাড়লেও বাণিজ্য ঘাটতি এখন গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাওয়ায় চলতি হিসাবের যে ঘাটতি, তাও গত ৫০ বছরে দেখা যায়নি। এর প্রভাবে শুধু চলতি বছরেই কয়েকবারে টাকার অবমূল্যায়ন করা হয়েছে প্রায় ১৭/১৮ শতাংশেরও বেশি।
দেশের সার্বিক অবস্থা সঙ্কটাপন্ন না হলেও অর্থনীতি চাপ, অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যে আছে। অপরদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনও সংকটে। মোটকথা মূল্যস্ফীতি এখন বিশ্বের বড় সমস্যা বলে বাংলাদেশ বিপদে পড়েছে আয় নিয়েও। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় সবচেয়ে কম রাজস্ব আদায় করে, এমন দেশের তালিকায় বাংলাদেশ প্রায় সবার নিচে। ফলে নিজস্ব সম্পদ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অনির্চয়তার দিকে। এজন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ৫ বিলিয়ন ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
আমাদের চলমান অর্থনীতি যে অবস্থায় রয়েছে, তার মুল কারনই হল বহির্বিশ্বের কারণে। প্রথমত, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে আমাদের রপ্তানি কমে যাচ্ছে সেইসাথে আগামীতে তা আরও কমতে পারে প্রবাসী আয়ও (রেমিট্যান্স)। অন্যদিকে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছে। বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপ। ডলারের বিপরীতে টাকার দাম অতিমাত্রায় কমায় পরিস্থতি মোকাবিলা চ্যালেঞ্জের মুখে দাড়িয়েছে। এক্ষেত্রে আশু পরিস্থিতি মোকাবেলাসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানোর মাধ্যমে সবার কাছে খাদ্য পৌঁছাতে হবে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যে দুর্নীতির কথা আসছে, তা কঠোরভাবে রোধ করতে হবে। সর্বশেষ বলতে হয়, সরকার জাতীয় স্বার্থে এসব দুনীতি, স্বজনপ্রিতি, ন্যায় বিচারের অভাব,অর্থ পাচার, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব, অরাজনৈতিক অযোগ্য লোভী ও ব্যবসায়ীক মানসিকতা সম্পন্ন লোকেদের হাতে ক্ষমতা প্রদান, রাষ্ট্র পরিচালনার মুলনীতি থেকে সরে আসা, পররাষ্ট্রনীতির অপব্যবহার,এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার চরম অবমুল্যায়নসহ নানা কারণে অসহনীয় হয়ে উঠছে জিনিসপত্রের দাম, এর থেকে উত্তরন না হতে পারলে সামনে সরকারকেই এর দ্বায়ভার বহন করতে হবে।
লেখকঃ সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন,ও মানবাধিকার কর্মী