খোন্দকার জিল্লুর রহমান :-
‘সাংবাদিকদেরকে জাতির বিবেক বলা হয়’ কথাটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দায়িত্বশীল লোকের কণ্ঠে শোনা যায়। সমাজের তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রের দায়িত্বরতদের সর্বোচ্ছ পর্যায় পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রের প্রচার, প্রসার,অর্থ ও বানিজ্য, দুর্নীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি,ব্যার্থতা সফলতা, সব কিছুরই উপস্থাপন ও প্রকাশ হয় সাংবাদিকের কলমের মাধ্যমে এ জন্যই সাংবাদিকেরা জাতির বিবেক। বর্তমান ডিজিটাল যুগে যখন সাংবাদিকরা কলম বন্ধকরে দিবে তাইলে সারা বিশ্ব একটা অন্ধকারে ডুবে থাকার অবস্থায় দাড়াবে। এটা আধুনিক বিশ্বের কোনো দেশের কোনো সাংবাদিক সমাজের কাম্য নয়, এমনকি আমাদের দেশেও তার ব্যাতিক্রম নয়। সংবাদ এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন একটি খড়গ বলে পরিগনিত হয়েছে। এই আইন তৈরির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়ীত্তরত নীতি নীর্ধারকরা কতটুকু প্রজ্ঞা ও দুরধর্ষীতার পরিচয় দিয়েছেন এটা একবার ভেবে দেখার বিষয়।
অনেকের মতে আমাদের দেশে গত কয়েক বছর থেকে সংবাদ পত্রের এবং সাংবাদিকদের পূর্ণ স্বাধীনতা না থকলেও সারাদেশের সাংবাদিক সমাজের বিশেষ আপত্তির মুখে শুধু নয় জাতীয় সংসদে সরকারের অংশ হিসাবে গৃহপালিত বিরুধী দলের সংসোধন প্রস্তাব উপেক্ষা করেও শেষ পর্যন্ত গত ৮ অক্টোবর ২০১৮ পাস হল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এইআইনের বেশ কিছু ধারার ব্যাপারে সকল সাংবাদিক সমাজ একত্র হয়ে আপত্তি জানালেও এর প্রতি গুরুত্ত না দিয়ে গোটা সাংবাদিক সমাজকে অবহেলিত করেছে বললেও নিতান্তই কম বলা হবে। পাশকৃত আইনটি বিরুধী দলের পক্ষ থেকে বাতিলের জন্য সংশোধিত প্রস্তাব দেয়া হলেও তা উপেক্ষা করে আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির বিধান রাখা হয়েছে এটা অত্যন্ত দুক্ষজনক। সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে নতুন আইনটি সুষ্ঠ সুন্দর ও মুক্ত সমাজ গঠনের পরিপন্হী। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার জন্য সরকার নিজস্ব স্বার্থে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করে তড়িগড়ি করে উক্ত আইন পাশ করে নেয়ার পর থেকেই দেশে-বিদেশে সমলোচনার ঝড় উঠে। তাদের মতে এরকম একটি আইন গনমাধ্যমের জন্য কোন সূফল বয়ে আনবেনা,যা গত কয়েক বছর ধরে বহু সাংবাদিক, লেখক ও এক্টিভিষ্টদের ঘুম, জেল, হত্যার মাধ্যমে প্রমানিত হয়েছে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ কাশিমপুর কারাগারে লেখক মুস্তাক আহমদের মৃত্যুকেও এর থেকে বাদ দেয়া যায় না এবং সরকারের আইন মন্ত্রীও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সরকারের সাথে আলোচনায় বসার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এর ত্রুটির কথা স্বিকার করে নেন। কেননা পাসকৃত আইনটি সংবাদমাধ্যম কর্মীদের সাথে সরাসরি সম্পর্কয়ুক্ত। এ ক্ষেত্রে অতীতের চেয়ে যাদের সাথে বর্তমান সরকারের সূসম্পর্ক আছে তাদের মতামত উপেক্ষা করেও তড়িগড়ি করে যেভাবে আইনটি পাশ করা হয়েছে তা সরকার এবং গনমাধ্যম কর্মীদের সূসম্পর্কের ক্ষেত্রে পর্যাযক্রমে বিবাধমান অবস্তা তৈরি করবে বলে অনেকে মতামত দেন।
বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কূটনীতিকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন । গত ৪ জানুয়ারি এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পশ্চিমা এসব কূটনীতিকের মতে, বাংলাদেশের নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা এবং এই আইন জনগনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচারিক ধারার লঙ্ঘন হয়েছে। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান, ইতালি, স্পেন, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্যের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার। জার্মান পররাষ্ট্র দফতরও বাংলাদেশের সাংবাদিকদের মুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার আহব্বান জানিয়েছে সেই সাথে নির্ভরযোগ্য ও সত্যনির্ভর তথ্য জনগনের জানার আধিকারের
কথাও বলা হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় ১ ফেব্রুয়ারি ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন’ নামে একটি অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র প্রকাশ হয়৷ তথ্যচিত্রে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর সর্বো”চ কর্মকর্তাসহ উচ্ছপর্যায়ের কিছু দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়৷ এরপর সরকার ও সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া সংবাদ আকারে ছাপানো হলেও আল জাজিরায় তুলে ধরা দুর্নীতির বিষয়টি অধিকাংশ দেশীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়নাই। এরপরই বাংলাদেশের গণমাধ্যমের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে যা একটি উন্নয়নমুখি রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমুর্তিকে চরমভাবে বিগ্নিত করে। বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম নিজেদের সম্পাদকীয়তে এর কারণ হিসেবে বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন এবং অন্য বিভিন্ন আইনের কিছু ধারাকে দায়ী করে৷
১০ ফেব্রুয়ারি ডয়চে ভেলের সাংবাদিক টিম সেবাস্টিয়ানের সঞ্চালনায় টক শো ‘কনফ্লিক্ট জোন’-এ অতিথি হিসেবে হাজির হতে দেখা গেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীকে৷ সেখানে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্বীকার করেন, ‘‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু শব্দচয়ন দুর্বল ও অস্পষ্ট হয়েছে, যার অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে৷”
সরকার গনমাধ্যমের প্রতি মুখেমুখে সজাগ থাকলেও পাসকৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি সেই অবস্থানটাকে দুর্বল করে দিয়েছে। ডিজিটাল আইনের অনেক সুবিদা থাকলেও প্রয়োগকারি অনেকের অনৈতিকতার কারনসহ লোভি, চাটুকার ও অতি উৎসাহিদের কারনে এর অপপ্রয়োগও কম হয়না। কিছুকিছু অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে এই আইনটি পাস হলেও আইন প্রয়োকারীদের দায়মুক্তির বিধান শীব গড়তে যেন বানর গড়া নাহয় এরই একটা বিরাট সন্দেহ থেকে যায়। সরকার যেহেতু পরিবর্তনশীল ভবিষ্যতে এই আইনটি যাতে ভুমেরাং না হয় সে দিকে কঠোরভাবে খেয়াল রাখা উচিত। আমরা আশা করব গনমাধ্যম এবং সরকারের সূসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে অতীতের মত বর্তমানেও সরকারের নীতি নির্ধারকরা আপত্তিগুলি যেন মাথায় রাখেন। কারন সাংবাদিকরা সরকার বা সরকার বিরোধি কোন দলেরই শত্রু নয় আবার ব্যাক্তিগত ভাবেও সাংবাদিকরা জাতে আইন প্রয়োগকারি কোন সংস্থা বা ব্যাক্তির প্রতিহিংসার স্বিকার না হয়,এটা অত্যধিক গুরুত্তপূর্ণ। আমাদের মাননিয় প্রধান মন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যোগ্য রাষ্ট্রনায়ক ও একজন মিডিয়া বান্ধব ব্যাক্তি হিসাবে সারাবিশ্বে যেভাবে খ্যাত,তারই খ্যাতি বজায় রেখে বিশেষ করে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপপ্রয়োগ না হয় সেদিকে সজাগ থাকবেন বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
লেখক ঃ সম্পদক প্রকাশক অর্থনীতির৩০দিন ও মানবাধিকার কর্মী।











