এস. এম. আলাউদ্দীন
কোটা সংস্কারের আন্দোলন দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি কোনো কোটাই আর থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ছাত্রদের আন্দোলন ছিল কোটা সংস্কারের জন্য, কোটা তুলে দেয়ার জন্য নয়। আরো পরিষ্কার করে বললে, তাদের আন্দোলন ছিল মূলত ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে, যা মূলত অপব্যবহার হয়ে আসছে। আর আমাদের দেশে সংরক্ষিত কোটার উপকারভোগী মূলত সুবিধাভোগী শ্রেণী। জেলা কোটার ব্যাপারেও আন্দোলনকারীদের আপত্তি ছিল।
স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর কোনো মুক্তিযোদ্ধার আর চাকরির বয়স থাকার কথা নয়। তাদের সন্তানদেরও নয়। তবে অল্পবিস্তর দু-চারজনের থাকতে পারে, যারা খুব কম বয়সে অর্থাৎ ১৫-২০ বছর বয়সে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। কিন্তু বহু অমুক্তিযোদ্ধা এখন মুক্তিযোদ্ধা অবৈধভাবে সেজেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধীদের সন্তানরাও রয়েছে। তাই চাকরির কোটা সংস্কার করাটা জরুরি। আন্দোলনকারী ছাত্রদের এ দাবিও যৌক্তিক। শিক্ষক সমাজও এ দাবির পক্ষে মত দিয়েছেন। আন্দোলনের একজন নেতা রাশেদ খান যথাযথই বলেছেন, ‘কোটা থাকবে না, তা আমরা চাই না। আমরা সংস্কার চাই। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। কোটা দরকার আছে। সবার কথা বিবেচনা করে সেটার একটা সহনীয় পর্যায়ে সংস্কার চাই’ (প্রথম আলো, ১২ এপ্রিল ২০১৮)। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কোটা সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়ার ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোটা পদ্ধতি রয়েছে। তবে তা সাধারণত ৫-১০ শতাংশের বেশি নয় এবং সেটা মূলত সুবিধাবঞ্চিত আদিবাসী/অনগ্রসর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, দলিত (তথা— ঋষি, মুচি, মেথর, বেদে সম্প্রদায় প্রভৃতি) শ্রেণীর জন্য। কিন্তু আমাদের দেশে সংরক্ষিত কোটার উপকারভোগী মূলত সুবিধাভোগী শ্রেণী। সুবিধাবঞ্চিত অনগ্রসর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী/ দলিত সম্প্রদায়সহ নারী, প্রতিবন্ধী ও জেলা কোটা থাকার প্রয়োজন আছে। যদিও জেলা কোটার ব্যাপারে আন্দোলনকারীদের আপত্তি আছে। সুবিধাবঞ্চিত অনগ্রসর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী/দলিত সম্প্রদায়সহ নারী, প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে আন্দোলনকারীদের কোনো আপত্তি ছিল না। জেলা কোটার ব্যাপারে আপত্তি থাকলেও জেলা কোটার প্রয়োজন এখনো রয়েছে। বিশেষ করে অনগ্রসর/দরিদ্র জেলাগুলোর জন্য (যেমন— কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, হাওড়াঞ্চলের জেলা ও পার্বত্য জেলাগুলো)। স্বাধীনতার পর জেলাগুলোর মধ্যে ব্যাপক বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান যে কোটা পদ্ধতি চালু করেছিলেন, তার প্রয়োজন এখনো শেষ হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ণ সম্মান রেখে বলছি, কোটা সম্পূর্ণ তুলে দেয়া ঠিক হবে না। এখানে কোনো রকম অনুরাগ, বিরাগ বা আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। তিনি এরই মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায় এবং বিশেষ ব্যবস্থায় সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীকে চাকরির সুযোগ দেয়া যায়, তা ঠিক করার জন্য। আন্দোলনকারী নেতা রাশেদ খান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য কতটা আইনসঙ্গত ও বাস্তবায়নযোগ্য, তা বিশ্লেষণ করে তাদের মতামত জানাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রয়োজনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্যাবিনেট সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির অ্যাডভাইজর থাকতে পারেন।
কমিটি বিচার-বিশ্লেষণ করে যে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হওয়া দরকার। সরকারের বাইরেও কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও আন্দোলনকারী নেতাদের প্রতিনিধি কমিটিতে রাখা যেতে পারে। যতটা দ্রুত সম্ভব, এর একটা সমাধান করা প্রয়োজন। একটা দেশে ৫৫ শতাংশ চাকরি কোটায় সংরক্ষিত কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না, যেখানে লাখ লাখ শিক্ষিত লোক বেকার। তবে কোটা অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। কোটা সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ হতে পারে, যেমন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ৪ শতাংশ, নারী ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ এবং জেলা কোটা ৫ শতাংশ। মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সন্তানদের জন্য কোটা রাখা যাবে না এবং তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য তো নয়ই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোটা সম্পূর্ণ তুলে দেয়া হলো। তাহলে ভবিষ্যতে আর কেউ কোটা সংস্কারের আন্দোলন করতে পারবে না বা দরকার পড়বে না। এটা খুব যৌক্তিক বা সুচিন্তিত কোনো সিদ্ধান্ত হলো না। বর্তমান কোটা সংস্কার সময়ের বিশেষ দাবি ছিল। সরকারেরই এ বিষয়টি খেয়াল করা দরকার ছিল। কিন্তু সেটা না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছে। আমার বিশ্বাস, কোটা সংস্কারের আন্দোলন অচিরেই সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়বে সমস্যার কার্যকর সমাধান না হলে। কেননা এটা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের ব্যাপার। এতে গোটা পরিস্থিতি সরকারের বিপক্ষে চলে যাবে। সুতরাং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাময়িক সমঝোতা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু সরকারের একাধিক মন্ত্রী এ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করলে পরিস্থিতির অবনতি হয়। আন্দোলন সারা দেশে আরো সম্প্রসারিত ও বেগবান হয়। এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কোটা সম্পূর্ণ তুলে দেয়ার ঘোষণা মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং আন্দোলনকারীদের আস্থায় ফাটল ধরেছে। এ অবস্থায় আন্দোলনকারীদের দাবি মাথায় রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন ও কাঙ্ক্ষিত সমাধানে আসবেন, এমনটা সবাই আশা করছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, কোটা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। আবার অনেকে বলছেন, সর্বোচ্চ ১৫-২০ শতাংশ কোটা থাকতে পারে। আমার মনে হয়, আন্দোলনকারীরা এ দাবি মেনে নেবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, বিশেষ ব্যবস্থায় অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীকে কীভাবে সুবিধা দেবে? এর নীতিমালা কী হবে? এর যে অপব্যবহার হবে না, তার কী গ্যারান্টি আছে? সুতরাং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার দরকার আছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত কমিটি এগুলো বিশ্লেষণ ও খতিয়ে দেখবেন এবং সহজ ও কার্যকর নীতিমালা তৈরি করবেন। প্রধানমন্ত্রীর কোটা সম্পূর্ণ তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত সুচিন্তিত হয়নি বলে অনেকে মনে করছেন। এটা সরকারকে আরো ভাবতে হবে। দেশ উন্নয়নের দিকে ক্রমে এগোচ্ছে। প্রয়োজন হলে আবার কোটা সংস্কার করতে হবে, সেটাই নিয়ম হওয়া উচিত।
কোটা সুবিধার জন্য লাখ লাখ কৃষক, শ্রমিক, মজুর, শিক্ষিত যুবারা জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেনি। তারা একটা স্বাধীন দেশ, অর্থনৈতিক মুক্তি ও বৈষম্যহীন সমাজের জন্য যুদ্ধ করেছেন। কোটা সিস্টেম বরং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অপমানজনক। তার পরও মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তাদের জন্য কোটা ঠিক ছিল। কিন্তু নাতি-নাতনিদের জন্য কোটা রাখা ঠিক নয়। কোনোক্রমেই নয়। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো ভাতা পাচ্ছে। প্রয়োজনে অসহায় পরিবারগুলোর জন্য তা বাড়ানো যেতে পারে। আরো কীভাবে তাদের সহযোগিতা করা যেতে পারে, তার বিকল্প সরকার ভাবতে পারে। ‘মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কোটার নামে মুক্তিযোদ্ধাদের লাখ লাখ তরুণের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে। এটার ফল ভালো হবে না। দেশের অধিকাংশ তরুণ সমাজই মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা আর সম্মানের চোখে দেখেন। আমার জানামতে, অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাও প্রচলিত কোটা পদ্ধতির সংস্কার চান। কোটায় চাকরি পাওয়াটাকে তারা সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন না। আমার বিশ্বাস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লাখো তরুণের মনের কথা অনুধাবন করে যৌক্তিক সমাধান দেবেন। ভরসার জায়গা এই একটাই।’
আন্দোলনকারী ছাত্রীরা নারী কোটা রাখারও পক্ষে নয়। কিন্তু এটা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উচ্চশিক্ষিত নারীদের মতামত। বৃহত্তর নারী সমাজের (এসএসসি থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী) নয়। মফস্বলের (ইউনিয়ন-উপজেলা-জেলা শহর) নারীদের প্রেক্ষাপট ও যোগ্যতার কথা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের আন্দোলনকারীরা বিবেচনায় নেননি। তারা শিক্ষা ও যোগ্যতায় উচ্চশিক্ষিত নারীদের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। দেশে ১০ শতাংশ নারী কোটা থাকার পরও নারীরা পুরুষের তুলনায় নানাভাবে পিছিয়ে আছে। সুতরাং বৃহত্তর নারীগোষ্ঠীর কল্যাণে নারী কোটা কমপক্ষে ৫ শতাংশ থাকা জরুরি। সরকারের এটা বিশেষভাবে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
দেশে ব্যাপক বেকারত্ব ও চাকরির সীমিত সুযোগের প্রেক্ষাপটেও কোটা সংস্কার জরুরি। দেশে সরকারি হিসাবে ২৮ লাখ বেকার রয়েছে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৪০ শতাংশ। প্রতি পাঁচজন শিক্ষিত বেকারের মধ্যে দুজনই উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। সম্প্রতি প্রকাশিত শ্রম জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে সারা দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। এদের মধ্যে ১০ লাখ ৪৩ হাজার যুবক-যুবতী মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেও কোনো চাকরি পাচ্ছে না (প্রথম আলো, ৯ এপ্রিল ২০১৮)। সরকার কোটা সংস্কার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কার্যকর সমাধান করবে— এটা ছাত্রসমাজসহ গোটা দেশবাসীর চাওয়া। এতে দেশের বেকারত্বের সংখ্যা কমবে। দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে। হতাশায় নিমজ্জিত শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ও কাঙ্ক্ষিত সম্মানজনক কর্মসংস্থান খুঁজে পাবে। দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। দেশের প্রতি তাদের সেবা ও দেশপ্রেম জাগ্রত থাকবে। তাদের পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা করতে পারবে এবং জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। দেশ গড়ার কাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে উৎসাহিত হবে।












